গল্পটা যোদ্ধা বাবার
শাম্মী তুলতুল
২৩ ডিসেম্বর, ২০১৬ ইং
গল্পটা যোদ্ধা বাবার
সোহাবের বয়স দশ বছর। পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। জন্ম থেকেই দাদীর আদর-স্নেহে তার বেড়ে ওঠা। তার খাওয়া থেকে শুরু করে স্কুলে যাওয়াআসা সবই দাদীর সঙ্গে। সে সুবাদে দাদীর সব কিছু সে অনুকরণ করে, খেয়াল করে। তবে একটা বিষয় খুব ভালো করে তার কচি মনে ধরা পড়েছে, তা হলো দাদী প্রায় সময় নীরবে কাঁদে। জানতে চাইলে দাদী এড়িয়ে যায়, বলে, পরে বলব। তুই বড় হলে তখন বলব। কিন্তু দিনে দিনে সোহাবের যখন বোঝার বয়স হতে থাকে তখন লক্ষ করল, বিশেষ দিনগুলোতে দাদী খুব বেশি কাঁদে। যেমন—স্বাধীনতার মাসে। বিজয়ের মাসে। এখন ডিসেম্বর মাস চলছে। বিজয়ের মাস শুরু। যে মাসে আমরা বিজয় লাভ করেছিলাম। একদিন সোহাব দাদীকে কান্না করতে দেখে সামনে এসে দাঁড়ায়। বলে, দাদী, আজ তোমাকে বলতেই হবে তুমি কেন কাঁদো। কী তোমার কষ্ট? এখন আমি কিন্তু অনেক বড়। তুমি না বলেছিলে আমি বড় হলে বলবে। এখন সব বলতে হবে। আজ তুমি আমার কাছে কিছু লুকোতে পারবে না।

নাছোড়বান্দা সোহাবকে কোনোভাবে বুঝিয়ে যখন কাজ হলো না তখন দাদী শেষ পর্যন্ত বলতে শুরু করল। শোন ভাই আমার কান্নার রহস্য। এই কান্না একদিকে যেমন দুঃখের আবার অন্যদিকে তেমনই সুখের।

সোহাব অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করে, সেটা আবার কেমন দাদী?

এই এক সত্য কাহিনি। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ২৫ তারিখ রাত। শুরু হয় ইতিহাসের এক নির্মম, ভয়াবহ যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ।

তোর বাবা একদিন আমাকে বলে, আমি যুদ্ধে যাব মা।

বললাম, কী বলছিস তুই?

হ্যাঁ মা, ঠিক বলছি। দেশের খুব খারাপ অবস্থা। পাকিস্তানিরা আমাদের রেহাই দিচ্ছে না। আমার সব বন্ধু যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আমারও মন মানছে না। এই দেশ থেকে শত্রুদের তাড়াতে হবে। দেশের মানুষকে রক্ষা করতে হবে।

তুই কি পারবি?

তুমি দোয়া করলে অবশ্যই পারব মা।

বাধা দেইনি আর। দেশের স্বার্থে, দশের স্বার্থে তাকে উত্সাহ দিলাম। কিন্তু বুকটা দুরু দুরু করছিল। দুরু দুরু করলেও জানিস গর্বও হচ্ছিল। আমার সন্তান যুদ্ধ করে দেশকে ও দেশের মানুষকে রক্ষা করবে। তাই আমার মাথা আরও উঁচু হয়ে গেল। আমাকে সে সালাম করে বুকে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিয়ে চলে গেল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। আমি দু’চোখে যতদূর দেখা যায়, তাকিয়ে রইলাম । আর দেখতে পেলাম না। সেই থেকে আশায় রইলাম, ছেলে আমার ফিরে আসবে স্বাধীনতা নিয়ে।

আমার দেশের সোনার ছেলেরা যারা বেঁচে ছিল দীর্ঘ নয় মাস (মার্চ থেকে ডিসেম্বর) যুদ্ধ করে ১৬ ডিসেম্বর মাসে যে যার ঘরে ফিরে এল। কিন্তু তোর বাবা ফিরল না। তার বন্ধুরা যারা বেঁচে ছিল তারা বলল, আপনার ছেলে শহীদ হয়েছে মা। দেশের জন্য নিজের জীবন উত্সর্গ করেছে। কথাটা শুনে চুপ হয়ে গেলাম। কথা বলার ভাষা পেলাম না। আজও আমার শরীর কেঁপে ওঠে দাদু ভাই সেই কথা ভাবলেই। তাই বিজয়ের মাস এলে চোখের জল ধরে রাখতে পারি না। এই জল কষ্টের, একই সঙ্গে আনন্দেরও। মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে আমি খুবই গর্ববোধ করি।

তাহলে কি দাদী আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা? আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান?

হ্যাঁ ভাই, তুমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। সাহসী বীরযোদ্ধার সন্তান।

স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের কথা কত্ত শুনেছি শিক্ষকদের কাছে। মুক্তিযোদ্ধারা কত কষ্ট করে যুদ্ধ করেছিল। খেয়ে না-খেয়ে রাতদিন পাড় করেছিল। আমি সেই বীর যোদ্ধার সন্তান দাদী?

হ্যাঁ, তুমি সেই বীর যোদ্ধার সন্তান।

বাবার জন্য খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু অনেক গর্বও হচ্ছে।

 আমিও গর্বিত ভাই। আমি মুক্তিযোদ্ধার মা। আর তুমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।

দাদী কাল স্কুলুে গর্ব করে বাবার গল্প শোনাব আমার শিক্ষদের। আমার বন্ধুদের।

দাদী অনেক আদরে সোহাবকে বুকে জড়িয়ে ধরল।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৩ নভেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৫:১৭
যোহর১১:৫৮
আসর৩:৪২
মাগরিব৫:২১
এশা৬:৩৮
সূর্যোদয় - ৬:৩৭সূর্যাস্ত - ০৫:১৬
পড়ুন