শতবর্ষে নওগাঁর প্যাড়া সন্দেশ
শতবর্ষে নওগাঁর প্যাড়া সন্দেশ
বড় কড়াইয়ে দুধ জ্বাল হয় তারসঙ্গে মেশানো হয় চিনি। এই দুধ জ্বাল হতে হতে ক্ষির জমে আসে। এর পরেরটাই আসল। ঠিক কখন যে জ্বাল দিয়ে জমে আসা ক্ষিরটাকে তুলতে হবে সেই আন্দাজেই প্যারা সন্দেশের স্বাদ। মনে হতে পারে, এটা কোনো ব্যাপার নাকি। এটা বানাতে তো যে কেউ পারে। কিন্তু তিন লাইনে লেখার মত এত সহজ ব্যাপার না ‘প্যাড়া’ সন্দেশ বানানো। যদি হতো তাহলে আর স্বাদের তফাত্ থাকতো না। স্বাদের তফাত্ থাকে বলেই নওগাঁর ‘প্যাড়া’ সন্দেশের এমন জগেজাড়া খ্যাতি।

শহরের শ্রীশ্রী বুড়ী কালি মন্দিরের প্রধান ফটক সংলগ্ন ছোট ছোট কয়েকটি মিষ্টির দোকান রয়েছে। এগুলোকে বলা হয় ভোগের দোকান। দেবীর আরাধনায় মিষ্টির প্রয়োজনেই বানানো শুরু হয় এই সন্দেশ। পরবর্তী সময়ে এই সন্দেশ শুধু দেবির আরাধনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্বাদের কারণে এই সন্দেশের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে আশেপাশের অঞ্চলে।

বাঙালির সামাজিকতা ও খাদ্যতালিকায় মিষ্টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিয়েসহ যে কোনো অনুষ্ঠান মিষ্টি ছাড়া চলে না। কারো ভালো খবর থাকলে তিনি সকলকে মিষ্টিমুখ করিয়ে সে আনন্দ উদযাপন করেন। তাই বাঙালির কাছে আনন্দ উদযাপন মানেই মিষ্টিমুখ করানো। তো সেই বাঙালির মুষ্টিমুখের জন্য যে মিষ্টির নানা আয়োজন থাকবে তা তো জানা কথাই। সেসব নানা স্বাদের মিষ্টি নিয়ে একেকটি এলাকার ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়। বাঙালি মিষ্টির দুটি ধারা- সন্দেশ এবং রসগোল্লা। সন্দেশের ইতিহাস সুপ্রাচীন। তবে দুধ জ্বাল দেয়া মিষ্টি অবাঙালি মুসলিমদের উদ্ভাবন। ধারণা করা হয়, পারস্যের ঐতিহ্যের ধারায় ভারতে এর প্রচলন। আর দুধ ফাটিয়ে ছানা দিয়ে মিষ্টি বানানো এটা বাঙালিদের নিজস্ব উদ্ভাবন।

আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করেও একেক অঞ্চলে একেক ধরনের মিষ্টি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। বাংলার মিষ্টির অভিনবত্ব তার উপকরণে। ভারতবর্ষে ছানার ব্যবহার আদৌ ছিল না। ভারতে পশ্চিমবঙ্গ বাদে অন্যান্য রাজ্যে মিষ্টি প্রস্তুত হয় ছোলা, ডাল, বেসন, আটা প্রভৃতি উপকরণ দিয়ে।

সন্দেশের সূত্রপাত

প্রাচীনকালে ধান ও আখ চাষের ওপর ভিত্তি করে মিষ্টি বানানোর ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। অতিথিকে ‘গুড় জল’ দিয়ে সম্মানিত করা ছিল বাঙালিদের একটি প্রাচীন রীতি। আখ, তাল ও খেজুর রস থেকে গুড় ও তালমিছরি তৈরির ধারা গড়ে ওঠে গ্রামে গ্রামে। গুড়ের সঙ্গে নারকেল, চিড়া, খই ও মুড়ি মিশ্রিত করে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করা হয়। দুধ ও আতপ চালের সঙ্গে গুড় বা চিনি মিশিয়ে তৈরি হয় পায়েস, পিঠা-পুলি ইত্যাদি।

মধ্যযুগে ছানা আবিষ্কারের ফলে বাঙালির মিষ্টি-সংস্কৃতি বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ছানা ব্যবহারের আগে উদ্ভিজ্জ উপাদান হিসেবে বেসন, নারকেল, মুগডাল ও ময়দার ব্যবহার এবং প্রাণিজ উপাদান হিসেবে ক্ষিরের ব্যবহার হতে দেখা যায়। টকের সাহায্যে দুধকে ফাটিয়ে যা তৈরি করা হয় তাকে বলা হয় ছানা। এর সঙ্গে একটি সংস্কার বা বিশ্বাস জড়িয়ে আছে। দুধকে ফাটিয়ে ছানা তৈরি করা হয় বলে তা অবাঙালি ভারতীয়দের কাছে অচ্ছুত্ ও অভোজ্য। এজন্য বাংলার বাইরে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে ক্ষিরকেন্দ্রিক মিষ্টি বানানোর ধারা সৃষ্টি হয়েছে। ছানার তৈরি মিষ্টিতে কোনো আমিষ থাকে না। বৈষ্ণবরা নিরামিষভোজী হওয়ায় বৈষ্ণব ধর্মের প্রসারের যুগে (১৬ শতক থেকে) ছানার মিষ্টির ব্যবহার বেড়ে যায়। সন্দেশ তো এখন শত রকমের তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে নাটোরের কাঁচাগোল্লার যেমন সুখ্যাতি রয়েছে তেমনি খেজুরের নলেন গুড়ের সন্দেশ তো বাঙালির খুব প্রিয়। এ ছাড়াও বরিশালের গুটি সন্দেশেরও সুনাম ছড়িয়েছে বেশ। সন্দেশের মধ্যে রয়েছে তালশাঁস, আম সন্দেশ।

প্যাড়া কাহিনি

সন্দেশের রং হালকা খয়েরি। এ সন্দেশগুলো প্রস্থে প্রায় আধা ইঞ্চি আর লম্বায় ২ ইঞ্চি হয়। এ মিষ্টির অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এতে দুধ আর চিনি ছাড়া অন্য কোনো উপকরণ ব্যবহার করা হয় না। ক্ষির যখন হাতায় জড়িয়ে আসে তখন গরম গরম সেই ক্ষির দু হাতের তালু দিয়ে রোল করে সামান্য চাপ দিলেই তৈরি হয়ে যায় হালকা খয়েরি রঙের প্যাড়া সন্দেশ। ৭৫ থেকে ৮০টি প্যাড়া সন্দেশের ওজন হয় এক কেজি। এক কেজি সন্দেশ তৈরি করতে দরকার হয় ৭ লিটার তরল দুধ। দুধ আর চিনি ছাড়া অন্য কোনো উপকরণ না থাকায় এই সন্দেশ স্বাভাবিকভাবে রাখা যায় ১০ থেকে ১৫ দিন। আর কৃত্রিম উপায়ে ভালো রাখা যায় এক মাসেরও বেশি সময়।

নওগাঁর প্যাড়া সন্দেশ

প্রধানত প্যাড়া সন্দেশের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে কালিতলার শতবর্ষী ‘নওগাঁ প্যাড়া সন্দেশ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’-এর জন্য। বৈদ্য রতন দাস এখন নওগাঁর ঐতিহ্যের প্যাড়া সন্দেশের ধারক। তবে তাদের পূর্বপুরুষ শহরের কালীমন্দিরের পাশে পূজার প্রসাদ হিসেবে ব্যবহারের জন্য শুরু করেছিলেন প্যাড়া সন্দেশ বানানো। নওগাঁসহ আশপাশের অঞ্চলে এই কালীমন্দিরের বেশ নামডাক আছে। জাগ্রত মন্দির হিসেবে পরিচিতি রয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে রথ টানা হয়, বসে রথের মেলা। মানুষের আনাগোনা বাড়তে থাকে আর মুখে মুখে ফিরতে থাকে এই প্যাড়ার স্বাদের কথা।

বৈদ্য রতন দাস জানালেন, বংশ পরম্পরায় এখানকার মিষ্টির কারিগররা নিরবচ্ছিন্নভাবে তৈরি ও সরবরাহ করে যাচ্ছেন নওগাঁর বিখ্যাত ‘প্যাড়া’ সন্দেশ। স্বাদ ও মানের দিক থেকে এই প্যাড়া সন্দেশ অতুলনীয়। দেশের মধ্যে পূজা, ঈদসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানেই শুধু নয় আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেও নিয়ে যাওয়া হয় এই সন্দেশ। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নওগাঁর ‘প্যাড়া সন্দেশ’-এর চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি সন্দেশের দাম ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা।

শহরের আরেক ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান ‘নওগাঁ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’-এর স্বত্বাধিকারী নাজমুল হক বললেন, নওগাঁর ‘প্যাড়া’ সন্দেশের চাহিদা বেশি। এটা নওগাঁর ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

নওগাঁ জেলা পূজা উদ্যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিভাষ মজুমদার জানান, আগে পূজা আর পারিবারিকভাবে এই সন্দেশের ব্যবহার সীমাবদ্ধ ছিল। তবে এখন আত্মীয়ের বাড়ি নিয়ে যাওয়া, কোনো আত্মীয় এলাকায় এলে বা যে কোনো অনুষ্ঠানে প্রথম পছন্দে উঠে এসেছে ‘প্যাড়া’ সন্দেশ।

জেলার একুশে পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট ডিএম আব্দুল বারি বললেন, “জেলার হাতেগোনা কয়েকটি ঐতিহ্যের মধ্যে ‘প্যাড়া’ সন্দেশ অন্যতম। কিন্তু স্থানীয় এসব খাবারের প্রচার খুব কম। স্থানীয় প্রশাসনেরও এসব বিষয়কে জাতীয় পর্যাযে তুলে ধরবার ক্ষেত্রে কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।”

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৭ জানুয়ারী, ২০২১ ইং
ফজর৫:২১
যোহর১২:০৫
আসর৩:৫১
মাগরিব৫:৩০
এশা৬:৪৭
সূর্যোদয় - ৬:৪২সূর্যাস্ত - ০৫:২৫
পড়ুন