বৈদেশিক খাত নিয়ে রয়েছে আতঙ্ক
অর্থনীতি নিয়ে সিপিডির বিশ্লেষণ
ইত্তেফাক রিপোর্ট০৪ জুন, ২০১৮ ইং
দেশের আর্থিক খাত নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বৈদেশিক খাত নিয়ে আতঙ্ক রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডয়ালগ (সিপিডি)। রেমিট্যান্স, বৈদেশিক সহায়তা, রপ্তানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীতে আমদানি বাড়ছে অস্বাভাবিকভাবে। ফলে চলতি হিসাবে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছে সিপিডি।

গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে চলতি অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বক্তব্য দেন। দেবপ্রিয় বলেন, টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে, এই আমদানি তথা বিভিন্ন প্রকারের মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে। এটি যেকোনো নির্বাচনের আগে বাড়ে বলে আমরা বার বার জানিয়েছি। সেটা আমাদের এর আগের হিসাবের মধ্যে দেখিয়েছি। তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট রাজনৈতিক অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। বৈদেশিক খাত একটা দুষ্ট চক্রে ঢুকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, রেমিটেন্স ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ, রপ্তানি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার বিপরীতে আমদানি বেড়েছে সাড়ে ২৪ ভাগ। এটা এক প্রকার ছাদ ফুড়ে চলে যাওয়ার মতো। এর ফলে বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেড়েছে।

উন্নয়ন ব্যয় নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এক কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করতে অনেক সময় নিউইয়র্কের চেয়েও বেশি খরচ হচ্ছে বলে আমরা সংবাদে দেখছি। এটা এখন প্রকাশ্য যে, যে ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে সেটি দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়নের ফলে তার প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু প্রকল্পগুলো নেওয়ার সময় অতিমূল্যায়িতভাবে নেওয়া হচ্ছে কি না সেটি দেখতে হবে। ব্যাংকিং খাতের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি বলেন, রোগ উপশমের চেয়ে উপসর্গ নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। লক্ষ্যভ্রষ্ট রাজনৈতিক অর্থনীতির কারণে এমনটি হচ্ছে। যাদের নিয়ন্ত্রণ করার কথা তারাও এদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করছে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে দশকব্যাপী বাংলাদেশ যে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ভোগ করে আসছে, সেই স্থিতিশীলতার ভেতরে কিছু ক্ষেত্রে চিড় দেখা দিচ্ছে। এর ফলে আগামী দিনে বেশ কিছু উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করছি। বিগত সময়কাল ধরে আমরা একটি শোভন প্রবৃদ্ধির ধারার মধ্যে আছি। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং বৈষম্য কমাতে ভূমিকা রাখতে পারছে না।

সিপিডি বলছে, বাংলাদেশ এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে যতখানি না সমস্যা আছে, তার চেয়ে অনেক বেশি সমস্যা রাষ্ট্রের সঙ্গে বহির্বিশ্বের সম্পর্কের ক্ষেত্রে।

ড. মুস্তাফিজুর রহমান উল্লেখ করেন, চলতি অর্থবছরে সরকার ২ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়েছিল। সিপিডির হিসাবে এই লক্ষ্য থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হবে। আসছে বাজেটে সরকার কর্পোরেট কর কমানোর কথা বলছে, কিন্তু এর ফলে রাজস্ব আদায়ে কী প্রভাব পড়বে সেটি বিবেচনায় নিতে হবে। নির্বাচনী বছরে আর্থিক খাতের সংস্কারে বড় উদ্যোগ নেওয়া না হলেও প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ঘাটতি বাজেটের অর্থায়ন কৌশল পরিবর্তন করা উচিত। কারণ সঞ্চয়পত্রের অনেক অপব্যবহার হচ্ছে। অনেকেই বেনামে সঞ্চয়পত্র কিনছেন। এর থেকে ধনীরাই বেশি সুবিধা নিচ্ছে। রাজস্ব আদায়ে বড় লক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে। এতে করে রাজস্ব শৃঙ্খলা ভেঙে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমান আইন দিয়ে ঋণ খেলাপিদের আটকানো যাবে না, ফলে মন্দ ঋণের পরিমাণ বেড়েই যাবে। দেশের ব্যাংকিং খাতে এখন খেলাপি ঋণ ৯ শতাংশের ওপরে আছে। পুরনো ঋণগুলো অবলোপনের পরও এই অবস্থা দাঁড়াচ্ছে। সেটি না হলে মন্দ ঋণের মাত্রাটা আরো বেশি হতো। যেসব বুদ্ধিমান লোক ঋণকে খেলাপি করার পেছনে কাজ করছেন বা কারসাজি করছেন, তাদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের এই আইনে নেই। তাই আইন যুগোপযোগী করার সুপারিশ করেন তিনি।

দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, যেসব দেশ অর্থনীতিতে খুব ভালো করছে, যেমন ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ড, তাদের ব্যাংক খাতে মন্দ ঋণের হার ২ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এটা ৮ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত। এটা কোনোভাবেই ভালো নয়। দেশের ব্যাংকে নগদ অর্থের সংকটের বিষয়টিতে নজর দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মোস্তাফিজুর বলেন, আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এটা অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের প্রতিবেশী ভারত নানা নিয়ম-নীতির মাধ্যমে আর্থিক খাতকে একটা জায়গায় নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি সামাল  দেওয়ার জন্য অনেকগুলো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিপরীত সিগন্যাল যাচ্ছে। যেমন পুনঃ তফসিলের সুযোগ দেওয়া হলে সেটাও পরিশোধ করা হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পূর্বাভাসের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে করে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশের নিত্য পণ্যের মূল্য বিশ্ববাজারের চেয়ে অনেক বেশি। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, দেশের বাজারে চিনি আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে আড়াইগুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। সয়াবিন তেল দেড়গুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এর ফলে ভোক্তাদের ওপর অন্যায্য চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। নতুন ব্যাংকের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান অবস্থায় নতুন ব্যাংক অনুমোদন দিলে আর্থিক খাতে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। শেয়ারবাজারে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আরো নজরদারিতে আনা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৪ জুন, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৪
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩৭
মাগরিব৬:৪৬
এশা৮:০৯
সূর্যোদয় - ৫:১০সূর্যাস্ত - ০৬:৪১
পড়ুন