প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন জীবন
০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং
প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন জীবন
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিই হলো তৈরি পোশাক শিল্প। আর এই পোশাক শিল্পের প্রধান চালিকা শক্তি হলো

শ্রমিকরা এবং যাদের সিংহভাগই নারী। এই শিল্পকে সচল রাখতে প্রয়োজন সুস্থ-সবল শ্রমিক দল। স্বাস্থ্যের কথা যখন আসে, তখন

তার সঙ্গে অনিবার্যভাবেই চলে আসে পরিচ্ছন্নতার কথা। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করা নারী শ্রমিকরা প্রায় সবাই আসে

গ্রামাঞ্চল থেকে। বাসস্থানের জন্য তারা সাধারণত বস্তি এলাকাগুলো খুঁজে নেয়। সেখানেই চলে তাদের জীবন-যাপন

  নাছিমা খাতুন

 

রফতানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জিডিপিতে অবদান বৃদ্ধি যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হোক না কেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্পের অবদান অপরিসীম। স্বাধীনতার মাত্র ৭ বছর পরে প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে মাত্র ১২ বছরের মধ্যেই বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানো এবং দশ লাখের অধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান করা এ শিল্পের জন্য ছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো। 

রফতানি আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির সংখ্যাও বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫,০০০ এর বেশি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি আছে, এই তৈরি পোশাক শিল্পখাতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৪২ লক্ষ এবং বর্তমানে তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়। এই শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শ্রমিকের সিংহভাগই নারী শ্রমিক। ৯০ দশকে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণে এই শিল্প পায় নতুন মাত্রা। বর্তমানে এই শিল্পে মোট শ্রমিকের ৮০ ভাগই নারী শ্রমিক, যার অধিকাংশ এসেছে গ্রাম এলাকার হতদরিদ্র পরিবার থেকে। উপরোল্লিখিত তথ্যাদি থেকে সপষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্প কতটা গুরুত্বপূর্ণ। মূলত, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিই হলো তৈরি পোশাক শিল্প। আর এই পোশাক শিল্পের প্রধান চালিকা শক্তি হলো শ্রমিকরা এবং যাদের সিংহভাগই নারী। এই শিল্পকে সচল রাখতে প্রয়োজন সুস্থ-সবল শ্রমিক দল। স্বাস্থ্যের কথা যখন আসে, তখন তার সাথে অনিবার্যভাবেই চলে আসে পরিচ্ছন্নতার কথা। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করা নারী শ্রমিকরা প্রায় সবাই আসে গ্রামাঞ্চল থেকে। বাসস্থানের জন্য তারা সাধারণত বস্তি এলাকাগুলো খুঁজে নেয়। সেখানেই চলে তাদের জীবন-যাপন।

অনেকের মতোই একজন শ্রমিক মহসিনা মিনা, আমাদের সেলাই দিদিমণি। ভালোবেসে মনের মানুষকে বিয়ে করে স্বপ্নের সংসার-জীবন শুরু করেছিলেন। বর্তমানে তার ঘরে আছে দুই পুত্র সন্তান। সে এবং তার স্বামী একই ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। দুজন মিলে যা আয় করেন, তাতে সংসার চলে সচ্ছলভাবেই। তার দুই সন্তানই স্কুলে যায়। কিন্তু তাদের অসুখ-বিসুখ লেগে থাকে বছরজুড়ে, যার কারণে প্রায়ই স্কুল কামাই করতে হয়।

তারা ভালো খায় এবং ভালো পড়তেও পারে। কিন্তু শান্তি নেই এতটুকু। তার একটাই কারণ, আর তা হলো মিনা যেখানে থাকে সেই পরিবেশ, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ। যার এখানে-সেখানে পড়ে আছে ময়লা-আবর্জনা, আর তাতে অসংখ্য মাছি সারাক্ষণ ভনভন করছে। সেই মাছি গিয়ে বসছে তাদের খাবারের ওপর। নোংরা টয়লেটের গন্ধ পাওয়া যায় খাবার ঘর থেকেই। মিনারা কেউ সন্তানদের নিয়মিত সঠিকভাবে হাত ধোয়ানোর ব্যাপারে একেবারেই সচেতন না। এই একই মিনা আবার যতক্ষণ তার ফ্যাক্টরিতে থাকে, সারাক্ষণই নিয়ম করে প্রতিদিন পরিচ্ছন্নতা কর্মগুলো করে থাকে। কেননা, তার ফ্যাক্টরিতে এটাই নিয়ম। বর্তমানে বাংলাদেশের অনেকগুলো গার্মেন্টস তাদের শ্রমিকদের পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে খুবই সচেতন এবং তার জন্য সকল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা তারা তাদের প্রতিষ্ঠানে গ্রহণ করেছে। সারাদিন পরিচ্ছন্ন থাকার পর মিনা যখন বাসায় ফিরে, সে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক কর্মগুলো যেন বেমালুম ভুলে বসে থাকে। শুধু সে নয়, তার মতো প্রায় সবাই এই কাজ করে থাকে। ফলে তাদের বাসস্থলটি অস্বাস্থ্যকর হয়ে থাকে, সেখানে   ছড়ায় নানান রোগ-বালাই। এই ভুলে যাওয়ার কারণ একটাই, আর তা হলো সচেতনতার অভাব। একটা বিষয় এখানে উল্লেখ করার দাবি রাখে, সেটা হলো পরিচ্ছন্ন থাকা কিন্তু ব্যয়সাপেক্ষ নয় মোটেও, এটা পুরোপুরি একটি অভ্যাসের বিষয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে আমাদের সেলাই দিদিমণিদের সুস্থতা অনিবার্য। কারণ তারা সুস্থ না থাকলে, দুর্বল হয়ে পড়বে আমাদের পোশাক শিল্প। তাই আমাদের সেলাই দিদিমণিদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে কাজ করছে ‘কর্মজীবী নারী’র মতো কিছু সংগঠন। দেশের সর্বস্তরের মানুষকে সুস্বাস্থ্য এবং পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সচেতন করতে দেশব্যাপী চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়েছে ‘ডেটল-চ্যানেল আই পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ ক্যামেপইন। এর অধীনে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক সরাসরি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গণমাধ্যম দ্বারাও জনগণকে সচেতন করা হচ্ছে। এই ক্যামেপইনের লক্ষ্য হচ্ছে, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষকে স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতন করা। এই ক্যামেপইনের অংশ হিসেবে একটি দল বিভিন্ন বস্তিতে গিয়ে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক সরাসরি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং নিজের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। সেলাই দিদিমণিদের প্রয়োজন, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন একটি জীবন- এই লক্ষ্যে কাজ করছে তারা। কারণ, সুস্থ শ্রমিক, সচল ফ্যাক্টরি, সবল দেশ।        

এ বিষয়ে ‘কর্মজীবী নারী’ সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া রফিক বেবি বলেন, ‘গার্মেন্টস শ্রমিকদের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার জন্য শুধু তাদের নিজেদের সচেতন হলেই হবে না। এর পাশাপাশি প্রয়োজন সকলের সার্বিক সহযোগিতা। তাহলেই কেবল তারা পরিচ্ছন্ন জীবন-যাপন করতে পারবে।’ ইমপ্রেস ফ্যাশন লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক খন্দকার নাজিরুজ্জামান লিটন বলেন, ‘আমি মনে করি, দেশের সব গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক কার্যক্রম নিশ্চিত করা উচিত। কেননা, আমাদের পোশাক শিল্প খাতের ভবিষ্যতের সাথে শ্রমিকদের সুস্থতা জড়িত।’

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ইং
ফজর৫:২০
যোহর১২:১৩
আসর৪:১২
মাগরিব৫:৫১
এশা৭:০৫
সূর্যোদয় - ৬:৩৭সূর্যাস্ত - ০৫:৪৬
পড়ুন