বিএনপির কমিটি নিয়ে দলে উচ্ছ্বাস নেই
বিশেষ ব্যক্তিদের লোকজনের প্রাধান্য, ফখরুল ব্রাত্য পদবঞ্চিত আর অবনমনের শিকার বহু ত্যাগী নেতা
আনোয়ার আলদীন০৮ আগষ্ট, ২০১৬ ইং
বিএনপির সদ্য ঘোষিত বহু কাঙ্ক্ষিত কমিটি নিয়ে দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মীর মাঝে ক্ষোভ-হতাশা বিরাজ করছে। ক্ষুব্ধ তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতা। সাত বছর পর দলের নতুন কমিটি হলো অথচ কোন উচ্ছ্বাস নেই। সত্, ত্যাগী, পরীক্ষিত ও বিগত আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথের অগ্রগামী সাহসীদের প্রাধান্য দেওয়া হবে বলে চেয়ারপারসন যে ঘোষণা দিয়েছিলেন তা এই বিশাল কমিটিতে খুব সামান্যই প্রতিফলিত হয়েছে। পদ দেওয়া হয়নি সারাদেশের বহু সিনিয়র-জুনিয়র নেতাকে। পদাবনতি, অবনমন করা হয়েছে অনেক ত্যাগী নেতাকে। বঞ্চিতের তালিকায় পড়েছেন পোড় খাওয়া ও ত্যাগী অনেক সিনিয়র নেতা। তবে দেশের কোথাও কোথাও ক্ষোভের সাথে আনন্দ-উচ্ছ্বাসও ছিল। যাদের পছন্দের নেতাদের পদায়ন ঘটেছে তারা ঊচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। আবদুল্লাহ আল নোমানকে স্থায়ী কমিটিতে না রাখায় চট্রগ্রামে গণপদত্যাগের হুমকি দিয়েছেন নেতা-কর্মীরা। খুলনায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নুরুল ইসলাম দাদু ভাইকে কোনো পদ না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন সেখানকার নেতা-কর্মীরা।

সিনিয়র নেতাদের অনেকের মতো দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমানও ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, ‘যারা সত্, ত্যাগী ও বিগত আন্দোলন সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের অনেকেই নতুন কমিটিতে স্থান পাননি। এখানে সব চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে কমিটিতে জ্যেষ্ঠতা মানা হয়নি। বর্তমান কমিটিতে অনেক গ্যাপ রয়ে গেছে। এটা একটা হতাশার বিষয় এবং এ বিষয়টি নিয়ে অনেকেই হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, দলের পরিধি বেড়েছে। অনেক দিন কমিটি না হওয়ায় গ্যাপ বেড়েছে। বড় কমিটি দরকার আছে। বড় কমিটি দিয়ে বিএনপির সামনে যে চ্যালেঞ্জ তা সঠিকভাবে মোকাবিলা করা যাবে বলে আমি মনে করি।’ দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অন্যতম সিনিয়র নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন,কারা  কমিটি করেছে, কীভাবে করেছে আমরা সিনিয়ররা কিছুই জানি না। ম্যাডাম আমাদের কাছে কোনো দিন কিছু জানতে চাননি। অতীতে যত কমিটি হয়েছে ম্যাডাম আমাদের সঙ্গে আলাপ করতেন। অভিযোগের আঙুল তুলে তিনি বলেন, ‘বর্তমান কমিটি গঠনে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছেন চেয়ারপারসনের একজন সহকারী ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তারাই প্রভাব অক্ষুণ্ন রেখেছে। কমিটিতে ঐ দুই জনের পছন্দের লোকজনকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। ফলে অনেকেই কমিটিতে ঠাঁই পেয়েছেন যাদের যোগ্যতা বিশেষ ঐ দুই জনের আস্থাভাজন। তাদের পছন্দের লোককে দফতরেও পদায়ন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিতাড়িত করা হয়েছে বিরোধীদের।

কমিটি করার সার্বিক ক্ষেত্রে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। তাকে অপাঙক্তেয় রাখা হয়েছে। ব্রাত্য করা হয়েছে কমিটি গঠনে। এমনকি কমিটিতে ফখরুলের পছন্দের লোকজনকে তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। মহাসচিবের কাছের একটি সূত্র জানায়, কমিটি ঘোষণা সম্পর্কে মির্জা ফখরুল কিছুই জানতেন না। সকালে চেয়ারপারসনের একজন লোক তার হাতে কমিটির তালিকা ধরিয়ে দেন। যা তিনি সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দেন। গুলশান অফিসের একটি সূত্র জানায়, লন্ডন থেকে বিশেষ কয়েকটি পদের তালিকা আসে ঢাকায়। বাকিগুলো গুলশান অফিসে বসে করা হয়। লন্ডন থেকে যে তালিকা আসে তার কিছু কিছু কাটছাঁট করে ফেলে দেওয়া হয় বা অবনমন করা হয়।

এদিকে কমিটি ঘোষণার পর গতকাল দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং গুলশানে চেয়ারপারসনের অফিস ছিল নীরব-নিথর। কার্যালয়ে কর্মীদের ভিড় ছিল না।  দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘ভাইব্রেন্ট ও ডায়নামিক কমিটি’। দল চাঙ্গা হবে। তবে ভিন্ন চিত্র উঠে এলো প্রথম দিনেই।

এদিকে দেশের মতো বহির্বিশ্বেও প্রবাসী বিএনপি নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ। হতাশ। বিএনপির কমিটিতে প্রবাসীদের চরমভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। দলের আন্তর্জাতিক সম্পাদক এবং সহ আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে যাদের রাখা হয়েছে তারা প্রায় সকলেই লন্ডনের। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের কাউকে ঠাঁই দেয়া হয়নি। বিএনপির নতুন কমিটিতে ঠাঁই না পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে দলের নেতাদের অনেকেই ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। নতুন কমিটি নিয়ে ক্ষুব্ধ ও হতাশ নেতাকর্মীদের চাপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে ডেমোক্রেট পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের সমর্থনে নিউইয়র্কে দলের নেতাকর্মীদের সোমবারের সমাবেশ স্থগিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিএনপির সামনের দিনের কর্মসূচিও স্থগিত করা হয়েছে। তাদের দাবি, বছরের পর বছর ধরে দেশের বাইরে দলীয় কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি যারা এক এগারোর পর গ্রেফতার বিএনপি চেয়ারপারসন ও তারেক রহমানের মুক্তির দাবিতে বিশ্বজুড়ে প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন দলের নেতৃত্ব বাছাইয়ে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি।

তবে অনেক দেরিতে হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে খুশি অনেকেই। জেলা পর্যায়ে ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের পাশাপাশি ‘এক নেতার এক পদ’ নিশ্চিত করার দাবি তাদের। নেতাকর্মীরা কেউ কেউ মনে করেন, পদবঞ্চিতদের পদ প্রদান এবং অবমূল্যায়ন অপসারণ করলেই নবীন ও অভিজ্ঞ নেতৃত্বের এই কমিটির মাধ্যমে বিএনপির রাজনীতি আরো চাঙ্গা হবে।

প্রসঙ্গ যে, বিএনপি ঘোষিত নতুন কমিটিতে ১৭ জনকে জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে, ৭৩ জনকে উপদেষ্টা, ৩৫ জন ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব, সম্পাদক ও সহ-সম্পাদক মিলে ১৭৪ জন এবং সদস্য রাখা হয়েছে ২৯৩ জনকে। সদস্যদের মধ্যে ১১৩ জন নতুন। এ ছাড়া ৫০২ জন নির্বাহী কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। এদের ৪৯৪ জনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। বাকিদের নাম পরে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপি’র কেন্দ্রীয় ও মহানগর কমিটি নিয়ে

চট্টগ্রামে বিএনপি নেতা-কর্মীর ক্ষোভ

পদত্যাগের হুমকি

চট্টগ্রাম অফিস জানায়, বিএনপি’র কেন্দ্রীয় ও চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি ঘোষণার পর নেতা-কর্মীদের বিষাদ ক্ষোভ এবং উচ্ছ্বাসের মতো মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিএনপির কেন্দ্রীয় স্থায়ী কমিটিতে আবদুল্লাহ আল নোমানকে স্থান না দেয়ায় নগর বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিএনপি নেতা-কর্মীরা আবদুল্লাহ আল নোমানকে স্থায়ী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা না হলে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা এবং সংগঠনের দায়িত্বে থাকা নেতৃবৃন্দ পদত্যাগ করার হুমকি প্রদান করা হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম এবং সদ্য ঘোষিত নির্বাহী কমিটির শ্রম বিষয়ক সম্পাদক এএম নাজিম উদ্দিনসহ অর্ধ শতাধিক নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ পূর্বক গতকাল রবিবার উক্ত বিবৃতি দেয়া হয়। নেতা-কর্মীর পক্ষে ৬ নেতৃবৃন্দ স্বাক্ষরিত উক্ত বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর চট্টগ্রাম লালদীঘি জনসভায় আবদুল্লাহ আল নোমান জনগণের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দেশনেত্রী উপাধি দিয়েছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে বিএনপির সাথে থেকে চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী সংগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করে আসছেন। তাকে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত না করায় সর্বস্তরের নেতা-কর্মী হতাশ হয়েছে। আবদুল্লাহ আল নোমানকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়ার জন্য বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ আহবান জানান। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন এমএ সবুর, অ্যাড. আবদুস সাত্তার, কাজী বেলাল উদ্দিন, মোহাম্মদ আলী, আহমেদ উল আলম চৌধুরী রাসেল ও আলহাজ আবদুল মান্নান।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে খুলনার আগের নেতারাই বহাল

বাদ পড়েছেন প্রবীণ নেতা দাদু ভাই, তৃণমূলে ক্ষোভ

এনামুল হক, খুলনা অফিস জানান. বিএনপির সদ্যঘোষিত নির্বাহী কমিটিতে খুলনার আগের নেতারাই বহাল রয়েছেন। এবারের কমিটিতে নতুন কেউই স্থান পাননি। তবে বাদ পড়েছেন খুলনা মহানগর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এম নূরুল ইসলাম। বিএনপির কেন্দ্র থেকে সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের কাছে প্রবীণ এই রাজনীবিদ ‘দাদু ভাই’ নামে পরিচিত। আগের কমিটিতে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়লেও বিএনপির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি ছিলেন প্রথম কাতারের। বয়স তাকে আজও কাবু করতে পারেনি। তিনি বাদ পড়ায় খুলনা বিএনপির অধিকাংশ নেতা-কর্মীই হতবাক হয়েছেন। খুলনা বিএনপির তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী অভিযোগ করেছেন, সদ্য ঘোষিত কমিটিতে আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগী ও পরীক্ষিত যোগ্য নেতাদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। লঙ্ঘন করা হয়েছে জ্যেষ্ঠতা। যে কারণে বিএনপির নতুন কেন্দ্রীয় কমিটিতে বাদ পড়েছেন খুলনা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ভাষাসৈনিক ও সাবেক সংসদ সদস্য এম নূরুল ইসলাম দাদু ভাই।  ‘দাদু ভাই’ ভক্ত বিএনপি কর্মী জাহিদ কামাল টিটো ও সাহারুজ্জামান মুকুল বলেন, প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নূরুল ইসলাম দাদু ভাই। আশি ঊর্ধ্ব বয়স হলেও এখনো তিনি বয়সের কাছে কাবু হননি। দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিকে বাদ দেয়াটা বিএনপির ঠিক হয়নি। যিনি খুলনায় বিএনপির বীজ বুনলেন আর তাকেই উপড়ে ফেলা হলো। এতে তৃণমূলের বিএনপি নেতা-কর্মীরা হতাশ হওয়ার চেয়ে হতবাক হয়েছেন বেশি। দাদু ভাইয়ের সংসদীয় এলাকা রূপসা, দিঘলিয়া ও তেরখাদা উপজেলা বিএনপির নেতা-কর্মীরাও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৮ আগষ্ট, ২০১৯ ইং
ফজর৪:০৯
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৪০
এশা৭:৫৯
সূর্যোদয় - ৫:৩১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
পড়ুন