আতঙ্কে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী
ইয়াসমিন পিউ১৪ নভেম্বর, ২০১৬ ইং
২০১৪ সালের ২ আগস্ট, ৩৩ একর জমির জন্য খুন হন সাঁওতাল ঢুডু সরেন। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার কুশদহ ইউনিয়নের বড় কচুয়া গ্রামের এই সাঁওতাল পরিবারে এটাই প্রথম খুন নয়। এর আগে ১৯৬৪-৬৫ সালের দিকে ঢুডু সরেনের ঠাকুরদা ফাগু সরেনও জমিজমার বিরোধেই খুন হয়েছিলেন। এরপর ২০১১ সালে খুন হন ঢুডুর বড় চাচা গোসাই সরেনও।

একই পরিবারের এই তিনটি খুনের পেছনেই রয়েছে ভূমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ। শুধু এই পরিবার নয়, দেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের প্রধান সমস্যাই এখন ভূমি বিরোধ। জুমচাষকে কেন্দ্র করে চলত তাদের জীবিকা। কিন্তু জমি হারিয়ে, মামলায় জড়িয়ে দিনের পর দিন তারা নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। ভূমি থেকে উচ্ছেদ, নির্যাতন, মামলা, খুন, ধর্ষণ আর অপহরণের আতঙ্কে এখন দিন কাটছে তাদের।

২০১৪ সালের ৪ আগস্ট, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের জিনারপুরে একজন ওরাঁও নেত্রীকে ২২ বিঘা জমির জন্য ভূমিদস্যুদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। জমির লড়াইকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে গণধর্ষণের শিকার হন স্থানীয় ইউপি সদস্য এই নেত্রী। একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটছে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে। শুধু ঢুডু সরেন কিংবা ওরাঁও নেত্রীই নন; স্বাধীনতার পর থেকে রাজশাহী ও বৃহত্তর রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় বসবাসকারী সাঁওতাল, ওরাঁও, মুণ্ডা, মাহাতোসহ ২৭টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রায় ১৭ লাখ মানুষ এভাবেই নির্যাতিত হয়ে আসছেন। জমি-জমার বিরোধ নেই, ক্ষুদ্রজাতির এমন পরিবার হয়তো এখন আর খুঁজে পাওয়াই যাবে না। জমি দখলের জন্য ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীদের মামলা, জাল দলিল, জবর দখল, খুন, ধর্ষণ, হুমকি সবই ক্রমাগত চলছে তাদের ওপর। আর বিচার না পাওয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় অনেকেই পাড়ি জমাচ্ছেন সীমান্তের ওপারে।

সর্বশেষ গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জে জমি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। এ জন্য হামলা চালিয়ে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশের উপস্থিতিতে গুলিও ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। গুলিতে শ্যামল হেমব্রম নামের এক তরুণ চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান। পরে মারা যান আহত আরো দুজন। পল্লীর ২৫০০ মানুষের মধ্যে ২০০ মানুষ পাশের মাদারপুর গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন; বাকিরা পুলিশ ও দুর্বৃত্তের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

এর আগে চলতি বছর মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার নাহার খাসিয়া পুঞ্জির ৮৫ পরিবারকে উচ্ছেদের নোটিস দিয়েছিল জেলা প্রশাসন। আইন ও রীতি লঙ্ঘন করে চা বাগানের পক্ষে প্রশাসন এই অবৈধ কাজ করে। তবে গত ২ আগস্ট সিলেট বিভাগীয় কমিশনার উচ্ছেদ নোটিসটি বাতিল করে দিয়েছেন। এই যাত্রায় খাসিয়ারা উচ্ছেদের হাত থেকে রক্ষা পেলেও বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের খাসিয়া ও গারোদের ভূমি সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। জেলার বড়লেখা উপজেলার পাল্লাতল খাসিয়া পুঞ্জির ৩৫০ গারো ও খাসিয়া পরিবার তাদের ৩৬০ একর জমি বেহাত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। এর আগে জীবন রক্ষার জন্য শ্রীমঙ্গল উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা বনের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ১৮৭টি পরিবার ভারতের সীমান্তে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। পরে পরিবারগুলোকে দেশে ফিরিয়ে আনা হলেও বর্তমানে তারা নিরাপত্তাহীনতায় বসবাস করছেন।

এদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে টাঙ্গাইলে মধুপুর গড়ের ১৪টি আদিবাসী গ্রামকে রিজার্ভ ফরেস্ট ঘোষণা করায় সেখানকার গারো ও কোচ জনগোষ্ঠী উচ্ছেদের হুমকির মুখে পড়েছে। একইভাবে পটুয়াখালী-বরগুনা অঞ্চলের রাখাইন সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হওয়ার পথে। তাদের জমিজমা, মন্দির, শ্মশান, ভিটেমাটি সব দখল হয়ে গেছে। এক সময় ওই অঞ্চলে লক্ষাধিক রাখাইন বাস করলেও এখন তাদের সংখ্যা আড়াই হাজারের নীচে নেমে এসেছে। অনেকেই দেশান্তরিত হয়েছেন অথবা অন্যত্র চলে গেছেন নিরাপত্তাহীনতার কারণে। একইভাবে কুমিল্লা-চাঁদপুর অঞ্চলে এক সময় লক্ষাধিক ত্রিপুরা বাস করলেও সেখানে বর্তমানে সর্বসাকল্যে হাজার পাঁচেক ত্রিপুরা রয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ, খুন, নির্যাতন, মিথ্যে মামলা, নারী ধর্ষণ— এসব আতঙ্ক এখন তাদের নিত্যসঙ্গী। এভাবে পাহাড় কিংবা সমতলে প্রতিনিয়ত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, ‘জমি-জমা কেড়ে নেওয়ার জন্যই ক্ষুদ্রজাতির ওপরে এত নির্যাতন। জমির জন্য খুন-ধর্ষণ, মামলা-হামলা এসব লেগেই আছে। প্রশাসন সব সময়ই সন্ত্রাসী-ভূমিদস্যুদের পক্ষ নেয়। এ কারণে ক্ষুদ্রজাতির মানুষেরা কোনো বিচার পায় না। চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে দেশান্তরী হচ্ছেন। ওপারে যে তারা খুব ভালো আছেন, তা-ও নয়। সেখানে তারা দিনমজুরি করে আধপেটা খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলেই ক্ষুদ্রজাতির মানুষের ওপর নেমে আসছে নির্যাতন।’

বেসরকারি সংস্থা কাপেং ফাউন্ডেশনের ২০১৫ সালের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসীরা আদিবাসীদের ৮৪টি বাড়ি-ঘর ধ্বংস ও ৩৫টি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটতরাজ করেছে। ৪৫টি আদিবাসী পরিবার উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। এ ছাড়া ১৪০০ পরিবার উচ্ছেদ আতঙ্কে রয়েছে।

‘বাংলাদেশের আদিবাসীদের মানবাধিকার প্রতিবেদন-২০১৪’ অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষের ৫৪টিরও বেশি ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী বাঙালি সেটেলার ও ভূমিদস্যুরা। ২০১৩-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের অন্তত ২০০ পরিবার প্রতিবেশী দেশ ভারতে চলে গেছেন। এ সময় সারা দেশে কমপক্ষে ৩৪৬টি পরিবারে লুটপাট হয়েছে। ১১ আদিবাসী খুন হয়েছেন। ২৬টি পরিবারকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৫০ জনের বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে, ৩০ জনকে আহত, ১৭ জনকে আটক ও ২ জনকে হত্যা করা হয়েছে।

‘আদিবাসী দিবস-২০১৬’ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) অভিযোগ করে বলেন, ‘বর্তমান সরকার বলছে, দেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসরত হাজার হাজার আদিবাসী মানুষের জীবনে এ কথার প্রতিফলন নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘন, ভূমি দখল, নিপীড়ন ও নির্যাতনে আদিবাসীরা বিপর্যস্ত। এসডিজিতে জাতিসংঘ আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নের কথা বলেছে, অথচ এ দেশে আদিবাসীদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে।’

সন্তু লারমা আরো বলেন, ‘আদিবাসীদের বঞ্চনার মাত্রা শিক্ষা থেকে শুরু করে ভূমি অধিকার, এমনকি বেঁচে থাকার অধিকার পর্যন্ত বিস্তৃত। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও দেশের ৩০ লক্ষাধিক আদিবাসী জনগণ মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। সম্পূর্ণ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ক্রমাগতভাবে আদিবাসীদের ভূমি অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আদিবাসী জনগণ নিজভূমিতেই সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে।’

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৪ নভেম্বর, ২০২০ ইং
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৮
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন