কিশোর মুক্তিযোদ্ধা
আলমডাঙার যুদ্ধে হাতে গুলি লাগে
গোলাম মোস্তফা দুলাল২৩ ডিসেম্বর, ২০১৬ ইং
আলমডাঙার যুদ্ধে হাতে গুলি লাগে
১৯৭১ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন বাবার চাকরির সুবাদে আমরা থাকতাম চুয়াডাঙা জেলার আলমডাঙায়। কিন্তু আমার গ্রামের বাড়ি ছিল বরিশাল। মার্চ মাসে যখন উত্তাল সমগ্র বাংলাদেশ তখন আমাদের স্কুলের বন্ধুদের মাঝেও সেই উত্তাপ ছুঁয়ে গিয়েছিল। আমরাও তখন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। তবে তখন আমাদের হাতিয়ার ছিল স্কুলের ল্যাবরেটরি থেকে কেমিক্যাল চুরি করে বানানো এসিড বোমা, গুলতি, ড্রাম কেটে বানানো ঢাল তলোয়ার এই সব। কিন্তু যখন সত্যি সত্যি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল তখন বুঝতে পারলাম পাকিস্তানিদের আধুনিক অস্ত্রের কাছে আমাদের এইসব কিছুই না। ততদিনে পাকিস্তানি আর্মির অত্যাচার, গণহত্যার খবর আসছে বিভিন্ন দিক থেকে। আর সেই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের খবর। আমাকেও নাড়া দিয়েছিল সেসব। একদিন আমি আর আমার বন্ধু সেকান্দার মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম—আমরাও যুদ্ধে যাব। কিন্তু সমস্যা হলো যদি বাসায় জানে তাহলে তো যেতে দেবে না। কারণ তখন তো আমি বাবা-মায়ের কাছে অনেক ছোট। আমার বয়স ছিল তখন তের বছর সাত মাস মাত্র। কিন্তু আমাদের তখন রক্ত টগবগ করছে—যুদ্ধে যাব। দুজনে মিলে পরিকল্পনা করলাম বাসা থেকে পালাব। আমি আগের দিনই ব্যাগ গুছিয়ে সেকান্দারের কাছে রেখে আসলাম। পরদিন পরিকল্পনামতো সকালবেলা কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে গেলাম বাসা থেকে। জায়গামতো গিয়ে দেখি সেকান্দার সেখানে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে। দেখা হওয়ার পর দুজনে মিলে হাঁটা শুরু করলাম ভারত সীমান্তের উদ্দেশে। আলমডাঙা থেকে ভারতের সীমান্ত প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার। সারাদিন চলছি তো চলছি, পথ আর শেষ হয় না। হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে সন্ধ্যাবেলায় গিয়ে আমরা ভারতে পৌঁছালাম। সেখানে গিয়ে শুনলাম ডোমপুকুর ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা ভর্তি করছে। আমরাও সেখানে গেলাম। দেখলাম যারা দেখতে একটু বড়সড় তাদের একে একে ডেকে নিচ্ছে কিন্তু আমাকে ডাকছে না। আমি তখন দেখতেও বেশ টিঙটিঙে ছিলাম। আস্তে আস্তে যখন হতাশ হয়ে যাচ্ছি তখন হঠাত্ যারা লোক ভর্তি করছিল তাদের মধ্য থেকে একজন বলল—তোমাদের মধ্যে যশোর, কুষ্টিয়া বা আশপাশের জেলা ছাড়া একটু দূরের কেউ আছ? আমার মাথায় তখন একটা বুদ্ধি ঝিলিক দিয়ে উঠল। আমি লাফিয়ে উঠে বললাম—আমি আছি, আমি বরিশাল থেকে এসেছি। তখন আমাকে ডাকল—তুমি আসো। আমি তো তখন ভীষণ খুশি, যুদ্ধে যাব। এরপর ভারতীয় একটা আর্মি-ট্রাকে করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো তত্কালীন বিহারের সিংভুম জেলার চাকুলিয়ায়। সেখানে একটি পরিত্যাক্ত এয়ারপোর্ট তখন গেরিলাদের ট্রেনিংয়ের জন্য ব্যাবহার করা হচ্ছিল। ওখানে আমরা ২৮ দিন ট্রেনিং নিলাম। তারপর সেখান থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি আমাদের নিয়ে আসা হলো কল্যাণীতে। কল্যাণী তখন ৮ নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টার। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর আবুল মঞ্জুর। এখানে আসার পর আমাদের যুদ্ধের জন্য অস্ত্র দেয়া হলো।

এদিকে হয়েছে আরেক বিপদ। আমাদের তখন কয়েকজন করে এক-একটি দলে ভাগ করে বিভিন্ন ক্যাম্পে পাঠানো হচ্ছিল। আমি যেহেতু ট্রেনিং ক্যাম্পে যোগ দেয়ার সময় বলেছি আমার বাড়ি বরিশাল, আমাকে দেয়া হলো বরিশালের কিছু ছেলের সঙ্গে। কিন্তু আমি তো বরিশালের কিছুই চিনি না। আমার বাবা-মা সবাই থাকে আলমডাঙায়। তখন গেলাম মঞ্জুর সাহেবের কাছে। তাকে খুলে বললাম সব। তিনি তখন আমাকে কুষ্টিয়ার একটা টিমের সঙ্গে দিলেন। এরপর ওখান থেকে আমাদের টিমকে পাঠানো হলো বানপুর ক্যাম্পে। ওখানে যাওয়ার ছয়-সাত দিন পরই আমরা ধোপাখোলা বিওপি আক্রমণ করি। ওটাই ছিল আমার প্রথম যুদ্ধ। কিন্তু সেই যুদ্ধে আমাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। অনেকেই আহত হয়েছিলেন। আর শহীদ হয়েছিলেন পাঁচ জন। এরপর তো কুষ্টিয়া, মেহেরপুর আর চুয়াডাঙা জেলার ভেতর অনেকগুলো গেরিলা অপারেশান সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করি। এর মধ্যে একবার আমরা মুন্সিগঞ্জ আর নীলমনি স্টেশনের মাঝামাঝি যশোর থেকে আসা একটা আর্মি ট্রেন উড়িয়ে দিয়েছিলাম। ট্রেনটিতে তিন কম্পার্টমেন্ট ভর্তি পাকিস্তানি সেনা ছিল আর ছিল ৩ কম্পার্টমেন্ট ভর্তি  গোলাবারুদ। ১২ নভেম্বর আমরা আলমডাঙা আক্রমণ করি। সে যুদ্ধে আমার হাতে গুলি লাগে। আমার মনে আছে—গুলি খাওয়ার পর আমি পিছু হটে হামাগুড়ি দিতে দিতে একটা ভাঙা কবরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেদিন সন্ধ্যার দিকে যখন আমাদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে আসছিল তখন আমরা পিছু হটে যাই। আমাকে সেই ভাঙা কবর থেকে উদ্ধার করে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়ে গেল। তবে সেই সময়ের স্মৃতিগুলো মনে পড়লে এখন নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়। তখনকার প্রতিটি দিনই এক-একটা গল্প। সেই গল্প লিখে কি আর শেষ করা যায়?

শ্রুতিলিখন : জহির দীপু

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৩ নভেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৫:১৭
যোহর১১:৫৮
আসর৩:৪২
মাগরিব৫:২১
এশা৬:৩৮
সূর্যোদয় - ৬:৩৭সূর্যাস্ত - ০৫:১৬
পড়ুন