তিমি পর্যবেক্ষণে স্যাটেলাইট প্রযুক্তি
১২ নভেম্বর, ২০১৮ ইং
তিমি পর্যবেক্ষণে স্যাটেলাইট প্রযুক্তি

আশেক খান আলেখীন

 

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আকৃতির প্রাণী তিমি সম্পর্কে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। সাগরে বসবাসকারী স্তন্যপায়ী এই বিশাল প্রাণীটির জীবনাচরণ, এর বুদ্ধিমত্তা, কোনো কোনো প্রজাতির তিমির (হাম্পব্যাক হোয়েল) অদ্ভুত সুরালাপ আজও মানুষের মাঝে বিস্ময়ের উদ্রেক করে থাকে। ইদানিং জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে সাগরে তিমির সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে যা পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণে নির্দিষ্ট সময় পর পর সাগরে তিমিদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা অর্থাত্ তিমি সুমারির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু এত সুবিশাল সাগরে প্রতিটি তিমিকে খুঁজে বের করে তাদের সঠিক সংখ্যা জানা প্রায় অসম্ভব। তবে বর্তমানে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির উন্নতি ঘটায় সেই আপাত অসম্ভব কাজটিও সম্ভব বলে জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের একদল গবেষক। তারা সাগরে তিমিদের সংখ্যা গণনায় এবং প্রাণীটির প্রজাতি চিহ্নিতকরণে হাই রেজ্যুলেশনের স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। মহাকাশ থেকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সাগরে তিমি ট্র্যাক করার কাজ অনেক সহজ হবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভে (বিএএস)-এর গবেষক দল পৃথিবী থেকে ৩৮৫ মাইল উপর থেকে তোলা স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে তিমির সংখ্যা গণনার সাথে সাথে চার রকম প্রজাতির তিমির জীবনাচরণ, সাগরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বিচরণের ধরন যাচাই করবেন। এর মাধ্যমে সাগরের এই স্তন্যপায়ী প্রাণীটির স্বভাব সম্পর্কে আরো ভালভাবে জানা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিএএস-এর বিজ্ঞানীরা সাগরে তিমি পর্যবেক্ষণে ডিজিটাল গ্লোব নামক সংস্থার স্যাটেলাইট থেকে তোলা উচ্চ রেজ্যুলেশনের ছবি কাজে লাগাবেন। এ পদ্ধতিতে তিমি পর্যবেক্ষণে খরচ অনেক কম পড়বে এবং সাগরের অধিকাংশ এলাকা এই গবেষণার আওতায় আনা যাবে। জাহাজ বা প্লেনের মাধ্যমে তিমি পর্যবেক্ষণের প্রচলিত পদ্ধতিতে একদিকে যেমন খরচ বেশি পড়ে, সেইসঙ্গে সাগরের প্রত্যন্ত এলাকা এই পদ্ধতিতে কাভার করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া প্লেন বা জাহাজের শব্দে তিমিরা এমনিতেই ভেগে যায়। ইতিমধ্যে ওয়াল্ডভিউ-৩ নামক স্যাটেলাইট থেকে ধারণকৃত ছবির মাধ্যমে আর্জেন্টিনার উপকূলবর্তী সাগরে বেশ কিছু ‘সাউদার্ন রাইটস হোয়েল’, ভূমধ্যসাগরের উত্তরাঞ্চলে ‘ফিন হোয়েল’, হাওয়াই দ্বীপের কাছে ‘হাম্পব্যাক হোয়েল’ এবং মেক্সিকোর উপকূলবতী সাগরে ‘প্যাসিফিক গ্রে হোয়েল’-এর সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবির মাধ্যমে তিমি পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত গবেষণা রিপোর্টের মূল লেখক এবং বিএএস-এর তিমি গবেষক হ্যানাহ কুবেনিস বলেন, ‘এই পদ্ধতিতে তিমি পর্যবেক্ষণ সবচেয়ে কার্যকর এবং একই সঙ্গে যা ব্যয় সাশ্রয়ীও বটে। তিমির অনেক আচার আচরণ আমরা স্যাটেলাইট ছবির মাধ্যমে দেখছি যা আগে দেখিনি।’

তিমি সম্পর্কে কিছু কথা: তিমি খোলা সাগরের প্রাণী। এরা সাগরে বাচ্চার জন্ম দেয়, তাদের খাবার যোগায়, লালন-পালন করে বড় করে। এরা জলচর প্রাণী হলেও পানি থেকে অক্সিজেন নিতে পারে না, বাতাস থেকেই অক্সিজেন নিতে হয় এদের। তাই সাগরের উপরিভাগেই এরা বিচরণ করে থাকে। তবে এদের দম প্রচুর। একবার শ্বাস নিয়ে তারা পানির নিচে দীর্ঘক্ষণ থাকতে পারে। স্পার্ম হোয়েল প্রজাতি পানির নিচে থাকতে পারে দেড় ঘন্টা পর্যন্ত।

আগে সাগরে বেশ কিছু প্রজাতির তিমির দেখা মিললেও এখন কেবল ৫/৬টি প্রজাতির তিমি পাওয়া যায়। তিমি নানা আকৃতি হয়ে থাকে। মেয়ে তিমিরা পুরুষের চেয়ে বড় হয়। তিমির মধ্যে সবচেয়ে ছোট- বামন স্পার্ম হোয়েলের দৈর্ঘ্য সাড়ে ৮ ফুট পর্যন্ত, ওজন ১৩৫ কেজির মতো। সবচেয়ে বড় হচ্ছে নীল তিমি- দৈর্ঘ্য প্রায় ১শ’ ফুট, ওজন প্রায় দুশ’ টন। সব তিমি আবার একই রকম খাবার খায় না। নীল বালিন হোয়েলসহ দন্তবিহীন তিমিরা বিশাল হা করে একগাদা পানি গিলে ফেলে যাতে প্লাঙ্কটন নামক সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও ক্রিল থাকে। তারপর সেগুলো প্লাঙ্কটন ও ক্রিল খেয়ে মাথার পেছনের ফুটো দিয়ে ভেতরের পানি বের করে দেয়। আর স্পার্ম হোয়েলসহ দাঁতযুক্ত তিমিরা ছোট ছোট মাছ, স্কুইড ইত্যাদি খেয়ে থাকে। দাঁতবিহীন বালিন হোয়েলের ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত প্রখর।

পক্ষান্তরে দাঁতযুক্ত তিমিরা প্রখর শ্রবণশক্তির  অধিকারী। স্পার্ম হোয়েল ডাইভিংয়ে অত্যন্ত দক্ষ। সাগর থেকে লাফ দিয়ে তারা অনেক উঁচুতে উঠতে পারে এবং ডাইভ দিয়ে সাগরের অনেক গভীরে গিয়ে স্কুইডসহ পছন্দের সব খাবার খেয়ে নেয়। উষ্ণ রক্তের প্রাণী তিমি ঘন্টায় ২০ নট গতিতে সাঁতরাতে পারে। হাম্পব্যাক ও নীল তিমি কোনো কিছু না খেয়েই একটানা হাজার হাজার মাইল ভ্রমণ করতে সক্ষম। পুরুষ তিমিরা বছরে কয়েকবার তাদের সঙ্গিনী পাল্টায়, কিন্তু মেয়ে তিমিরা কয়েক বছরে একবার পুরুষ সঙ্গীর সঙ্গে মিলিত হয়ে থাকে। বাচ্চার জন্ম দেয়ার পর মা তিমিরা এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত তাদের লালন পালন করে থাকে।

৫০/৬০ বছর আগ পর্যন্ত তিমি শিকারের ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। তাই সে সময় যাচ্ছেতাইভাবে তিমি নিধন চলেছে। এতে তিমির সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। একসময় পরিবেশবাদীরা এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে। ফলে তৈরি হয় তিমি নিধনবিরোধী আন্তর্জাতিক আইন। এরপর তিমি শিকার অনেক কমে আসলেও একেবারে বন্ধ হয়নি। তিমির চামড়া ও তেলের লোভে চোরা শিকারীরা সাগরে এখনও তিমি নিধন করে চলেছে। তাছাড়া সাগর দূষণের কারণে তিমির খাবার প্লাঙ্কটন কমে গেছে। সেই সঙ্গে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাগর উষ্ণ হয়ে উঠেছে এবং সাগরের কোনো কোনো অংশের পানির তাপ তিমিদের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠায় তিমিরা বার বার স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। এসব কারণে তিমির সংখ্যা আজও হ্রাস পাচ্ছে। এ অবস্থায় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তিমি পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি প্রাণীটির অস্তিত্ব রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা। স্যাটেলাইটের ভয়ে চোরাশিকারীরাও এখন আর সহজে তিমি নিধন করতে পারবে না।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন