সাগর পাহাড় নাকি বনে...
সাগর পাহাড় নাকি বনে...
এসে গেল বেড়ানোর মৌসুম। এ ব্যস্ত জীবনে কয়েকটা দিনের ছুটি নিয়ে কয়েকটা দিন ঘুরে এলে যেন সারা বছরের সঞ্জীবনী সুধা জমা হয় দেহে, মনে। আর সেই টানেই সবাই ছোটে সাগরে, পাহাড়ে নয়ত বনে।

কোথায় যাওয়া যায় এবার বেড়াতে? নীল আকাশের নিচে বসে নীল সাগরের ঢেউ গুনতে কক্সবাজার যাবেন নাকি সবুজ পাহাড়ের চূড়ায় বসে মেঘের ভেলায় ভাসবেন। এর কোনোটাই এবার করতে ইচ্ছা করছে না! তাহলে, চলে যেতে পারেন রহস্য ঘেরা সুন্দরবনে। লঞ্চের ডেকে বসে সুন্দরবন দেখতে মন জুড়িয়ে যায়। ঘন জঙ্গলের ভেতরে গা ছমছমে অনুভূতি নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে নৌকা নিয়ে ঘোরাফেরা, হরিণের ছুটে চলা আর রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ভয় জয় করে শুকনো ট্রেইল ধরে কটকা বিচে ঝাপাঝাপি করে আসতে পারেন।

ঘুরে আসুন সুন্দরবন : সুন্দরের রানি সুন্দরবন ক্ষণে ক্ষণে তার রূপ বদলায়। বলা হয়ে থাকে সুন্দরবন দিনে চারবার তার রূপ বদলায়— যার সকালে এক রূপ, দুপুরে অন্যরূপ আর পড়ন্ত বিকালে নতুন রূপে উদ্ভাসিত হয়। আর রাতে গহীন অরণ্যের মাঝে এক ভিন্ন শিহরণ তৈরি করে সুন্দরবন। তাছাড়া অমাবস্যায় কিংবা চাঁদনী রাতে নানান রূপে পর্যটকদের  কাছে ধরা দেয় সুন্দরবন।

বাংলাদেশের দর্শনীয় কয়েকটি জায়গার নাম বললে প্রথমেই আসবে সুন্দরবনের নাম। বাংলাদেশের মানুষের গর্ব রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমি এ সুন্দরবন। দৃষ্টিনন্দন চিত্রল ও মায়া হরিণ, বিচিত্র প্রজাতির পাখির দেখা মেলে এখানে। এ বনে রয়েছে প্রায় ৩০০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪২৫ ধরনের প্রাণী এবং ২৯১ প্রজাতির মাছ। ১৯৯৭ সালে সুন্দরবন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। সাধারণত শীত মৌসুম অর্থাত্ অক্টোবরের শেষ থেকে মার্চ পর্যন্ত চলে সুন্দরবন ভ্রমণ।

পুরো সুন্দরবন ঘুরে দেখা মোটেও সম্ভব নয়। কেননা বনের অধিকাংশ স্থানই তো স্যাঁতসেঁতে আর ম্যানগ্রোভ অঞ্চল। তাই বন দেখতে হলে যেতে হবে করমজল, কটকা, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর, আলোরকোল, টাইগার পয়েন্টে। বনের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে ভাগ্যে থাকলে দুই-একটি বন্য প্রাণীর দেখা মিলতেও পারে। এমন ভ্রমণপ্রেমীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়াতে যেতে পারেন মোংলার করমজলে। সবুজ প্রকৃতি ও সৌন্দর্যে ভরপুর আকর্ষণীয় করমজল আধা বেলা ঘুরেই গোটা সুন্দরবন সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন। কটকায় রয়েছে বন বিভাগের কটেজ আর সি বিচ। এ ছাড়া, রাতের বেলা পর্যটন টাওয়ারে বসে দেখা যায় বনের ভিন্ন রূপ। হিরণ পয়েন্টেও রয়েছে এ ব্যবস্থা। তবে ছোট দ্বীপ দুবলারচরের সৈকতটি না দেখলে সুন্দরবনের আসল সৌন্দর্য দেখা বাকি থেকে যাবে। এখানে বন, চর, সাগর দেখার সঙ্গে মাছ শিকারও দেখে নেয়া যাবে। আর টাইগার পয়েন্টটি কচিখালীতে।

ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে সুন্দরবনে ঘোরার ট্যুর পরিচালনা করে গাইড ট্যুর ও বেঙ্গল ট্যুর। এ ছাড়াও, বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এ ট্যুর পরিচালনা করে থাকে। এ ছাড়া, খুলনা থেকেও স্থানীয় বেশকিছু ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান সুন্দরবনে ট্যুর পরিচালনা করে।

ডাকে, সাগরেরই নীল ... :সারি সারি ঝাউবন, বালুর নরম বিছানা, সামনে বিশাল সমুদ্র। কক্সবাজার গেলে সকালে-বিকালে সমুদ্রতীরে বসে থেকেই সময় যেন কোথা দিয়ে উড়ে যায়। নীল জলরাশি আর বাতাসের গর্জনের মাঝে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের নাম কক্সবাজার। কক্সবাজারের সি বিচের টান তো রয়েছেই, এর ফাঁকেই ঘুরে আসেন সেন্টমার্টিন’স দ্বীপ, মহেশখালীর প্যাগোডা আর মন্দির, কুতুবদিয়া, টেকনাফ। তবে এখন কক্সবাজারের নতুন আকর্ষণ হিসেবে দেখা দিয়েছে টেকনাফ পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্য উপভোগ করা। এর পাশাপাশি কক্সবাজারের চকরিয়ায় দুলাহাজরা সাফারি পার্ক এখন ভ্রমণপিয়াসীদের জন্য নতুন আকর্ষণ হয়ে দেখা দিয়েছে।

ট্যুরিস্টদের জন্য কক্সবাজার এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। কক্সবাজারকে ঘিরে গড়ে উঠছে দেশের সুন্দর সব হোটেল। কক্সবাজার শহরের গণ্ডি পেরিয়ে হিমছড়িতেও গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল। এসব হোটেলে ৬ থেকে ১০ হাজারে মিলবে রুম। তাছাড়া, ৫ হাজার থেকে ৫০০ টাকাতেও রুম মিলবে কক্সবাজারে।

প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন :আকাশের নীল আর সমুদ্রের নীল সেখানে মিলেমিশে একাকার। তীরে বাঁধা নৌকা, নান্দনিক নারিকেল গাছের সারি আর কোরাল বিচের সৌন্দর্য মন উদাস করে দেয় বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে এলে। বালি, পাথর, প্রবাল কিংবা জীব বৈচিত্র্যের সমারোহ, স্বচ্ছ পানিতে জেলি ফিশ দেখা, নানা রকমের সামুদ্রিক মাছ, কচ্ছপ, প্রবাল বিশ্ব রহস্যের জীবন্ত পাঠশালায় পরিণত করেছে সেন্টমার্টিন ও তত্সংলগ্ন এলাকাকে। টেকনাফ থেকে সাগর পাড়ি দিতে হয় সেন্টমর্টিনে যেতে। সময় লাগে তিন ঘণ্টা। বিশাল ফেরিতে এই তিন ঘণ্টার যাত্রাপথটাও কম উপভোগ্য নয়!

ঢাকা থেকে সরাসরি যাওয়া যায় সেন্টমার্টিন। সেটাই ভালো। সেন্টমার্টিনে দুই রাত থেকে ঘুরে কক্সবাজার গেলে অর্থ সাশ্রয় হয়। অনেকে কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন এসে আবার কক্সবাজার ফিরে যান এতে ছেঁড়া দ্বীপের সৌন্দর্য বঞ্চিত হন পর্যটকরা। আর রাতের সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য অপার্থিব। না দেখলে বোঝা যাবে না- তা। এখানে প্রচুর হোটেল রয়েছে। ঢাকা থেকে বুক করে এলে ভালো হোটেল পাওয়া যায়।

সাগর কন্যা কুয়াকাটা :বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে সাগর কন্যা খ্যাত অপরূপ এক জায়গা কুয়াকাটা। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপালী ইউনিয়নে অবস্থিত এ জায়গায় আছে বাংলাদেশের আকর্ষণীয় এক সমুদ্র সৈকত। একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখার মতো জায়গা দ্বিতীয়টি আর এদেশে নেই। অনিন্দ্য সুন্দর সমুদ্র সৈকত ছাড়াও কুয়াকাটায় আছে বেড়ানোর মতো আরও নানান আকর্ষণ।

কুয়াকাটা নামকরণের ইতিহাসের পেছনে যে কুয়া সেটি এখনও টিকে আছে। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের কাছে কেরাণিপাড়ায় প্রাচীন এ কুয়ার অবস্থান। প্রাচীন কুয়ার সামনেই সীমা বৌদ্ধ মন্দির। কাঠের তৈরি এই মন্দির কয়েক বছর আগে ভেঙে দালান করা হয়েছে। তবে মন্দিরের মধ্যে এখনও আছে প্রায় ৩৭ মণ ওজনের প্রাচীন অষ্টধাতুর তৈরি বুদ্ধ মূর্তি। এখানে রাখাইনদের একটি গ্রামের নাম মিশ্রিপাড়া। এখানে আছে বড় একটি বৌদ্ধ মন্দির। কথিত আছে, এ মন্দিরের ভেতরে আছে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় বুদ্ধ মূর্তি।

কুয়াকাটায় ঢাকা থেকে সরাসরি বাস যায়। তবে, লঞ্চে যাওয়া আরামের। সন্ধ্যায় সদরঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়ে। ভোরে পৌঁছায় পটুয়াখালী শহরে। সেখান থেকে বাসে আড়াই ঘণ্টা লাগে কুয়াকাটা পৌঁছাতে।

রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পথে :খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি এ তিন পার্বত্য জেলার পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃতির সৌন্দর্য। সমতলের বাঙালিদের কাছে পাহাড়ি নৃ-গোষ্ঠীর এই জন্মভূমি - এক অপার বিস্ময়ের নাম। সেখানকার মানুষদের জীবনযাপন, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, কৃষি কাজ এবং সেখানকার প্রকৃতি সবকিছুই টানে সমতলের মানুষদের। তাই, সুযোগ পেলেই সবাই ছোটেন পাহাড়ে।

রাঙ্গামাটি :এ শহরে রয়েছে উপজাতীয় জাদুঘর। এখানে রয়েছে রাঙ্গামাটিসহ পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত নানা আদিবাসীদের ব্যবহূত বিভিন্ন সময়ের নানা সরঞ্জামাদি, পোশাক, জীবনাচরণ এবং বিভিন্ন ধরনের তথ্য। ছোট অথচ অত্যন্ত সমৃদ্ধ এ জাদুঘরটি। উপজাতীয় জাদুঘর দেখতে চলে যেতে পারেন পাশের রাজ বন বিহারে। এ অঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটি তীর্থস্থান এই রাজবন বিহার। এখানে আছে একটি প্রার্থনালয়, একটি প্যাগোডা, বনভান্তের (বৌদ্ধ ভিক্ষু) আবাসস্থল ও বনভান্তের ভোজনালয়। রাজবন বিহারের পাশেই কাপ্তাই লেকের ছোট্ট একটি দ্বীপজুড়ে রয়েছে চাকমা রাজার রাজবাড়ি। নৌকায় পার হয়ে খুব সহজেই যাওয়া যায় এই রাজবাড়িতে। আঁকাবাঁকা সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে গাছের ছায়ায় ইট বাঁধানো পথের মাথায় এ সুন্দর বাড়িটি। এখানে আরো রয়েছে চাকমা সার্কেলের প্রশাসনিক দপ্তর। এরপর চলে আসুন পর্যটন কমপ্লেক্সে। পর্যটন কমপ্লেক্সের ভেতরেই রয়েছে সবার চেনা সুন্দর ঝুলন্ত সেতুটি। এখান থেকে কাপ্তাই লেকে নৌ ভ্রমণ করতে পারেন। নৌ ভ্রমণের জন্য এখানেই পেয়ে যাবেন নানা রকম বাহন। সারাদিনের জন্য একটি বোট ভাড়া করে চলে যেতে পারেন শুভলং বাজার। শুভলংয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরতি পথের শুরুতেই হাতের বাঁয়ে পেয়ে যাবেন শুভলং ঝরনা। শীতের সময় ঝরনার পানি কম থাকে, বর্ষায় এ ঝরনা পূর্ণ যৌবনা।  কাপ্তাই লেকের দুপাশের আকাশ ছোঁয়া পাহাড়গুলোর সৌন্দর্য দেখতে দেখতে চলতে থাকুন। ঢাকা থেকে সরাসরি রাঙ্গামাটির বাস ছাড়ে। রয়েছে ভালো মানের হোটেল।

বান্দরবান :সুউচ্চ পাহাড়, সবুজ বনানী, মেঘের দল, বাহারি রঙয়ের আকাশ, সাঙ্গুর বহতা স্রোত, দুর্গম অরণ্য ঘেরা হাজারো ঝরনার ধারায় জেগে থাকা পাহাড়- সব মিলিয়ে এখন বান্দরবান বেড়ানোর আদর্শ এক স্থান। বান্দরবান শহরের মূল আকর্ষণ স্বর্ণমন্দির বা বুদ্ধ ধাতু জাদি। এছাড়া শহরের মধ্যেই রয়েছে জাদিপাড়ার রাজবিহার এবং উজানীপাড়ার বিহার। বান্দরবানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ চিম্বুক পাহাড়ে গিয়ে মেঘের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া। বাংলার দার্জিলিং খ্যাত চিম্বুকের পরিচিতি অনেক পুরনো। এ পাহাড় থেকে সূর্যাস্ত এবং সূর্যোদয়ের দৃশ্য যেকোনো পর্যটককে মুগ্ধ করবে। বাংলাদেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ চিম্বুক পাহাড় বান্দরবানের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। বান্দরবান শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শৈল প্রপাত একটি আকর্ষণীয় পাহাড়ি ঝর্ণা। এ ছাড়া, বাংলাদেশের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং এবং বৃহত্তম পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং এই বান্দরবান জেলাতেই অবস্থিত।

খাগড়াছড়ি : অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই জেলা শহরের একপাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে পাহাড়ি নদী চেঙ্গি। শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে নুনছড়ি এলাকার উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায় আছে দেবতার পুকুর। এর আরেক নাম ‘মাতাই পুখিরি’। ত্রিপুরা ভাষায় ‘মাতাই’ শব্দের অর্থ দেবতা আর পুখিরি শব্দের অর্থ পুকুর। শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে মনোরম প্রাকৃতিক ঝরনা রিসাং। রিসাং থেকে ফেরার পথে সড়কের পাশেই আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের দুয়ার। প্রায় এক হাজার ফুট উঁচু এ পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালে পুরো খাগড়াছড়ি শহর পাখির চোখে দেখা যায়। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে সর্পিল ধারায় বয়ে চলা চেঙ্গী নদীর অপরূপ সৌন্দর্যও দেখা যায় এখান থেকে।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৬ অক্টোবর, ২০২১ ইং
ফজর৪:৩৬
যোহর১১:৪৭
আসর৪:০৩
মাগরিব৫:৪৫
এশা৬:৫৬
সূর্যোদয় - ৫:৫১সূর্যাস্ত - ০৫:৪০
পড়ুন