মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কর্মক্ষেত্রে ফেরা!
সামিহা সুলতানা অনন্যা১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং
মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কর্মক্ষেত্রে ফেরা!
আমাদের দেশে নারীদের ক্যারিয়ারের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি একটি বড়

বাধা। এজন্য নারীদের অনেক সময়ই সহকর্মীদের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হয়।

এমনকি নারীদের চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রেও সেটি বাধা হিসেবে কাজ করে। যদিও

সেটি তাদের কোনো অপরাধ না

মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে স্বাগত জানানো হলো অফিসে। মনে হচ্ছিল ছুটি নিয়ে যেন কোনো অপরাধ করে বসে আছি। অফিসে নিজেকে একান্ত অনাকাঙ্ক্ষিতও মনে হচ্ছিল। ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে অফিসে আজই যোগ দিলাম। একদিকে বারবার বাসায় ফেলে আসা নিজের মেয়েটার কথা মনে হচ্ছে, যার বয়স মাত্র পাঁচ মাস হতে চলেছে। অন্যদিকে সহকর্মীদের নিতান্ত অপরিচিত মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে ছয় মাসে আমাদের মাঝে বেশ দূরত্ব

তৈরি হয়ে গেছে

‘দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে কাজে ফেরার ইচ্ছা হলো?’— এভাবেই মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে স্বাগত জানানো হলো অফিসে। মনে হচ্ছিল ছুটি নিয়ে যেন কোনো অপরাধ করে বসে আছি। অফিসে নিজেকে একান্ত অনাকাঙ্ক্ষিতও মনে হচ্ছিল। ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে অফিসে আজই যোগ দিলাম। একদিকে বারবার বাসায় ফেলে আসা নিজের মেয়েটার কথা মনে হচ্ছে, যার বয়স মাত্র পাঁচ মাস হতে চলেছে। অন্যদিকে সহকর্মীদের নিতান্ত অপরিচিত মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে ছয় মাসে আমাদের মাঝে বেশ এক দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। আর কাজ থেকে দূরে থেকে আমি অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছি। আগে ব্যাংকে আমি রেমিটেন্স ডেস্কে কাজ করতাম, এখন আমার ডেস্ক আরেকজন দেখছেন। নিশ্চয়ই   মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা কোনো অপরাধের মাঝে   পড়ে না। তবে আমাদের দেশে অনেকের আচরণে সেরকমটি মনে হয় না।

অফিসে অন্যরা যখন থেকে জানতে পারল আমি সন্তান সম্ভবা, তখন থেকে আমি আমার প্রতি আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। আগে যেসব কাজ আমাকে দেওয়া হতো, সেগুলো আমাকে কম দেওয়া হতে   থাকল, যেহেতু সামনে আমি লম্বা ছুটিতে যাব। বুঝলাম যে সে বছর আমার রিপোর্টও হয়ত খারাপ দেওয়া হবে, যদিও কাজ আমি আগের মতই করছিলাম। প্রচলিত ধারণা থেকে মনে করা হলো আমি পূর্ণ সময় দিতে  পারছি না ও ভবিষ্যতেও পারব না। প্রমোশনের              ক্ষেত্রে যেটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তবে ক্যারিয়ারের কথা ভাবতে গেলে সন্তান নেওয়া সম্ভব  হতো না। তবু ছুটি যে পাচ্ছি সেটি অনেক বড় বিষয়। আবার ছুটি শেষে যোগ দেওয়ার পর সহকর্মীদের কাছ থেকে অসহযোগিতা অনুভব করছি। এভাবেই নিজের মনের দুঃখের কথা বলছিলেন, বেসরকারি ব্যাংকের          কর্মী রিনা আক্তার।

আমাদের দেশে নারীদের ক্যারিয়ারের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি একটি বড় বাধা। এজন্য নারীদের অনেক সময়ই সহকর্মীদের সাথে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হয়। এমনকি নারীদের চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রেও সেটি বাধা হিসেবে কাজ করে। যদিও সেটি তাদের কোনো অপরাধ না। এই মনমানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। অবশ্য অন্যরকম অভিজ্ঞতাও আছে। চাকরি থাকাকালীন মাতৃত্বকালীন ছুটি, ক্যারিয়ারে এর প্রভাব ও পরবর্তীকালে চাকরিতে যোগদান সম্পর্কে জানতে কথা হচ্ছিল গণস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মী আজকিয়াতুন জেনান মলি ও এসপি মারুফা নাজনীনের সাথে।

আজকিয়াতুন জেনান মলি গণস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে আছেন। তিনি বলেন, নারীদের জন্য গর্ভকালীন ছুটি ছয় মাস খুবই কম সময়। অনেকে ছুটি আগে নিয়ে নিলে সন্তানের চার মাস বয়সের সময়ই চাকরিতে যোগদান করতে হয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে সন্তানকে খাওয়াতে যাওয়া বা সন্তানকে নিয়ে অফিসে আসাকে খুব কম জায়গাই উত্সাহিত করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে আমি খুবই ভাগ্যবান। চাকরিক্ষেত্রে গর্ভকালীন সময় ও পরে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে আমি সবসময়ই সহযোগিতা পেয়েছি। আমার বেশ কয়েকজন সহকর্মী গর্ভকালীন ছুটি শেষে চাকরিক্ষেত্রে যোগদানের পর তাদের সন্তানকে সাথে করে অফিসে নিয়ে এসেছেন। তবে চাকরি আসলে প্রতিযোগিতা। এখানে সকলেই প্রতিযোগী। এই গর্ভকালীন ছুটির কারণে অনেক সময় নারীকে সেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হয়। সহকর্মীদের কাছ থেকে নানাভাবে হেয় হতে হয়। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। এ ধরনের মন্তব্য তো খুবই সাধারণ- ‘আপনাদের তো মজা, ছয়মাস কোনো কাজ না করেই বেতন পাবেন‘। আমি সে সময় সন্তান সম্ভবা, সাত-আট মাস চলছে। তখন মনে হয়েছে যে আমি অফিসে থেকেও নেই। কারণ ছুটির কথা ভেবে অনেক কাজের সাথেই আমাকে জড়ানো হচ্ছে না। সেভাবে আমি অনুভব করছিলাম যে আমার সহকর্মীদের থেকে আমি পিছিয়ে পড়েছি। আবার অনেক দিন পর ছুটি শেষে চাকরিতে যোগদান করলে কাজের সাথে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয় তা দূর করতে সহকর্মীদের উত্সাহ কমই দেখেছি। এ কারণে সন্তান পালন ও চাকরিতে আবার মানিয়ে নেওয়ার পরীক্ষা পার করা নারীদের জন্য আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময়ই নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয়েছে, যা খুবই দুঃখজনক। অথচ গর্ভকালীন ছুটি একজন নারীর অধিকার- সেটি কোনো অপরাধ নয়।

মারুফা নাজনীন এসপি হিসেবে হবিগঞ্জে ফাউন্ডেশন ট্রেনিং-এ আছেন। তিনি ৩৩তম বিসিএসে পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেন। তিনি মনে করেন পুলিশ বাহিনীতে থেকে তিনি অন্য অনেক পেশার চেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছেন। তিনি যখন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যান সেসময় তার চিটাগাং নাইন আরমড পুলিশ ব্যাটিলিয়ানে মাত্র বদলি হয়েছেন। নতুন জায়গায় গিয়েই ছুটি নিলেও তার ছুটি পেতে কোনো অসুবিধা হয়নি। সহকর্মীদের কাছ থেকে সবসময়ই সহায়তা পেয়েছেন। তিনি বলেন গর্ভাবস্থায় যে ধরনের কাজ সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, যেমন ফাইয়ারিং, ভিভিআইপি ডিউটি সেগুলো তাকে দেওয়া হয়নি। গর্ভাবস্থায় অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতার জন্য তিনি অফিসে যেতে পারেননি, ছুটি নিয়েছেন। কিন্তু কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি এখন তার শাশুড়ির কাছে সন্তান রেখে অফিসে যান। তিনি বলেন, মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় আমার ফাউন্ডেশন ট্রেনিং হওয়ার কথা ছিল, সেটি করতে পারিনি। আমার ব্যাচের অন্যরা যদিও তখনই করেছে। এখন আমি ফাউন্ডেশন ট্রেনিং করছি। মাতৃত্বকালীন ছুটির কারণে হয়ত কিছু কাজের সুযোগ, অভিজ্ঞতা হারাতে হয়েছে। তবু আমি খুশি। কেননা আমি যখন ছুটি চেয়েছি তখন পেয়েছি।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৪:২৭
যোহর১১:৫৬
আসর৪:২৩
মাগরিব৬:১০
এশা৭:২৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৪সূর্যাস্ত - ০৬:০৫
পড়ুন