খাশোগি হত্যার বিচার হবে তো!
১২ নভেম্বর, ২০১৮ ইং
খাশোগি হত্যার বিচার হবে তো!

তালেব রানা

 

সৌদি আরবের সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার দেড় মাস পার হতে চলেছে। তুরস্কের ইস্তাম্বুলস্থ সৌদি কনস্যুলেটে তাকে হত্যার কথা সৌদি আরব স্বীকার করলেও মরদেহ এখনো পাওয়া যায়নি। সৌদি আরবের কাছে মরদেহ ফেরত চাওয়া হলেও তারা এ ব্যাপারে কোনো সাড়া দেয়নি। প্রকৃত ঘটনা নিয়ে এখনো অন্ধকারে সবাই। তবে গত শনিবার তুর্কি সংবাদপত্র ডেইলি সাবাহ’র এক খবরে বলা হয়েছে, খাশোগির মরদেহ এসিডে গলিয়ে দেহাবশেষ ড্রেনে ফেলে দিয়েছে হত্যাকারীরা। সৌদি কনস্যুলেটের ড্রেনে এসিডের আলামত পাওয়া গেছে। এর আগে তুর্কি প্রেসিডেন্টের একজন উপদেষ্টা জানান, হত্যার পর খাশোগির মরদেহ টুকরো টুকরো করে তা এসিডে গলানো হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসাল জেনারেলের বাসভবনে হাইড্রোফ্লুরিক এসিড ও অন্যান্য রাসায়নিকের আলামত  পাওয়া গেছে। খাশোগির মরদেহ পাওয়ায় এই তথ্য অনেকটাই সত্য বলে মনে করা হচ্ছে।

সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের সনদ নিতে গত ২ অক্টোবর ইস্তাম্বুলস্থ সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর থেকে নিখোঁজ হন খাশোগি। গত ২০ অক্টোবর প্রায় ১৮ দিনের মাথায় সৌদি আরব স্বীকার করেছে যে, কনস্যুলেট ভবনেই খুন হয়েছেন খাশোগি। তবে প্রথমদিকে সৌদি আরব এই হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকারই করতে চায়নি। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বলেছে কনস্যুলেটে মারামারির সময় মৃত্যু হয়েছে খাশোগির। এরপর কয়েক দফা তারা এই ঘটনার ব্যাখ্যা বদলে শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছে খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে।

প্রথমদিকে, সৌদি আরব এই ঘটনার তদন্তে সৌদি কনস্যুলেট ও কনসাল জেনারেলের বাসভবনে অনুসন্ধানে তুর্কি কর্তৃপক্ষকে অনুমতি দেয়নি। পরে সৌদি আরব থেকে তদন্তের টিম আসার পর যৌথভাবে এই ঘটনা তদন্তের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এই টিমের সঙ্গে সৌদি আরব বিষ-বিশেষজ্ঞ ও রসায়নবিদদের পাঠায় হত্যাকাণ্ডের আলামত নিশ্চিহ্ন করতে। হত্যার তথ্য নিশ্চিহ্ন করতে কনস্যুলেটের ভেতর ও বাইরের সিসিটিভি ফুটেজ নষ্ট করার চেষ্টা করেছে সৌদি কর্মকর্তারা।

শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের তদন্তের তথ্য জানতে তুরস্ক সফর করেছেন সৌদি আরবের প্রধান প্রসিকিউটর। তিনি তুর্কি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি কনস্যুলেট পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু তার সফরে খাশোগি হত্যার তদন্তে সৌদি আরবের সহযোগিতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তুর্কি সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, তুরস্কের কাছে হত্যাকাণ্ডের কী কী প্রমাণ আছে তা জানার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক আগ্রহী ছিল সৌদি কর্মকর্তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তদন্তে সহযোগিতা করতে তাদের আগ্রহ কমই দেখা গেছে।

সম্প্রতি খাশোগি হত্যার ঘটনায় সরাসরি সৌদি আরবকে দায়ী করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপে এরদোয়ান। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে তিনি বলেন, খাশোগিকে হত্যার নির্দেশ সৌদি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এসেছে। তবে, এই ঘটনায় বাদশাহ সালমানের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে নিয়েও কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। যদিও সন্দেহের তীর শুরু থেকেই যুবরাজ সালমানের দিকে। কয়েক দিন আগেই এরদোয়ানের একজন উপদেষ্টা মন্তব্য করেন যে, খাশোগি হত্যার রক্ত লেগে আছে যুবরাজের হাতে।

তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান আরো বলেন, সৌদি আরবে আটক হওয়া ১৮ জনের মধ্যেই হত্যাকারীরা রয়েছে বলে আমরা নিশ্চিত। আমরা এও জানি যে, তারা শুধু একটি নির্দেশ পালন করছিল: খাশোগিকে হত্যা করে পালিয়ে যাও। এ হত্যাকাণ্ড যারা ঘটিয়েছে সেই ‘নাচের মাস্টারদের’ মুখোশ উন্মোচিত করা হবে। এরদোয়ান অভিযোগ করেন, ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেট সরাসরি মিথ্যা কথা বলেছে।           এই হত্যাকাণ্ড যারা ধামাচাপা দিতে চায় তাদের সামনে নিয়ে আশা হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ হত্যাকাণ্ড যে সৌদি আরবের শীর্ষ          পর্যায়ের নির্দেশে হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। বিশেষ করে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আছেন সন্দেহের শীর্ষে। এখন খাশোগি হত্যাকাণ্ডে এমন কিছু হয়েছে যে তথ্য প্রকাশে রাজি নয় সৌদি আরব। বিশেষ করে ক্ষমতাধর যুবরাজের কোনো ক্ষতি হয় এমন কিছু করবে না তারা! সম্প্রতি গুজব উঠেছে মোহাম্মদ বিন সালমানকে হয়তো সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই খবরে খাশোগির হত্যাকাণ্ডের নজর ঘুরে এখন অন্যদিকে চলে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা সত্য যে, সৌদি আরব এই ঘটনা ধামাচাপা দিতে ব্যস্ত। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সমালোচনা করে বলেছেন, খাশোগি হত্যাকাণ্ডকে খুব বাজেভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তবে তিনি সৌদি আরবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপে আগ্রহী নন। পশ্চিমা দেশগুলো এ ঘটনার রহস্য উদঘাটনে সৌদি আরবকে চাপ দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন শীর্ষ রাজনীতিক সৌদির সঙ্গে সম্পর্ক যাচাই করে দেখার দাবি জানিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে খাশোগি হত্যার ন্যায় বিচার নিয়ে সন্দেহ দানা বাধতে শুরু করেছে। খাশোগির হত্যার তদন্তে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার দাবি জানিয়েছে জাতিসংঘ। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এই হত্যাকাণ্ডে বিশ্ব ক্ষুব্ধ। বিনা বিচারে এই ক্ষোভ প্রশমিত হতে পারে না।

সম্প্রতি খাশোগির বাগদত্তা হেতিস চেঙ্গিজ হোয়াইট হাউসের অতিথি হতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দাবি করেন, খাশোগি হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আন্তরিক নয়। যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই হত্যাকাণ্ডের সত্য উদঘাটনে প্রকৃতপক্ষে তত্পর হন তবেই আমন্ত্রণ গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করবো। আন্তর্জাতিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এটা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রই সৌদি আরবকে চাপ দিয়ে খাশোগি হত্যার প্রকৃত তদন্ত করাতে পারে। স্বচ্ছ তদন্ত হলেই খাশোগির পরিবার ও স্বজনদের ন্যায় বিচার পাওয়ার দরজা খুলবে।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন