ইউপিতে ফল ঘোষণায় ব্যাপক অনিয়ম
অনেক জায়গায় পাল্টে গেছে ফল, বিজয়ী হয়েছেন পরাজিত প্রার্থী!
সাইদুর রহমান১৩ জুন, ২০১৬ ইং
প্রাণহানি ও সহিংসতার কারণে সমালোচিত ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের ফল ঘোষণায় ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়েছে। বেশকিছু ইউপিতে পাল্টে গেছে ফলাফল। রিটার্নিং অফিসারদের কারসাজিতে যশোরের কেশবপুরের বিদ্যানন্দকাটি, নীলফামারীর জলঢাকার ধর্মপাল এবং চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর আহল্লা কড়লডেঙ্গা ইউপির পরাজিত প্রার্থীরা এখন নির্বাচিত চেয়ারম্যান। প্রিজাইডিং অফিসারদের স্বাক্ষর করা ফলাফল সিটসহ-নির্বাচন কমিশনে (ইসি) এমন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট তিন ইউপির বিজয়ী প্রার্থীরা। তাদের অভিযোগ, রিটার্নিং অফিসার কৌশলে ফলাফল পরিবর্তন করে পরাজিতদের বিজয়ী দেখিয়েছেন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মোঃ শাহ নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ফলাফল পরিবর্তনের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন যশোরের কেশবপুরের বিদ্যানন্দকাটি ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান কে.এম খলিলুর রহমান। গত ২৮ মে পঞ্চমধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৯টি কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারদের স্বাক্ষর করা ফলাফল সিটে ১১ ভোটে বিজয়ী হন তিনি। ৯টি কেন্দ্রে বিএনপি মনোনীত এই প্রার্থী ৪৬৮৫ ভোট পান, তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী পান ৪৬৭৪ ভোট। ১১ ভোটে বিজয়ী হওয়ার পর আনন্দ মিছিলও বের করেন সংশ্লিষ্ট ধানের শীষ প্রার্থীর সমর্থকরা। কিন্তু পরদিন সকালে অর্থাত্ ২৯ মে প্রিজাইডিং অফিসারদের ফলাফল একীভূত সিটে রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা কৃষি অফিসার সঞ্জয় কুমার দাস ওই ইউপির পরাজিত প্রার্থী আমজাদ হোসেনকে (আনারস) ৯ ভোটে বিজয়ী ঘোষণা করেন। ওই ইউপির ৫নং পরচক্রা পি.বি, এইচ মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার কুড়িহাটী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ শাহাজান আলী স্বাক্ষরিত ফলাফল সিটে দেখা গেছে, ওই কেন্দ্রে কে. এম খলিলুর রহমান পেয়েছেন ৮২৪ ভোট, মোঃ আমজাদ হোসেন ৭১৪ ভোট, আলমগীর হোসেন ৩, মো ঃ ইউনূস আলী ১০ এবং মোঃ ইব্রাহিম হোসেন ২৩৮ ভোট। কিন্তু রিটার্নিং অফিসারের একীভূত ফলাফল বিবরণীতে খলিলুর রহমানকে ৮১৪ ভোট এবং আমজাদ হোসেনকে ৭২৪ ভোট উল্লেখ করা হয়। ফলাফলে আমজাদ হোসেনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ৯টি কেন্দ্রে একীভূত ফলে খলিলুর রহমানকে ৪৬৭৫ ভোট এবং আমজাদ হোসেনকে ৪৬৮৪ ভোট দেখান রিটার্নিং অফিসার। এই রিটার্নিং অফিসারের বিরুদ্ধে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাছে  ভোটে জিতিয়ে দেয়ার জন্য দুই লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের লিখিত অভিযোগ করেছেন                 আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ইব্রাহিম হোসেন।

ফলাফল পরিবর্তনের বিষয়ে রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা কৃষি অফিসার সঞ্জয় কুমার দাস ইত্তেফাককে বলেন, ৫নং কেন্দ্রের যে ফলাফল সিটের কথা বলা হচ্ছে তা প্রিজাইডিং অফিসারের স্বাক্ষরিত নয়। প্রার্থী প্রিজাইডিং অফিসারের স্বাক্ষর জাল করে ফলাফল সিট তৈরি করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নেয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। তবে ওই প্রার্থী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, রিটার্নিং অফিসার একজন দুর্নীতিবাজ। বিজয়ী হওয়ার পরও রিটার্নিং অফিসার ঘুষ লেনদেন করে আমাকে পরাজিত দেখিয়েছেন। কেন্দ্র থেকে প্রিজাইডিং অফিসারের স্বাক্ষর করা ফলাফল সিট সরবরাহ করা হয়। জাল করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।

নীলফামারী জেলার জলঢাকার ধর্মপাল ইউপিতেও ফলাফল পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। ওই ইউপির স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান মোঃ মোশাররফ হোসেন লিখিত অভিযোগে দাবি করেছেন, নয়টি কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারের স্বাক্ষর করা ফলাফল সিটে তিনি ৪৫০১টি ভোট পান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী পান ৪৪০২ ভোট। কিন্তু রিটার্নিং অফিসার ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ শাহাজান পরাজিত প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করে নতুন আরেকটি ফলাফল ঘোষণা করেন। এক্ষেত্রে প্রিজাইডিং অফিসারের ফলাফল সিটের বিজয়ী প্রার্থীকে রিটার্নিং অফিসারের একীভূত সিটে ১০১ ভোট কম দেখানো হয়। বিজয়ী ঘোষণা করা হয় স্বতন্ত্র প্রার্থী জামিলুর রহমানকে (চশমা)।

এদিকে, চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার ১০ নং আহল্লা কড়লডেঙ্গা ইউপির আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মোঃ আবদুল ওয়াদুদ রিটার্নিং অফিসারের বিরুদ্ধে ফলাফল কারসাজির অভিযোগ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ৭নং ওয়ার্ডে আহল্লা সাধারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ফলাফল সিটে প্রিজাইডিং অফিসারের স্বাক্ষর ও সিল নেই। প্রিজাইডিং অফিসারের পরিবর্তে রিটার্নিং অফিসার নিজে স্বাক্ষর দিয়ে ফলাফল সিট প্রস্তুত করেন। এর আগে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার রমজান নগর ইউপির একটি কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারের ফলাফল সিটে ঘষামাজা থাকার কারণে ওই কেন্দ্রে পুনঃভোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ইসি।

বিজয়ী মেম্বার প্রার্থী পেলেন শূন্য ভোট

প্রার্থীর নাম হুমায়ন বেপারী, মোরগ প্রতীক নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মেম্বার প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন চারজনের সঙ্গে। সর্বোচ্চ ৪৯৫ ভোট পেয়ে তিনি নির্বাচিত হলেও তাকে শূন্য ভোট দেখানো হয়েছে। পরাজিত প্রার্থীকে তার প্রাপ্ত ভোট দেখিয়ে বিজয়ী ঘোষণা করেছে স্থানীয় নির্বাচন অফিস। ঘটনাটি ঘটেছে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ইমামপুর ইউপিতে গত ২৮  মে ৫ম ধাপের নির্বাচনে। ইমামপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর কেন্দে  ৩৯ নং কালিপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটগ্রহণ শেষে বিকেলে প্রিজাইডিং অফিসার মোহাম্মদ শাহাদত হোসেন কেন্দে র ফলাফল ঘোষণা করেন। প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৪৯৫ ভোট পাওয়ায় কেন্দ্রেই তিনি হুমায়ন বেপারীকেই নির্বাচিত ঘোষণা করেন। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় উপজেলায় ফলাফল ঘোষণাকালে। উপজেলায় এসে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তালা প্রতিকের মোঃ হারুন অর রশিদ মাখনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। অথচ তিনি ভোট পেয়েছেন ৪৪২। এ ঘটনায় হতভম্ব হুমায়ন বেপারী ৩৯ নং কালিপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী গজারিয়া সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ শাহাদত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি তার ভুল স্বীকার করেন। পরের দিন ২৯ মে মোহাম্মদ শাহাদত হোসেন স্বহস্তে উপজেলা নির্বাচন অফিসার এবং রিটার্নি অফিসার বরাবর ফলাফল সংশোধনের জন্য একটি লিখিত আবেদন করেন। প্রিজাইডিং অফিসার নির্বাচন অফিসে আবেদনের শেষে লিখেছেন ফলাফল সংশোধন করে মোরগ প্রতীকের হুমায়ন বেপারীকে সাধারণ সদস্য পদে বিজয়ী ঘোষণা করা হোক। তবে নির্বাচনের দশ দিন পার হয়ে গেলেও নির্বাচন কমিশন বিষয়টি নিয়ে কোন সংশোধনের উদ্যোগ না নেয়ায় হতাশা দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। এ বিষয়ে উপজেলা নিবাচন কর্মকর্তা আফরোজা খাতুনের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, এমন একটি আবেদন আমি পেয়েছি। প্রিজাইডিং অফিসার আমাকে ভুল ফলাফল দেয়ায় আমি তা ঘোষণা করেছি। এখন সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৩ জুন, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১১:৫৯
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৪৯
এশা৮:১৪
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৪
পড়ুন