চোরাচালানের স্বর্ণ কতটুকু ধরা পড়ে
১০ আগষ্ট, ২০১৭ ইং
‘গোপন সংবাদ’ না পেলে ধরা পড়ে না চালান

পিনাকি দাসগুপ্ত

মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩১ কেজি স্বর্ণবার জব্দ করেছে ঢাকা কাস্টমস হাউস। গত শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে এক যাত্রীর নিকট থেকে ২৫ কেজি এবং পরের দিন রবিবার সকালে একটি ফ্লাইটের টয়লেট থেকে ৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে গত সাত মাসে শাহজালাল বিমানবন্দরে আটক করা হয়েছে ১১০ কেজি স্বর্ণবার। আর গ্রেফতার হয়েছে ১৩ জন। যারা সবাই স্বর্ণ বহনকারী। কাস্টমসের দাবি, সব স্বর্ণ চালানই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ধরা হয়। বিমানবন্দরের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, যে পরিমাণ স্বর্ণ পাচার হয় তার দশ ভাগের একভাগ ধরা পড়ে। তাও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বনিবনা না হওয়ার কারণেই ধরা পড়ে।

তবে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আগে এ রকম হলেও হতে পারে। তবে বর্তমানে সে অবস্থা নেই। তিনি বলেন, স্থানীয় গোয়েন্দা নেওয়ার্ক এবং বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। বিমানবন্দরে কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করায় স্বর্ণ চোরাকারবারিরা চাপের মধ্যে আছে। বর্তমানে দেশে স্বর্ণের দাম বেড়ে গেছে। তাই অধিক লাভের জন্য চোরকারবারিরা ঝুঁকি নিয়েই স্বর্ণ আনছে। কারণ স্বর্ণের চালান আনতে ১০/২০ হাজার টাকায় বাহক পাওয়া যাচ্ছে। চরম ঝুঁকির মধ্যেও যদি ২/১টি চালান আনা যায় এটা ভেবেই চোরাচালানিরা স্বর্ণ আনার চেষ্টা করছে।

সবই গোপন সংবাদে অভিযান: এ যাবত্ যত স্বর্ণ আটক করা হয়েছে তার সিংগভাগই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হয়েছে। বিমানবন্দর কাস্টমস থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়ে থাকে। প্রতিদিন বিমানবন্দর দিয়ে কয়েক হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। এসব যাত্রীর লাগেজে অবৈধ মালামাল আছে কিনা তা পরীক্ষার জন্য গ্রিন চ্যানেলের সামনে রয়েছে স্ক্যানার। যখন স্ক্যানারের সামনে অনেক ভিড় থাকে তখন চোরাকারবারিরা স্ক্যানারের সামনে যায়। এ সময় স্ক্যানকারী ব্যক্তি ইশারা করলেই তারা সেখান থেকে বের হয়ে যায়। এ সময় অনেক যাত্রী থাকার কারণে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও তেমন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন না।

তবে এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। তারা বলেন, বিমানবন্দর আগের চেয়ে আনেক নিট অ্যান্ড ক্লিন। আমরা সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিং করে থাকি। তারা আরো বলেন, প্রতিদিন বিমানবন্দরে কয়েক হাজার যাত্রী বাইরে থেকে আসেন; কিন্তু স্ক্যানার রয়েছে মাত্র একটি। এখানে সার্বক্ষণিক যাত্রীদের প্রচণ্ড ভিড় থাকে। কোনো ফাঁকে কেউ স্ক্যান না করে বের হয়ে যেতে পারে, এটা অস্বাভাবিক নয়। তবে চোরাকারবারিদের সঙ্গে সখ্যতা করে কেউ বের হয়ে যাবে এ অভিযোগ সঠিক নয়।

বিমানবন্দরের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, বাহক টাকার লোভে স্বর্ণ বহন করে। মাঝে মধ্যে ধরা পড়বে এমন ঝুঁকি নিয়েই তারা কাজটি করে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানে রয়েছে একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার কতিপয় দুর্নীতিবাজ কমকর্তা-কর্মচারী। তাদের যোগসাজশে স্বর্ণ পাচার হচ্ছে। তবে বনিবনা না হওয়ার কারণেই মাঝে মধ্যে ধরা পড়ে স্বর্ণ। আর যে পরিমাণ স্বর্ণ ধরা পরে তা পাচার হওয়া স্বর্ণের দশ ভাগের এক ভাগ। সূত্র জানায়, শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রতিদিন দশ হাজার যাত্রী বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে ফেরেন। এদের সবার লাগেজ স্ক্যান করার সুযোগ নেই। ব্যাগেজ রুল অনুয়ায়ী কাস্টমস মোট লাগেজের ৫ ভাগ স্ক্যান করতে পারে। আর এ সুযোগটাই কাজে লাগায় চোরাচালানিরা।

বৈধভাবে কী পরিমাণ স্বর্ণ বহন করা যাবে: ঢাকা কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার আহসানুল কবীর বলেন, ১০০ গ্রাম (প্রায় সাড়ে ৮ ভরি) ওজনের স্বর্ণবার বৈধভাবে আনতে ট্যাক্স দিতে হয় ৩০ হাজার টাকা। তবে আগে থেকেই ঘোষণা দিতে হবে। তবে ঘোষণা ছাড়া এনে ধরা পড়লে দিতে হবে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ট্যাক্স। তবে ১০০ গ্রাম ওজনের অলংকার শরীরে পড়ে আসলে কোনো ট্যাক্স দিতে হবে না।

২৫ কেজি স্বর্ণ বাহক রিমান্ডে: গত শনিবার রাতে ২৫ কেজি স্বর্ণবারসহ আটক জামিল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে বিমানবন্দর থানা পুলিশ। গতকাল বুধবার ছিল রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বিমান বন্দর থানার এসআই সুকান্ত কুমার সাহা বলেন, জামিল স্বর্ণ পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করছে। সে জানিয়েছে, চিকিত্সার জন্য সে ৪ আগস্ট সিঙ্গাপুর গিয়েছিল। ৫ আগস্ট দেশে ফেরার সময় এক ব্যক্তি তাকে জোর করে স্বর্ণ ধরিয়ে দেয়। এগুলো বিমানবন্দরে এক লোক রিসিভ করার কথা ছিল। অপর এক প্রশ্নের জবাবে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, যেটা ধরা পড়ে তার পরিমাণই জানা সম্ভব। এর বাইরে কি পরিমাণ স্বর্ণ পাচার হয় তা বলা মুশকিল।

ট্রানজিট রুট: সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে স্বর্ণ আমদানি শুল্ক বেড়ে যাওয়ায় আমদানির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। তাই চোরাই পথে বাংলাদেশ দিয়ে স্বর্ণ পাচার হচ্ছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ভারতে পাচার কালে যশোরের বেনাপোল সীমান্ত এলাকা থেকে ৩৫টি স্বর্ণের বারসহ মোমিন নামে এক পাচারকারীকে আটক করেছে বিজিবি। তার শরীর তল্লাশি করে চার কোটি টাকা মূল্যের এসব স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। আটক মোমিন বিজিবিকে জানিয়েছেন, স্বর্ণের চালানটি তিনি ঢাকা থেকে নিয়ে এসেছিল।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১০ আগষ্ট, ২০২০ ইং
ফজর৪:১১
যোহর১২:০৪
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৩৯
এশা৭:৫৭
সূর্যোদয় - ৫:৩২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৪
পড়ুন