অর্ধেক মজুরিতে ওদের বেঁচে থাকার লড়াই
মো. রাশিদুল ইসলাম১৪ নভেম্বর, ২০১৬ ইং
অর্ধেক মজুরিতে ওদের বেঁচে থাকার লড়াই
ভোর সাড়ে পাঁচটা। ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন প্রকৃতিতে চোখ মেলে দেখার সুযোগ নেই। বাস-ট্রাকগুলো চলছে বাতি জ্বালিয়ে। হিমেল হাওয়া বাড়াচ্ছে শীতের তীব্রতা। ভোরের আলো ফুটতে তখনো বেশ বাকি। তবুও জীবিকার তাগিদে হাতে কাস্তে, কোদাল আর ধান বহনের বাঁক নিয়ে জড়ো হয়েছে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর হাজারো নারী শ্রমিক। ‘বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কে’র নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের নয়াবাজার ‘শ্রমিকের হাটের’ প্রতিদিনের দৃশ্য এটি। হাট থেকে শ্রমিক কিনে কৃষক নিয়ে যাচ্ছেন জমিতে। সেখানে গিয়ে কেউ ধান কাটছেন, কেউ বাঁকে করে ধান বহন করছেন, কেউবা আবার কর্দমাক্ত মাটিতে রসুন রোপণ করছেন।

শ্রম বিক্রি করতে আসা শ্রমিকের একজন চল্লিশ পেরোনো বিজলী ওরাঁও। তার অভাবের কাছে হার মেনেছে সব প্রতিকূলতা। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে দশ টাকা ভাড়ায় ট্রাকে চলে এসেছেন গুরুদাসপুরের ‘শ্রম বাজারে’ শ্রম বিক্রি করতে। শ্রম বিক্রি করেছেন ঠিকই, কিন্তু পাননি ন্যায্য মজুরি। ধারাবাহিক মজুরি বৈষম্যের এ গল্প বিজলী ওরাঁওয়ের একার নয়। দারিদ্র্যের কালো আগুনে ঝলসে যাওয়া হাজারো নারী শ্রমিকের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতিদিনের এ গল্প।

বিজলী ওরাঁও জানান, তাদের এলাকা অপেক্ষাকৃত নিচু। সেখানে ইরি-বোরো আবাদ ছাড়া চলতি মৌসুমে কোনো কাজ নেই। তাই গুরুদাসপুরে রসুন রোপণ, ধানকাটাসহ সকল কাজ করতে এসেছেন। এই দলের সঙ্গে আসা কলেজ ছাত্রী রাখীটক্কির মতে, তারা নিজের খেয়ে মজুরি পান ২০০ টাকা। অথচ অন্য সম্প্রদায়ের মহিলারা কৃষকের খেয়ে একই মজুরি পেয়ে থাকেন। আবার পুরুষ শ্রমিকরা ৪০০ টাকা করে মজুরি পান। অভাবের তাড়নায় মজুরি বৈষম্য মেনে নিয়েই প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার লড়াই করছেন তারা। আদিবাসী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলনবিলের গুরুদাসপুর, সিংড়া, তাড়াশ, রায়গঞ্জ উপজেলা এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী বসবাস করে। এদের মধ্যে ওরাঁও, মাহাতো, রাজবংশী, বিদাস, কনকদাস ও স্বল্প সংখ্যক সাঁওতাল ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী নারী-পুরুষ রয়েছে। এক সময় এসব সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ বনজঙ্গলে ঘুরে শিয়াল, খরগোশ, বেজি, কচ্ছপসহ নানা ধরনের প্রাণী নিধন করে জীবিকা নির্বাহ করত। সময়ের ব্যবধানে বন-বাদাড় উজাড় হয়ে পড়ায় তাদের জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সংসার চালাতে জীবিকা হিসেবে তারা ধান লাগানো, কাটা, মাড়াই, ইটভাটায় শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহের পথ বেছে নেয়। কঠোর পরিশ্রমী, সহজ-সরল আর অপেক্ষাকৃত কম দামে শ্রমিক পাওয়ায় এ অঞ্চলে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের চাহিদা অনেক বেশি।

হেমন্ত ও শরতে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের এলাকায় কাজ থাকে না। এ সময় অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায় মাঠে ধান কাটা, বহন, বিনা হালে রসুন রোপণের কাজ শুরু হয়। এ অঞ্চলের ৮০-৮৫ ভাগ ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী কৃষি শ্রমজীবী। কম মজুরিতে কৃষি শ্রম বিক্রি করেই তাদের সংসার পরিচালনা করতে হয়।

ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী নেতাদের দাবি, বর্ষাকালে অবহেলিত এই জনগোষ্ঠীকে ভিজিডি, ভিজিএফ, বয়স্ক ভাতার সুবিধা প্রদানসহ বিশেষ কর্মসূচির আওতায় এনে পুনর্বাসন করা। অন্যথায় এসব জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো অভাব মেটাতে নানা রকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে।

গুরুদাসপুরের মাঠে কাজ করতে আসা ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর নারী শ্রমিক শ্যামলী রানী ও কুমারী আল্পনা রানী জানায়, সকাল থেকে ৪টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন শ্রম দিয়ে তারা মজুরি পাচ্ছেন ১শ ৫০ থেকে ২শ টাকা। তাতে কোনো রকমে বেঁচে রয়েছেন।

খুটিগাছা গ্রামের আদিবাসী মুমতি মাহাতো জানান, ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক মাসে তাদের কোনো কাজ থাকে না। এ সময় অর্থ সংকটে পড়ে অল্প দামে শ্রম বিক্রি করতে হয়। কিংবা চড়া সুদে টাকা নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। অনেক নারী দূরের মাঠে কাজ করতে আসে না। ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর সেসব মহিলা চলনবিলের মাঠঘাট থেকে বিন্নার ফুলকা, আবার কেউ কেউ বিভিন্ন গাছ থেকে খেজুরের পাতা সংগ্রহ করছেন। ওই দলের অনিমা উড়াও ও রুপালী কেরকাটা জানায়, তাদের বাড়ি তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর গ্রামে। তাদের কাজ না থাকায় জীবিকা হিসেবে এগুলো সংগ্রহ করছে। বাড়িতে নিয়ে ঝাড়ু ও খেজুর পাতার পাটি তৈরি করে বিক্রির পর চালসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনবেন। সম্প্রতি নয়াবাজারের শ্রমিকের হাটে গিয়ে জানা গেল, গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম ছাড়াও তাড়াশ, সলঙ্গা ও উল্লাপাড়া বগুড়া শেরপুর উপজেলা এলাকার নারী শ্রমিকরা দল বেঁধে এখানে জমায়েত হয়। এসব শ্রমিকের সবাই এসেছে ট্রাক-বাসের ছাদে, নছিমন কিংবা অটোভ্যানে। সকলের গায়েই রয়েছে শীতের পোশাক, হাতে কাস্তে, কোদাল ও ধান বহনের জন্য বাঁক। পাশ দিয়েই সাঁই সাঁই করে চলছে বাস-ট্রাক। কৃষক তাদের চাহিদামতো শ্রমিক দরদাম মিটিয়ে সরাসরি নিয়ে যাচ্ছেন মাঠে। মজিবুর রহমানসহ পাঁচজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধান কাটা, বিনা হালে রসুন রোপণ, সেখানে নাড়া (ধানের খড়) বিছানোসহ জমি তৈরির কাজ করানো হয় এসব শ্রমিককে দিয়ে। তা ছাড়া স্থানীয় শ্রমিকদের তুলনায় কম মজুরিতে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর নারী শ্রমিকদের পাওয়া যায় বলে এদের কদর বেশি।

নাটোর জেলা জাতীয় আদিবাসী পরিষদ সভাপতি রমানাথ মাহাতো জানান, চলনবিলে বসবাসরত আদিবাসীদের ঘরে ঘরে অভাব চলছে। নিরুপায় হয়ে তারা কম মজুরিতে শ্রম বিক্রি করছেন। অনেকে গ্রাম্য মহাজনদের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৮
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন