মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ঝুঁকির মুখে ইরানী নারী-শিশুরা
১২ নভেম্বর, ২০১৮ ইং
মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ঝুঁকির মুখে ইরানী নারী-শিশুরা
নাজনীন সুলতানা নীতি

 

মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোরতর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে অনেকটাই পূর্বের অবস্থায় ফিরে গেলো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক।  ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে ২০১৫ সালে তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বৃটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং চীন সম্মিলিতভাবে একটি পরমাণু চুক্তি করেছিল। চুক্তিটি উভয়পক্ষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই সময়ের ঐ চুক্তির বদৌলতে ইরানের ওপর আরোপিত সকল নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিল ওবামা প্রশাসন। কিন্তু চলতি বছরের মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চুক্তিটি থেকে বেরিয়ে যান এবং তখনই ইরানের ওপর আরোপিত পূর্বের সকল নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের হুমকি দেন। আর গত সোমবার থেকে সেটি-ই করে দেখালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান প্রজাতন্ত্র ও তার জনগণের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। এর আগে অন্য কোনো মার্কিন সরকারের সময় ইরানের ওপর এতটা কঠোরতা প্রদর্শিত হয়নি। এবারের এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আরো বেশি শঙ্কার বড় কারণ, এই নিষেধাজ্ঞায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে দেশটির নারী এবং শিশুসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠী।

২৭ বছর বয়সী ফাতেমা, জনস্বাস্থ্য নীতি সংক্রান্ত সদ্য গড়ে ওঠা একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন সেই সাথে রাজধানী তেহরানের একটি হাইস্কুলে জীববিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফাতেমা নব্বই-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পরিবারসহ কানাডায় অভিবাসন গ্রহণ করেছিলেন এবং ১৩ বছর বয়সে ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে যান। স্নাতক সম্পন্নের পর তিনি ইরানে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। আর ফিরে এসে অন্য আরো অনেকের মতো তিনিও এরই মধ্যে অবরোধের প্রভাব অনুধাবন করতে শুরু করেন। তার কথায়, ‘ছয়,সাত মাস আগে যখন ডলার এবং রিয়াল উন্মাতাল ব্যবহার করতে শুরু করল, দ্রব্যমূল্যও বেড়ে গেল তখন ইরানে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত আদৌ সঠিক ছিল কিনা তাই নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যাই। আর এভাবে কতদিন টিকে থাকা সম্ভব সে নিয়েও সন্দেহ হচ্ছে। কেননা, এখানে এখন যত অর্থই আয় করি না কেন ডলারের তুলনায় সেটি কিছুই নয়’।

ইরানী মুদ্রার অবমূল্যায়নের সঙ্গে সঙ্গে ফাতেমার মাসিক আয় কমতে কমতে এখন ১৬০ ডলারে দাঁড়িয়েছে যা প্রথমদিকে ৮০০ ডলার ছিল। এর সাথে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো নারীদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ একদিকে যেমন দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে, তেমনি এদের দামও হয়ে গেছে আকাশচুম্বী। ফাতেমার মতে, এক্ষেত্রে ‘অলওয়েজ’ বা ‘কোটেক্স’-এর মতো পশ্চিমা ব্র্যান্ডের স্যানিটারি ন্যাপকিনের খোঁজ করা আসলে সম্পূর্ণ হতাশাজনক। ‘আমি নিজে সেগুলো একদিনে ছয় সাতটি ফার্মাসিতে খুঁজেছি কিন্তু কোথাও পাইনি’। এমনকি ফাতেমা শহরের ধনাঢ্য এলাকা জর্ডানেও এ ধরনের পণ্য খুঁজতে গিয়ে নিরাশ হয়েছেন। ইরানের ব্র্যান্ডগুলোর দামও কিন্তু কম নয়। সেগুলোও এখন অনেক দাম দিয়ে কিনতে হয়। যে পণ্য কিনতে ইতোপূর্বে এক লাখ রিয়াল ব্যয় করলে যথেষ্ট হতো সেটি এখন এক লাখ ষাট হাজার রিয়ালে বিক্রি হচ্ছে। ডলারের মূল্যমান অনুযায়ী এর পরিমাণ ৩.৮০ ডলার।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ-এর জেন্ডার বিশেষজ্ঞ আজাদেহ্ মোয়াভেনি বলছেন, ‘ক্ষুদ্র পর্যায়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে যা বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জীবনমানকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। একটা সময়ে এই নিষেধাজ্ঞায় মধ্যবিত্ত শ্রেণী নিঃস্ব হয়ে যাবে এবং নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনাগুলো সেভাবেই নকশা করা হয়েছে। পণ্যদ্রব্যের অপ্রাপ্যতা এবং অপর্যাপ্ততা একদিকে যেমন ক্রয়াতঙ্ক তৈরি করছে অন্যদিকে তেমনি মজুদাতঙ্ক তৈরি করছে।

২২ বছর বয়সী ইয়াসামান, স্নাতক শেষ করে নিজেদের পারিবারিক রেস্টুরেন্টে কাজ করেন। তিনি জানান, ‘মানুষ এখন নিতান্ত অপরিহার্য না হলে পারতপক্ষে কিছুই কিনছে না। আমি নিজে বিগত বেশ কিছুদিন ধরে কোনো কেনাকাটা করতে যাইনি, কারণ সবকিছুর দাম অস্বাভাবিক রকম বেড়ে গেছে। আমাদের রেস্টুরেন্টেও খাবারের দাম বাড়াতে হয়েছে। তবে ভোক্তারা জানে এ ছাড়া আমাদের অন্য বিকল্প ছিল না’।

এ দিকে গত মার্চে ইরানি নববর্ষীয় উত্সব নওরোজ পালনের পর আয়াতুল্লাহ খামেনি ইরানি জনগণকে অভ্যন্তরীণ উত্পাদন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ফাতেমা জানান, খামেনির এ আহ্বান অধিকাংশ মানুষকে স্পর্শ করেছে এমনকি রাজনৈতিকভাবে যারা খামেনির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন তাদেরও। তবে সমস্যা হলো স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত পণ্যের মূল্য আরো বেশি। ছোট শিশুদের ন্যাপী পর্যন্ত আমদানিকৃত কাঁচামাল থেকে প্রস্তুত করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নারী জানান, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইরানে নিম্নমুখী জন্মহার তৈরি করতে পারে। মানুষ এখন সন্তান গ্রহণের আগে দ্বিতীয়বার ভাবছে, কারণ ন্যাপী ও অন্যান্য ওষুধ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যাদি এখন ক্রয়সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে। এমনকি মোটামুটি সচ্ছল পরিবারগুলোরও নাগালের বাইরে চলে গেছে এ সব পণ্যের দাম।

ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত নারী অধিকার সুরক্ষায় ফেমিনা নামে একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এর পরিচালক সুসান তাহমাসেবি বলছেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা এলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে’। তার মতে, বিশেষ করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অর্থ স্থানান্তর (সুইফট) প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হওয়াটিই প্রধান সমস্যা।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তাত্ক্ষণিক ও দৃশ্যমান প্রভাবগুলো ছাড়িয়ে তথা পণ্যসংকট ও উচ্চমূল্য, এ দুটিকে একপাশে রেখে এর ভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ কঠোর নিষেধাজ্ঞা পারিবারিক গতিশীলতাকে দারুণভাবে ব্যাহত করতে পারে। বিশ্লেষকরা এমনটিই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক মোয়াভেনি এ প্রসঙ্গে বলছেন, ‘নারী যেহেতু স্বাস্থ্য সুরক্ষা, শিক্ষা এবং পুরো পারিবারিক জীবনের সংগঠক, সে হিসেবে প্রায়শই তার ওপর পরিবারের যে কোনো সংকটকে উত্তরণের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা বা সমাধান নিয়ে আসার চাপ পড়বে। যদি একটি সমাজে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা তাদের পরিবারের ভরণ পোষণে অসমর্থ হয়, বিশেষত ষখন সে সমাজ প্রথাগত এবং পিতৃতান্ত্রিক, যদি তারা তাদের লৈঙ্গিক দায়িত্ব সম্পূর্ণ করতে না পারে তখন সেটি এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং পুরুষতন্ত্র সেখানে অধিকতর জোরালো হয়ে ওঠে; যেটি আসলে একটি পরিবারে নারীর ভূমিকা যতটা গঠনমূলক হয়ে থাকে ততটা হয় না। আবার পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত আয় বা সহযোগিতা করার অক্ষমতা, পুরুষ সম্পর্কে পুরুষদের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তার জায়গাতেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে মার্কিন স্টেট সেক্রেটারি মাইকেল পম্পেও ফারসি ভাষায় টুইট করেছেন, ‘(মার্কিন) নিষেধাজ্ঞা ইরানের খাদ্য, কৃষিদ্রব্য, ওষুধ এবং চিকিত্সা যন্ত্রপাতি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। আমেরিকা ইরানের জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছে’। পম্পেও’র এ টুইট বাস্তবতার সাথে কতটুকু সঙ্গতিপূর্ণ হয় সেটাও একটা বড় বিষয়।

তবে পূর্বাপর প্রকাশিত পঞ্চাশটিরও বেশি গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, অতীতে ইরানের ওপর আরোপিত প্রতিটি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ মানবাধিকারকে প্রভাবিত করেছিল। নির্দিষ্ট বেশকিছু ওষুধের দুষ্প্রাপ্যতা ও জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের দরুন সাধারণ ইরানিদের জীবনমান ভয়াবহ রকম বিপর্যস্ত হয়েছিল। তাই হয়তো তাহমাসেবির কথায়ও ঝরেছে আক্ষেপ, ‘যদিও বলা হয়, ওষুধের ওপর নিষেধাজ্ঞা নেই, মানবিক সাহায্যের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, কিন্তু বাস্তবে কিছুই আসলে নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত নয়’।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন