শ্রমজীবী মায়েদের জন্য দরকার
দিবাযত্ন কেন্দ্র
১৩ জুন, ২০১৬ ইং
দিবাযত্ন কেন্দ্র
রানা প্লাজা ধসের পর ডোনাররা গার্মেন্টসে কর্মরত মায়েদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ প্রকাশ করে। ফলে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য গড়ে ওঠে কিছু দিবাযত্ন কেন্দ্র। কিন্তু আমাদের দেশে শুধু গার্মেন্টসে কর্মরত শ্রমজীবী মায়েদের জন্য নয় গৃহশ্রমিকসহ ভাসমান সকল শ্রমজীবী মায়েদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র জরুরি। অল্প আয়ের মানুষ অতি সহজেই সংসার সন্তান ত্যাগ করলেও মায়েরা তা পারে না। এমন মায়েদের ও তাদের সন্তানদের সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনীর আওতায় এনে সমাজের অবস্থা পরিবর্তনে গুরুত্ব দেন বিজ্ঞজনেরা। তারা বলেন, দেশকে মধ্য আয়ের দেশ করতে হলে শ্রমজীবী মায়েদের কাজে ধরে রাখতে হবে।

মোহাম্মদপুরের আদাবর এলাকায় ভালবেসে বান্ধবীর এক বন্ধুকে বিয়ে করে বৃষ্টি। বিয়ের পরপরই স্বামীর আগের স্ত্রী, সন্তান আর নেশায় আসক্ত হওয়ার বিষয় জানতে পারে সে। এ যেন আকাশ ভেঙে মাথায় পড়লো বৃষ্টির। মানুষ এত মিথ্যা কথা বলতে পারে। ঝগড়াঝাটি তখন থেকেই এই দম্পতির সঙ্গী। একদিন স্বামী জানায় তার আগের স্ত্রী অন্যকে বিয়ে করে চলে গেছে। সতীনের বড় ছেলে মায়ের সাথে গেলেও ২ মাসের ছেলে পড়ে থাকে ঘরে। তাকে বৃষ্টির কোলে তুলে দেয় স্বামী। এখন এই দুধের বাচ্চাকে বৃষ্টিরই দেখতে হবে। সেই ছেলেকে নিয়েই নতুন যুদ্ধে নামে বৃষ্টি। গার্মেন্টসে কাজ করে সতীনের ছেলেকেই মানুষ করার স্বপ্ন দেখে। স্বামী নেশা করে টাকার জন্য মাঝে মধ্যে গায়ে হাত তোলে। দুই একদিন পর পর উধাও হয়ে যাওয়ার রোগও আছে তার। কে জানে আরেকটা বিয়ে করেছে কিনা! পুরুষ মানুষের কোনো বিশ্বাস নাই বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। নিজের একটা বাচ্চা নেওয়ার কথা আর ভাবে না বৃষ্টি। এখন শাওনের বয়স তিন বছর। শাওনকে সে আদাবর সুনীবির হাউজিং সোসাইটির স্বপ্নপুরী দিবাযত্ন কেন্দ্রে রেখে যায়। কাজ শেষে বাজার করে রাত ৮টায় ছেলেকে নিয়েই ঘরে ফেরে।

রহিমা বেগমের গ্রামের বাড়ি ভোলা জেলায়। ষোল বছর পেরুতে না পেরুতে বাবা-মা তার বিয়ে দেয়। বিয়ের পর স্বামী কাজকর্ম না করে মানুষের কাছে ঋণ করতে শুরু করে। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে রহিমা আর তার স্বামী গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়। সাথে নিয়ে আসে তিন ছেলে। আদাবরের বস্তি এলাকায় একটি ঘর ভাড়া করে। অকর্মন্য স্বামী শহরে এসে নেশায় আসক্ত হয়। রহিমা এ বাড়ি ও বাড়ি কাজ করে সংসার চালায়। এক সময় স্বামী আর একটি বিয়ে করে ঋণের বোঝা আর পাহাড় সমান তিন সন্তানের দায় রেখে পালিয়ে যায়। রহিমা এখন ৬ বাড়িতে ছুটা কাজ করে ৮ হাজার টাকা আয় করে। বড় দুই ছেলেকে মাদ্রাসায় আর ছোট ইব্রাহিমকে দিবাযত্ন দিয়ে একটা ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখে। সারাদিন কাজ করে কখনো খেয়ে আবার কখনও না খেয়ে ছেলেদেরকে নিয়ে যুদ্ধ করতে করতে সে এখন রোগাক্রান্ত । প্রায়ই সর্দি-কাশি-জ্বর আর জন্ডিসে ভোগে। বাড়ি গিয়ে কয়দিন বিশ্রামের সুযোগ নেই। ঋণের তাগাদা আজও পিছু ছাড়ে না। আফসোস করে রহিমা বলেন, কবে পোলারা কাম করবো, আর আমি একটু আরাম পামু্।

মিরপুর এক নম্বরে সনি সিনেমার আশপাশে মুক্তা বেগম মৌসুমী ফল বিক্রি করেন। স্বামী নেশাগ্রস্ত, দুই ছেলে মাহিন (৫), জুনায়েদ (৩)। স্বামী এতোটাই বিপজ্জনক যে বাচ্চাদের কাপড়, ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করে নেশা করে। টাকা না পেলে মুক্তার ওপর চলে শারীরিক নির্যাতন। দুই সন্তানকে মানুষ করার ব্রত নিয়ে মুক্তা দিন শুরু করে। ছেলেদের গোসল করিয়ে খাইয়ে দুটি দড়ি দিয়ে খাটের সাথে বেঁধে যায়। সামনে দিয়ে যায় বিস্কুট, রুটি, কলা। খিদে পেলেই দুই ভাই তা খায়। পায়খানা প্রস্রাব লাগলে সেখানেই করে। মুক্তা এসে তা পরিষ্কার করে। একদিন এক আপা এ দৃশ্য দেখে মাহিন আর জুনায়েদকে মিরপুরের এক এনজিও চালিত দিবাযত্ন কেন্দ্রে নেওয়ার ব্যবস্থা করে। তারপর থেকে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মুক্তা। এখন তারা পড়াশোনা করে উন্নত জীবন পাবে তাই সে দেখে যেতে চায়।

এমন শ্রমজীবী মায়েরা তাদের শিশুদের দিবাযত্ন কেন্দ্রে রেখে জীবন যুদ্ধে অবতীর্ণ হন আর স্বপ্ন দেখেন সন্তানদের উন্নত জীবনের। স্বপ্নপুরী দিবাযত্ন কেন্দ্রের সুপারভাইজার ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, আদাবর এলাকায় এমন শ্রমজীবী নারীদের জন্য একটি দিবাযত্ন কেন্দ্র আছে। তবে চাহিদা অনেক। এই দিবাযত্ন কেন্দ্রের ৪৪ জন মায়েদের মধ্যে ৩০ জন স্বামী পরিত্যক্তা বা নেশাগ্রস্ত স্বামীর স্ত্রী অথবা দুই তিন বিবাহ করা স্বামীর স্ত্রী বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। এমন মায়েদের পাশে দাঁড়ানো প্রধানত সরকারের দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন সিডও কমিটির প্রাক্তন চেয়ারম্যান সালমা খান। তিনি বলেন, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মায়েদের জন্য এখনও তেমন করে দিবাযত্ন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। নিম্নবিত্ততো আরও পরের বিষয়। তিনি জানান, দেশে ৯ লাখ গৃহশ্রমিক নারী আছে, তাদের এক তৃতীয়াংশ যদি মা হয় তবে অনেক। তাদের অর্থনৈতিক দিককে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। শুধু কিছু এনজিওর করা দু/চারটি দিবাযত্ন কেন্দ্র দিয়ে হবে না।

আমরা নারীদের অবস্থান পরিবর্তন করে সমতা আনয়ন করতে চাইলে ভর্তুকি দিয়ে অথবা সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করে সরকারকে এই সুযোগগুলো সৃষ্টি করতে হবে। কারণ তাদের সাথে শিশুদের ভবিয্যত্ও জড়িত। বাবারা শিশুদের দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে নিচ্ছে না। মায়েরা এই সকল সহযোগিতার অভাবে একটা অবস্থা পরিবর্তন করে তারা পরের অবস্থানে যেতে পারছে না।

বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্টাটিসটিকস বা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সার্ভে দেখা যায় তিন বছরে দেশের শ্রমবাজারে নারী শ্রমিকের প্রবেশগম্যতা কমেছে ২.৫ শতাংশ। এই সার্ভেতে দেখা যায় ২০১১ সালে শ্রম বাজারে নারী শ্রমিক ছিল ৩৬ শতাংশ, যা ২০১৩ সালে এসে দাঁড়ায় ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ। বিজ্ঞজনেরা বলছেন, ২০০০ সাল থেকে দশ বছরে যে হারে নারী শ্রমিক শ্রম বাজারে প্রবেশ করেছে, তা ধরে রাখার অনূকূল পরিবেশ না থাকায় শ্রমিক সংখ্যা হ্রাস পায়।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, আমাদের ঢাকায় ৪৮টি ডে-কেয়ার সেন্টার রয়েছে। তার মধ্যে গার্মেন্টস কর্মীদের জন্যও রয়েছে। -বাসস

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৩ জুন, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১১:৫৯
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৪৯
এশা৮:১৪
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৪
পড়ুন