সহিংসতা প্রতিরোধ ও সম-অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সিডও
মহিলা অঙ্গন প্রতিবেদক০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ ইং
সহিংসতা প্রতিরোধ ও সম-অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সিডও
 

নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও)। নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় এই সনদটি। ইংরেজিতে (কনভেনশন অন দ্যা ইলিমিনেশন অব অল ফর্ম অব ডিসক্রিমিনেশন এগেইনস্ট ওমেন) যার সংক্ষেপ-সিইডিএডাব্লিউ বা সিডও। ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সনদটি কার্যকর হতে শুরু করে। এতে বাংলাদেশ সরকার ৪টি ধারা সংরক্ষিত রেখে ১৯৮৪ সালে সিডও সনদে স্বাক্ষর করে। নারী আন্দোলন ও মানবাধিকার আন্দোলনের দাবির ফলে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৬ সালে ১৩(ক) এবং ১৬-১ -এর (চ) ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করলেও হার্ট অব কনভেনশন বলে অভিহিত ২নং ধারা এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ধারা ১৬-১ -এর (গ) থেকে এখনো সংরক্ষণ প্রত্যাহার করেনি। গত ৩ সেপ্টেম্বর ছিল সিডও দিবস। সিডও দিবস নিয়ে আমাদের এই প্রতিবেদন। সিডও সনদে স্বাক্ষরের ফলে সনদের গুরুত্বপূর্ণ নীতি পালনে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয় বাংলাদেশ।

নারীর যথাযথ স্বীকৃতিদানই হচ্ছে সিডও সনদের মূলকথা। তবে সমাজ, রাষ্ট্র তথা সমস্ত বিশ্বের শান্তি ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা স্থাপন করা। মানুষ হিসেবে নারীর উন্নয়ন ও বিকাশের প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করার জন্য আইন প্রণয়ন করা। প্রচলিত আইনের সংস্কার এবং আইন প্রয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি তথা প্রশাসনিক ভিত্তি স্থাপন করা। নারীর অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দান করা এই সনদের লক্ষ্য। 

এই মূলকথাগুলিকে ধারণ করে তিনটি মৌলিক নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সিডও সনদ। (১) সমতার নীতি (২) বৈষম্যহীনতার নীতি (৩) শরিক রাষ্ট্রের দায়-দায়িত্বের নীতি। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালে এই বৈশ্বিক দলিলটিতে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সনদের গুরুত্বপূর্ণ নীতি ‘শরিক রাষ্ট্রের দায়-দায়িত্বের নীতি’ পালনে বাধ্যবাধকতার আওতাভুক্ত হয়। স্বাক্ষর করার সময়ে বাংলাদেশ সরকার এই সনদের ৪টি বিষয়ে সংরক্ষণ আরোপ করে। চলমান নারী আন্দোলন ও মানবাধিকার আন্দোলনের দাবির ফলে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৬ সালে ১৩ (ক) এবং ১৬-১ -এর (চ) ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করলেও ‘হার্ট অব দ্যা কনভেনশন’ বলে অভিহিত ২নং ধারা এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ধারা ১৬-১ -এর (গ) থেকে এখনো সংরক্ষণ প্রত্যাহার করেনি বাংলাদেশ সরকার।

বাংলাদশের সংবিধানের ১৯নং ধারায় বলা হয়েছে- ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন’, ২৭নং ধারায় বলা হয়েছে- ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’, ২৮নং ধারায় বলা হয়েছে- ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবে না। রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন। কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোনো বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোনো নাগরিককে কোনো রূপ অক্ষমতা এবং বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না’, আরো বলা হয়েছে- ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।’

কাজেই, ‘সিডও’ সনদের দুইটি ধারার উপর সংরক্ষণ বহাল থাকার বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধানের মর্মকথার সঙ্গে পুরোপুরি সংঘর্ষিক। জাতিসংঘ ‘সিডও’ কমিটির ক্রমাগত উদ্বেগ এবং বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের নিরবচ্ছিন্ন দাবির যৌক্তিকতার কোনোটিই সংরক্ষণ প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।

‘সিডও’ সনদের ২নং ধারায় নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক রীতিনীতি, প্রথা, আচার-ব্যবহার নিষিদ্ধ করে নারী-পুরুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠার নীতিমালা গ্রহণের উপর জোর দেয়া হয়েছে। সকল ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ, আদালত ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নারীকে বৈষম্য থেকে রক্ষা করা, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নারীর প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন রোধ করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। ১৬-১ -এর (গ) ধারায় বিবাহ, বিবাহে পছন্দ-অপছন্দ এবং বিবাহ-বিচ্ছেদকালে নারী-পুরুষের সম-অধিকারের ও দায়দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।

এই দুইটি ধারায় বাংলাদেশ সরকারের সংরক্ষণ বিষয়ে ১৯৯৭ সালে ‘সিডও’ কমিটির সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় যে, ধারা ২ হচ্ছে ‘সিডও’ সনদের প্রাণ এবং ১৬-১ -এর (গ) নারীর পূর্ণ অধিকার লাভের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৪-এ সিডও কমিটির সভায় উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয় যে, সনদের ধারা ২ এবং ১৬-১ (গ) -এর উপর বাংলাদেশ সরকারের সংরক্ষণ অব্যাহত রয়েছে যা কমিটির মতে সনদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে বিরোধপূর্ণ। ২০০৮-এর সভায় সিডও কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলে- ‘বহুবিবাহ, পরিবারে ও সমাজে নারীর দায়িত্ব ও ভূমিকার ব্যাপারে একচোখা বা গত্বাঁধা দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ নারীর অধিকারকে খর্ব করে এবং সিডও সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করে।’

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সিডও কমিটি সনদে সংরক্ষণ রাখার সুযোগের বিষয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। ১৯৮৭ এবং ১৯৯২ সালে এই কমিটি সংরক্ষণ বিষয়ে সাধারণ প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং শরিক রাষ্ট্রসমূহকে সংরক্ষণ প্রত্যাহারের বিষয় পুনর্বিবেচনার জন্য উত্সাহিত করে।

২০১১-এর ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ৪৮তম সিডও অধিবেশনে বাংলাদেশ সরকার সিডও বাস্তবায়নে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। সিডও কমিটি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য নিরসন ও নারী নির্যাতন বন্ধ করার লক্ষ্যে গৃহীত আইন নীতিমালা এবং কার্যক্রমের প্রশংসা করার পাশাপাশি এ সকল আইন-নীতিমালা-কার্যক্রমের সঠিক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করে। এই ক্ষেত্রে ‘সিডও’ সনদের দুইটি ধারায় সরকারের সংরক্ষণ বড় রকমের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে এবং বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এখনো যে কোনো বয়সের নারীর উপর যে মাত্রায় সহিংসতা ঘটছে তা আইন-নীতিমালার কার্যকারিতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিধিমোতাবেক সিডও সনদ অনুমোদনের এক বছরের মধ্যে এবং পরবর্তী সময়ে প্রতি ৪ বছর অন্তর সিডও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত জাতীয় প্রতিবেদন জাতিসংঘ সিডও     কমিটির কাছে পেশ করার বিধান সিডও সনদে রাখা হয়েছে। সরকারি প্রতিবেদনে পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাসমূহ বিকল্প প্রতিবেদন প্রণয়ন করে এবং জাতিসংঘ সিডও কমিটির কাছে তা পেশ করে।

১৯৯৭ সালের ৭-৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সিডও কমিটির সভায় বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক রিপোর্টের উপর সমাপনী মন্তব্যে সিডও সনদের ২নং ধারায় সংরক্ষণ বিষয়ে কমিটির প্রশ্নের জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়- বিষয়টি সরকারকে জানানো হয়েছে। কমিটি বাংলাদেশের নারী নির্যাতন পরিস্থিতির বিষয়টিকে প্রিন্সিপাল এরিয়াস অব কনসার্ন হিসেবে বিবেচনা করে। এরপর বহু বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, অনেক আইন হয়েছে, নীতিমালা হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের নারীর প্রতিদিনের জীবন বাস্তবতায় এখনো প্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটেনি। ২০০৪ সালে জাতিসংঘ সিডও কমিটির সভায় বাংলাদেশের রিপোর্ট পর্যালোচনার মাধ্যমে সমাপনী মন্তব্যে সনদের বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের দায়বদ্ধতা বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ২০১১ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সিডও কমিটির ৪৮তম নিয়মিত অধিবেশনে বাংলাদেশ সরকার সিডও বাস্তবায়নে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:২৬
যোহর১১:৫৭
আসর৪:২৫
মাগরিব৬:১৩
এশা৭:২৭
সূর্যোদয় - ৫:৪৩সূর্যাস্ত - ০৬:০৮
পড়ুন