মিয়ানমারে চীনের বন্দরে উদ্বিগ্ন ভারত
১২ নভেম্বর, ২০১৮ ইং
মিয়ানমারে চীনের বন্দরে উদ্বিগ্ন ভারত
অলক বিশ্বাস

 

ভারতকে ‘জব্দ’ করতে প্রতিবেশি দেশগুলিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে চীন। দিল্লির আপত্তি অগ্রাহ্য করে পাকিস্তানের গবাদরে সমুদ্র বন্দর তৈরি করার পর এবার মিয়ানমারে কয়াকপিউতে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে চীন। সমুদ্র বন্দর নির্মাণ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে চলা আলোচনা অবশেষে চুক্তির পর্যায়ে পৌঁছেছে। নানা কারণে এতোদিন আটকে থাকা প্রকল্পের চুক্তি গত বৃহস্পতিবার স্বাক্ষরিত হয়েছে বেইজিংয়ে। অং সান সুচির সরকারের সঙ্গে চীনের এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিতে পারে চীন-ভারত সম্পর্কে।

মিয়ানমারে বন্দর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের আওতায় চীন-মিয়ানমারের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডর গড়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছে দুই দেশ। পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনের ইউনান প্রদেশ এবং মিয়ানমারের  কয়াকপিউ ও কুনমিংয়ের মধ্যে ইতিমধ্যেই প্রাকৃতিক গ্যাস ও তৈল সরবরাহ কার্যক্রম চালু রয়েছে। আর এবার মিয়ানমারের উপকূলে চীনের সমুদ্র বন্দর নির্মাণ হলে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিবেশি দেশগুলোকে প্রভাবিত করবে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অন্তর্গত বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ঐ গভীর সমুদ্র বন্দরের ৭০ শতাংশ মালিকানা থাকছে চীনের হাতে। প্রাথমিক চুক্তিতে চীনকে ৮৫ শতাংশ মালিকানা দেওয়ার কথা থাকলেও মিয়ানমারের জনগণের আপত্তির কারণে এখন তা কমিয়ে ৭০ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাত্ এই সমুদ্র বন্দরের ৭০ শতাংশ শেয়ারের মালিক হবে চীন এবং বাকী ৩০ শতাংশের মালিক হবে মিয়ানমার। বন্দর তৈরির বেশিরভাগ খরচও (প্রায় ৭০ শতাংশ) খরচ বহন করবে বেইজিং। আর বাক ৩০ শতাংশ খরচের যোগান দেবে মিয়ানমার সরকার।

চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র ‘দ্য গ্লোবাল টাইমস’-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সাল থেকে বন্দর তৈরি নিয়ে কথা চলছিল। প্রায় তিন বছর পর সেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। মিয়ানমারে চীনের এই সমুদ্র বন্দর নির্মাণ হলে প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নষ্ট হওয়ার আপত্তি তুললে তাতে কর্ণপাত করেনি চীন-মিয়ানমার। তাই বিষয়টি বেশ সতর্কতার সাথেই দেখছে ভারত। এর আগে গত বছর শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলীয় সমুদ্র বন্দর ‘হাম্বানটোটা’ চীনের কাছে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেওয়া নিয়েও প্রতিবেশি দেশ ভারতসহ জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগের আঙুল তুলেছিল।

মূলত সাত বছর আগে চীনের ঋণে নির্মিত হাম্বানটোটা সমুদ্র বন্দরটি পরিচালনা করতে গিয়ে ক্ষতির মুখে থাকায় বন্দরটিকে চীনের নিয়ন্ত্রণে দিয়ে দেয় শ্রীলঙ্কা। বন্দরটি চালু হওয়ার পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে লোকসান গুনছিল সরকার। এক পর্যায়ে সমুদ্র বন্দরটির ৮০ শতাংশ শেয়ার চীনের কাছে বিক্রির সিদ্ধান্তও নিয়ে বসেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণের চাপের মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে ১১২ কোটি ডলারে বন্দরটি ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেয়া হয় চীনের ‘মার্চেন্টস পোর্ট’র কাছে। শ্রীলঙ্কার এই সমুদ্র বন্দরটি এশিয়া ও ইউরোপের মূল শিপিং রুটের কাছে অবস্থিত। ওই বন্দরটিকে এখন চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন,  চীন এভাবে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করতে চাইছে।

চুক্তি অনুযায়ী, মিয়ানমারের অর্থনৈতিক বোঝা কমাতে সহায়তা করবে চীন। বন্দর তৈরিতে অর্থায়ন করবে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সিআইটিআইসি গ্রুপের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়াম। চুক্তির শর্ত চূড়ান্ত ও রূপরেখা চুক্তি সই হওয়ার বন্দর নির্মাণের কাজ শুরু হবে। ভারত সীমান্তের অদূরেই তৈরি হবে চীনের এই বন্দরটি। এ কারণে ভারতের জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে এই বন্দর। এর বাইরে চীন ও মিয়ানমারের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে শিল্প ও পরিকাঠামো তৈরির জন্য ১ হাজার ৭০০ হেক্টর এলাকা নিয়ে এই শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হবে। এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে তিনটি বৃহত্ প্রকল্প রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে চীনের স্বার্থ জড়িত। এর আগে পাকিস্তানের গবাদরে চীনের তৈরি বন্দর তৈরি নিয়েও ভারত-চীনের মধ্যে উত্তেজনার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। এসব কারণে এবার মিয়ানমারে চীনের সমুদ্র বন্দর নির্মাণ নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারতীয় কূটনীতিকরা। কারণ চীন প্রতিবেশি দেশগুলোতে এসব বন্দর নির্মাণ করে তাদের ঘিরে ফেলতে চাইছে বলে মনে করছে ভারত। ভারতের চিন্তার বড় কারণ, চীন বিনিয়োগের ফাঁদে ফেলে এসব দেশকে ভারতের বিপক্ষে ব্যবহার করবে। এমনকি যুদ্ধাবস্থার মতো পরিবেশ তৈরি হলে এসব দেশকে চীনের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করার আশঙ্কাও উঁড়িয়ে দেয়া যায় না।

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন