ফুড স্টলে স্বপ্ন গড়ছেন তারা
৩০ এপ্রিল, ২০১৮ ইং
ফুড স্টলে স্বপ্ন গড়ছেন তারা
সৈয়দা রুমি

 

রাজধানীর ধানমন্ডির ব্যাচেলর পয়েন্টে একটি ছোট্ট খাবারের ভ্যান। যেখানে নানা বয়সী মানুষের ভিড়। ফ্রাইড চিকেন, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ও হালিম পাওয়া যায় সেখানে। ঢাকা শহরে এই দৃশ্য খুবই সাধারণ। তবে এই স্ট্রিট ফুডের ভ্যানটি দৃশ্য কিছুটা অসাধারণ। অন্যান্য খাবারের ভ্যানের ন্যায় একজন বিক্রেতা আছে সাথে একজন সাহায্য করছে। তারা দুজন সম্পর্কে মা ও মেয়ে। নিত্যদিন তাদের ফুড ভ্যানে খাবার খেতে আসে অনেক মানুষ।

সৈয়দা রুমি ও জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী খুবই সফলতার সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের ব্যাবসা। ঢাকা শহরে তাদের পথ চলা অন্যান্যদের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। একজন মা ও মেয়ে দিনের স্বাভাবিক জীবনযাপন শেষ করে খাবার বিক্রি করেন আগামী দিনগুলো   ভালোভাবে চলার আশায়। পরিবারের সদস্য তিনজন। এক ছেলে ও  এক মেয়ে নিয়ে তার পরিবার। ২০০৭ সালে স্বামী মারা গেছেন সড়ক দুর্ঘটনায়। তার মেয়ে ঐশী একটি সরকারি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। ছোট ছেলেটি তৃতীয় শ্রেণিতে রাজধানীর একটি বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর পাশে দাঁড়ানোর মতো ছিল না কেউ। তাই নিজেই নেমে পড়েন জীবন সংগ্রামে। শহরের হাজারো   প্রতিকূলতার ভিড়ে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর কেউ সামান্য উপকারটুকু করতে আসেনি। তখন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় জীবনের সব থেকে কঠিন সময়টুকু পার   করি। সিদ্ধান্ত নেই সঠিক উপায়ে জীবনে বড় হতে হবে। নিজেই ছেলেমেয়েদের মানুষের মতো মানুষ করতে হবে। তখন থেকেই সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস রেখে লেগে যাই কাজে’। কথাগুলো বলছিলেন পরিশ্রমী রুমি।   

একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায়ও কাজ করেন রুমি। দিনে পত্রিকা ও সংসারের বিভন্ন কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় খাবার বিক্রি করেন মা ও মেয়ে। এই উপার্জনে রাজধানী ঢাকার মতো শহরে সচ্ছলভাবে জীবনযাপন করা হয়তো সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে একটি প্রতিকূল জীবনের হাল না ছাড়ার বিস্ময়কর উদাহরণ সৈয়দা রুমি ও জান্নাতুল ফেরদৌস ঐশী। অন্তত জীবন সংগ্রামে হেরে গিয়ে বসে নেই তারা। 

 

শিল্পী আক্তার

 

রাজধানীর সীমান্ত স্কয়ারের ফুড কোর্টে একটি স্টল। কাজ করছে ৩ জন নারী ও ২ জন পুরুষ। ফুড স্টলগুলোতে সাধারণত পুরুরষদের দেখা মেলে। তবে এই স্টলটিতে দেখা যাবে ভিন্ন দৃশ্য। ভিন্ন রকম ফাস্ট ফুড আইটেম পাওয়া যায় স্টলটিতে। শিল্পী আক্তার স্টলটির মালিক। নিত্যদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত স্টলে থাকেন শিল্পী আক্তার। পরিবারে দুই মেয়ে। স্বামী থেকেও নেই। তাই পরিবারের হাল ধরতে হয়েছে নিজেকেই। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের প্রমিনেন্ট ফুডে জীবনের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে এসেছেন শিল্পী। পরবর্তী কালে বিজিবির সহায়তায় সীমান্ত স্কয়ারে এই ফুড স্টলের ব্যবসায় যেখানে কয়েকজনের কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থাও করেছেন তিনি। হাজারো পুরুষদের ভিড়ে একা নারী হয়ে জীবন সংগ্রামে এগিয়ে চলছেন শিল্পী। বড় মেয়ে ঢাকা সিটি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী এবং ছোট মেয়ে একটি বিদ্যালয়য়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

প্রতিকূলতায় পরিপূর্ণ জীবন শিল্পী আক্তারেরও। তবে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস ও কাজ করে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছাশক্তি শিল্পীকে নিয়ে এসেছে বহুদূর। ‘আমি মনে করি পরিবারে পুরুষই সব নয়, একজন নারী ও একজন মা হিসেবে সন্তানদের পাশে দাঁড়ানো উচিত সকল মায়ের। সামাজিক ক্ষেত্রগুলো সহায়তা করলে নারীরা যেতে পারবে বহুদূর। ইচ্ছে আছে আরো কয়েকটি ফুড স্টল দেয়ার’। নিজের মতামত বলেন জীবন সংগ্রামী শিল্পী আক্তার। 

সামসুন নাহার

 

বছরের ১২ মাস জুড়ে রাস্তার টং দোকানগুলোতে চা খেতে দেখা যায় প্রায় সকল বয়সী চা প্রেমীদের। কাজের ফাঁকে কিংবা ক্লাসের বিরতিতে রাস্তার টং দোকানগুলোতে চা খেতে ভিড় জমে। চায়ের দোকানে পুরুষদের পাশাপাশি তাই মহিলা চা কারিগরদেরও দেখা মিলছে সমপরিমাণে। কখনও স্বামীর সাথে কিংবা কখনও একাই সামাল দিচ্ছেন দোকানের কাজ। শত কাপ চা বানিয়েও ক্লান্ত নয় তারা।

চা বানিয়ে জীবন কেটে যাওয়া এসব নারী চা কারিগরদের জীবনের গল্প কিছুটা অন্যরকম। সংগ্রামী জীবনের গল্প বলেন সামসুন নাহার নামের এক চা বিক্রেতা। ‘চা বানাইতে অনেক কষ্ট হয় সারাদিন। চুলার গরমে পুরে যাই। কিন্তু কিছু করার নাই। সংসারে আমি একাই তাই একাই রোজগার করে খাইতে হয়।’ আবেগজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলেন, সামসুন নাহার। পরিবারে তিন মেয়। চা বিক্রি করে তিন মেয়েরেই বিয়ে দিয়েছেন সামসুন নাহার। ব্যক্তিগত কিছু কারণে স্বামীর কথা প্রকাশ করেননি তিনি। বর্তমানে একাই থাকেন নাহার। সকাল ১০টায় দোকান খুলে বসেন এবং রাতে যতক্ষণ কাস্টমার থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত দোকান খোলা রাখেন। বিকেলের দিকে ভিড় একটু বেশি থাকে বলে জানান নাহার। কাষ্টমার আসলে বেচা বিক্রি ভালোই হয়। তবে ঝড়-বৃষ্টি হলে কেউ আসতে চায় না। কারণ বসার মতো তেমন কোনো সু ব্যবস্থা নেই নাহারের এই ছোট দোকানে। মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা দোকান ভাড়া দেন তিনি। 

চা বানাতে খরচ খুব একটা বেশি নয়। চা পাতা ও চিনি নিজেই কেনেন নাহার। দোকানের মালিক কন্ডেন্স মিল্কের সরবরাহ দেন। দিন শেষে নাহারের আয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। এই টাকায় কষ্ট করে সংসার চলে তার। তবে একাই হওয়ায় কষ্ট খুব বেশি অনুভব হয় না বলেন তিনি। দোকানের জন্য চাঁদা দিতে হয় না তাই দোকান নিয়ে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না খেঁটে খাওয়া সামসুন নাহারকে। এলাকায় কিংবা দোকানে কেউ সমস্যা করে কি না জানতে চাইলে সামসুন নাহার বলেন অধিকাংশ চাকরিজীবী কিংবা শিক্ষার্থীরা চা খেতে আসে, তাই সকলে মোটামুটি ভদ্র সমাজের। এভাবেই সামসুন নাহার সমাজের সেবায় নিয়মিত পরিশ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। পরিবারকে সহায়তার জন্য ও জীবিকা নির্বাহ করতে নিয়মিত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাহসের সাথে একাই কাজ করে যাচ্ছেন অনেক খেঁটে খাওয়া নারীরা। তাদের জীবনের গল্প হয়ে ওঠে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার সাহস। 

লেখা ও ছবি: ওয়াজি তাসনিম

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২১ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন