ভাগ্যবান একশ ‘শিক্ষক’
শিক্ষা কর্মকর্তা পদেই ঝোঁক তাদের
নিজামুল হক০৮ আগষ্ট, ২০১৬ ইং
সরকারি কলেজে পাঠদানের জন্য নিয়োগ পান শিক্ষা ক্যাডারে। কলেজে শিক্ষাদানের জন্য প্রশিক্ষণও পান। কিন্তু কলেজে শিক্ষক হওয়ার চেয়ে কর্মকর্তা হতেই পছন্দ তাদের। কারণ আছে বাড়তি নৈতিক-অনৈতিক সুবিধা, সাধারণ শিক্ষকদের জিম্মি করার ক্ষমতা। এ কারণে তদ্বিরের মাধ্যমে কলেজের শিক্ষকতার বাইরে থাকেন। যুক্ত থাকেন শিক্ষা অধিদপ্তর, বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড এবং শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরসহ (ডিআইএ) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। পাঠদানের বিষয়গুলোও ভুলে গেছেন তারা। 

এভাবে ১০ থেকে ২০ বছর কলেজের বাইরে থাকছেন এমন শিক্ষকের সংখ্যা একশ’র বেশি। কোনো কোনো শিক্ষক টানা ১০ থেকে ১৫ বছর কলেজের বাইরে। কোনো কোনো শিক্ষক ঘুরে-ফিরে ২০ বছর শিক্ষকতার বাইরে। বদলি করে কলেজে পাঠানো হলেও নানা কৌশল-তদ্বিরের জোরে দু-এক মাসের মধ্যেই আবার কলেজ ছাড়েন। একজন শিক্ষক মফস্বলের একটি কলেজ থেকে বদলি হয়ে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডে যোগদান করেন। চার বছর পর তিনি বদলি হন মতিঝিলে এনসিটিবিতে। সেখান থেকে ৫ বছর পর বদলি হয়ে আসেন শিক্ষা অধিদপ্তরে। এরপর বদলি হয়ে যান মফস্বলের একটি কলেজে। বদলির একদিন থেকে এক সপ্তাহের মধ্যেই বদলি হয়ে আসেন ঢাকায় পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় থাকছেন তিনি। এভাবে নানা কৌশলে ঢাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে থাকা শিক্ষকের সংখ্যা একশ’র বেশি।

মাউশির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন এসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট পদগুলো শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য। তবে এসব পদে দীর্ঘদিন থাকা নিয়মবিরোধী এবং অনৈতিক। সরকারি আদেশ অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একই স্থানে তিন বছরের বেশি থাকলে তাকে বদলি করতে হবে। সরকারের এই আদেশ অনুসারে এসব শিক্ষক দীর্ঘদিন একই স্থানে থাকতে পারেন না। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক মোঃ এলিয়াছ হোসেন বদলি সংক্রান্ত সরকারের এই প্রজ্ঞাপনের তথ্য দিয়ে বলেন, কলেজ শিক্ষকদের বদলির বিষয়ে পৃথক কোনো বিধিমালা নেই। সরকারের অন্য প্রতিষ্ঠানের বদলির নীতিমালা কলেজ  শিক্ষকদের জন্যও প্রযোজ্য। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় থাকা এসব শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডারে তৈরি হয়েছে সিন্ডিকেট। এরাই সাধারণ শিক্ষকদের হয়রানি করেন, অনৈতিক আয়ের মাধ্যমে কোটিপতি বনে গেছেন। ক্ষমতার জোরে তারা বলে বেড়ান: ‘কলেজে ছাত্রছাত্রী পড়াতে চাই না। বাধ্য হয়েই শিক্ষক হয়েছি।’ শিক্ষকরা এ সিন্ডিকেটের মূল উত্পাটনের দাবি জানিয়েছেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা শাখার উপ-পরিচালক এসএম বশির উল্লাহ জানান, তিনি এনসিটিবিতে ছিলেন ২০০২ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত। এরপর তিনি শিক্ষা অধিদপ্তরে আসেন। তিনি বলেন, অনেকে ২০-২৫ বছর ধরেই রয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা হয় না কেন ? অভিযোগ, এই শিক্ষক তার চাকরি জীবনের ২০ বছরের ১৮ বছরই শিক্ষকতার বাইরে। অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন: মন্ত্রণালয় রাখে বলেইতো আমরা আছি।

শিক্ষা অধিদপ্তরের মনিটরিং ও ইভাল্যুয়েশন উইংয়ের উপ-পরিচালক এসএম কামালউদ্দিন হায়দার জানান, তিনি ২০০৪ সালে কলেজ ছেড়ে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে বদলি হয়ে আসেন। পরে ঢাকা বোর্ড এবং বদলি হয়ে শিক্ষা অধিদপ্তরে আসেন। তিনি জানান, ঢাকা বোর্ড থেকে শিক্ষা অধিদপ্তরে আসার পূর্বে কলেজে শিক্ষকতা করেছি। তবে এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, চাকরি জীবনের অধিকাংশ সময়ই তিনি শিক্ষকতার বাইরে।

এনসিটিবির বর্তমান সচিব ইমরুল হাসান জানান, এই প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পূর্বে তিনি ঢাকা শিক্ষাবোর্ড এবং শিক্ষা অধিদপ্তরে ছিলেন। টানা ১০ বছরের বেশি শিক্ষকতার বাইরে থাকা এই শিক্ষক জানান, কলেজে পড়ান কোনো কঠিন বিষয় নয়। পরে সামান্য চর্চা করলেই হয়ে যাবে। মাউশির উপ-পরিচালক-২ মেজবাহ উদ্দিন সরকার, উপ-পরিচালক (বিশেষ) আবুল হোসেন, উপ-পরিচালক ফারহানা হক, তাজিবউদ্দিন, এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মোশতাক আহমেদ ভুঁইয়া, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ফজলে এলাহী দীর্ঘদিন ধরে ঘুরে-ফিরে শিক্ষকতার বাইরে রয়েছেন। মেজবাহউদ্দিন সরকার বলেন, দীর্ঘদিন কলেজের বাইরে থাকলে পাঠদানে একটু সমস্যা তো হবেই। আবার প্রশাসনে দক্ষ লোকেরও প্রয়োজন আছে।

কলেজের এক শিক্ষক বললেন, শিক্ষা বোর্ডে যুক্ত থাকার সুযোগ হলে বছরে ৯ থেকে ১০টি বোনাসসহ বিভিন্ন ভাতা পাওয়া যায়। এছাড়া অনৈতিক সুবিধাতো আছেই। কলেজ পরিদর্শন, অনুমোদনসহ বিভিন্ন খাতে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকেন সংশ্লিষ্টরা। বোর্ডের সব শাখায় এমন সুযোগ রয়েছে। তাই এই প্রতিষ্ঠানে থাকতে সবধরনের অর্থ বিনিময়ে রাজি তারা।

শিক্ষা অধিদপ্তরে থেকে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের মাধ্যমে অনৈতিক আয়ের সুযোগ থাকে। পরিকল্পনার শাখায় সংযুক্ত থাকলে বিভিন্ন ক্রয় কমিটির সদস্য হওয়া যায়। পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার কাজ হয়ে থাকে। প্রকাশকদের মাধ্যমে বড় অংকের অনৈতিক আর্থিক সুবিধা মেলে এখানে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানে থাকার জন্য মরিয়া তারা।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সভাপতি আইকে সেলিমউল্লাহ খন্দকার বললেন: আমরা শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতার বাইরে থাকার পক্ষে আমি নই। আমি মনে করি, শিক্ষা অধিদপ্তর, বোর্ড, এনসিটিবি, নায়েমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পদায়ন, সংযুক্তি বা ডেপুটেশনের ক্ষেত্রে রোটেশন প্রথা থাকা উচিত। তাহলে দীর্ঘদিন ধরে পাঠদানের বাইরে থাকার সুযোগ হবে না। এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক এসএম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, যারা শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন তাদের শিক্ষকতা পেশায় থাকা সমীচীন। যারা কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন তারা কর্মকর্তা হবেন। আমি মনে করি, শিক্ষকদের দীর্ঘদিন শিক্ষকতার বাইরে থাকা ঠিক নয়। এভাবে হলে পাঠদানের চর্চা কমে যায়।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৮ আগষ্ট, ২০১৯ ইং
ফজর৪:০৯
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৪০
এশা৭:৫৯
সূর্যোদয় - ৫:৩১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
পড়ুন