উত্পাদন শুরুর নয় মাসেই ‘মৃত’ রূপগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্র
উত্তোলন মাত্র ৬৮ কোটি ঘনফুট
মাহবুব রনি২৬ আগষ্ট, ২০১৮ ইং
ঢাকঢোল বাজিয়ে দেশের ২৬তম গ্যাসক্ষেত্র রূপগঞ্জের ঘোষনা দিয়েছিল সরকার। বলা হয়েছিল নারায়ণগঞ্জে আবিষ্কৃত এ ক্ষেত্রটিতে মজুদ আছে ৩ হাজার ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু সব মিলিয়ে উত্তোলন করা গেছে মাত্র ৬৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এর একমাত্র কূপে আর গ্যাস খুঁজে পাচ্ছে না রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। উত্পাদন শুরুর নয় মাস পরই ফুরিয়ে গেছে খনিটির মজুদ।

পেট্রোবাংলা এবং বাপেক্স সূত্র জানায়, ঢাকার পার্শ্ববর্তী পূর্বাচলে ২০১৪ সালে দেশের ২৬তম ক্ষেত্র হিসেবে আবিস্কার হয় রূপগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্র। কূপ আবিস্কার শেষে পাইপ লাইন নির্মাণ সহ নানা জটিলতার ৩ বছর পর গত বছরের ২৭ মার্চ কূপটি থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়। গ্যাস ক্ষেত্রের এক নম্বর কূপ থেকে প্রতিদিন ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছিল। উত্পাদিত গ্যাস রূপগঞ্জ-কামতা সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেড (টিজিটিডিসিএল) তাদের নিজস্ব বিতরণ এলাকায় সরবরাহ করত। বাপেক্সের লক্ষ্য ছিল উত্পাদন বাড়িয়ে কূপটি থেকে দৈনিক ১ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হবে।

কিন্তু গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৬৮ কোটি গ্যাস উত্তোলন করার পরই ক্ষেত্রটির উত্তোলনযোগ্য গ্যাস নি:শেষ হয়ে গেছে। এরপর গত সাত মাস ধরে দুই এক দিন ছাড়া কোন গ্যাস উত্পাদন হয়নি কূপটি থেকে। বর্তমানে দৈনিক শতকোটি ঘনফুটের বেশী সংকটের মধ্যেও ক্ষেত্রটি থেকে গ্যাস উত্পাদিত হচ্ছে না। অথচ ক্ষেত্রটিতে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি ঘনফুট বিসিএফ (বিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস মজুত আছে বলে দাবি করেছিল বাপেক্স।

এ প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলার উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, রূপগঞ্জ ক্ষেত্রটি প্রকৃতপক্ষে মরে গেছে। শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষনা দেয়াই বাকি রয়েছে। তবে যেহেতু শুরুতে বলা হয়েছিল এতে ৩৪ বিসিএফ গ্যাস রয়েছে কিন্তু এখন এক বিসিএফ-এরও কম গ্যাস উত্তোলনশেষে এটি বন্ধ হয়ে গেছে। তাই আনুষ্ঠানিক ঘোষনা এখনও দেয়া হয়নি।

তবে মজুদ নির্ধারণে অদক্ষতার কারণে এমনটি হয়েছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিস্কার করলে বাপেক্স কর্মকর্তাদের যে বোনাস দেয়া হয়, সেই বোনাসের লোভে কর্মর্তারা বেশি মজুদ দেখিয়েছেন বলে মনে করেন তারা। অনেক বিশেষজ্ঞ এটিকে গ্যাসক্ষেত্রের মর্যাদা দিতে রাজি ছিলেন না। বর্তমানে তাদের সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো।

আর বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম রুহুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রূপগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রের আবিষ্কার ও ঘোষনার সময় তখনকার কূপে গ্যাসের চাপ বিবেচনা করে মজুদ নির্ণয় করা হয়েছিল। কিন্তু হিসাবে ভুল ছিল। তাই যে মজুদ নির্ধারণ করা হয়েছিল তা পাওয়া যায়নি। এখন সেখানে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস নেই। তিনি বলেন, রুপগঞ্জে প্রত্যাশামত গ্যাস না পাওয়া কিছুটা হলেও হতাশার। তবে বাপেক্সের অনেকগুলো অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে। সেগুলোর ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, রূপগঞ্জকে আলাদা গ্যাসক্ষেত্র ঘোষণা করাই ছিল বিতর্কিত। এটা খুবই ছোট একটি কূপ। এটি পার্শ্ববর্তী কামতা গ্যাস ক্ষেত্রেরই অংশ বলে ধারণা করা হয়েছিল। এই গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে ভূতত্ত্ববিদ বা বিশেষজ্ঞদের কোনা আশা ছিল না। কিন্তু সরকারের কর্মকর্তাদের একটি অংশ এটিকে বড় করে দেখিয়ে সুবিধা নিয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলার পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্পে অবস্থিত রূপগঞ্জে কূপ খনন শুরু করে বাপেক্স। তিন হাজার ৬১৫ মিটার গভীর পর্যন্ত খনন করে গ্যাসের সন্ধান পায় প্রতিষ্ঠানটি। ওই বছরেরই জুনে ক্ষেত্রটির অনুসন্ধান কূপ থেকে গ্যাসপ্রবাহ শুরু হয়। এর আগে বাপেক্স ২০১০ সালে রূপগঞ্জে দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ করে। এতে সেখানে গ্যাস থাকার ধারণা পাওয়া যায়।

সংকটের মধ্যে দুঃসংবাদ: দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪১২ কোটি ঘনফুট। কিন্তু দেশীয় গ্যাস কূপগুলো থেকে উত্পাদন ও সরবরাহ হচ্ছে ২৮০ কোটি ঘনফুট। ফলে সংকট থাকছে ১৩২ কোটি ঘনফুটের। এদিকে নতুন গ্যাস কূপ আবিস্কার ও গ্যাস উত্পাদন না হওয়ায় চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করছে। জ্বালানি সংকট সমাধানে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করেছে সরকার। এমন অবস্থায় দেশজ গ্যাসের একটি উত্স বন্ধ হয়ে যাওয়া দুঃসংবাদ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৬ আগষ্ট, ২০২১ ইং
ফজর৪:২০
যোহর১২:০১
আসর৪:৩৩
মাগরিব৬:২৬
এশা৭:৪১
সূর্যোদয় - ৫:৩৮সূর্যাস্ত - ০৬:২১
পড়ুন