পরিবারেও সুরক্ষা দরকার
০৪ জুন, ২০১৮ ইং
পরিবারেও সুরক্ষা দরকার
পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কেউ

হয়তো এখনো মনে করে স্ত্রীর গায়ে

হাত তোলা স্বামীর অধিকার। এ মানসিকতার পরিবর্তন করলেই সমাজের বহু নারী নির্যাতন বন্ধ হয়ে যাবে। শুধু আইন দিয়ে সমাজের এই অন্যায়-অনাচার দূর হবে না। মনে রাখতে হবে

সহিংস পরিবার সুষ্ঠু সমাজ

নির্মাণে বড় অন্তরায়

  ইয়াসমীন রীমা

 

আজ শিখার কুলখানি অনুষ্ঠিত তার পিতৃালয়ে। চেনা-জানা অনেক অতিথি-পড়শি ও আত্মীয়-স্বজনদের আগমনে শিখাদের বাড়ির উঠানের ওপর টাঙানো সামিয়ানার তল ভরে গেছে। অতিথি ও অভ্যাগতের চোখে-মুখে যেন একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন। সবাই-ই জানতে চায় মা-মরা সদ্য বিবাহিত সুশ্রী এই মেয়েটির মৃত্যুর কারণ কি? কেনইবা তার এ অকাল মরণ।

জেলা কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার মহিষমারা গ্রামের আবদুল মতিন মাস্টারের মেয়ে সাদিয়া খাতুন শিখাকে গ্রামের সবাই চিনতো। খুব হাসি-খুশি ও চঞ্চলতা ভরা একটি প্রাণ ছিল। সুখে-দুঃখে সবার কাছে যেত সে। গ্রামের আপদে-বিপদে সবার কাজে আসতো। অত্যন্ত সফলতার সাথে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়েছিল। ইচ্ছে ছিল ব্যারিস্টার হবে। কিন্তু ভালো ঘরের সম্বন্ধ আসায় পিতা-মাতা মরা মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয় পাশের হরিণধরা গ্রামের মাওলানা আবু সুফিয়ানের কাতার প্রবাসী ছেলে আবু জুনায়েদের সাথে। বিয়ের পর ভালোই ছিল শিখার ঘর-সংসার। শ্বশুড়বাড়ির ননদ-ভাসুর-জা’দের সাথে বনিবনাও হয়েছিল। কিন্তু তিন মাস না যেতে   স্বামী আবু জুনায়েদ আর বিদেশে যেতে চাইল না। দেশে         ব্যবসা করার পরিকল্পনা করলো। কিছু টাকা দাবি করলো শিখার বাবার কাছে। একমাত্র কন্যার সুখের কথা চিন্তা করে স্কুল   মাস্টার পিতা জমি বিক্রি করে সেই টাকা পরিশোধ করলো।    সাত মাসের মাথায় ব্যবসা লাটে উঠলো। আবু জুনায়েদ     সম্পূর্ণ বেকার হয়ে পড়লো। আর সংসারে জীবনে খুঁটিনাটি বিষয়াদি নিয়ে শিখার সাথে মনোমালিন্য শুরু হয়ে গেলো। একদিন সন্ধ্যায় সেটি চরমে ওঠে। একপর্যায়ে শিখার গায়ে হাত তুলে জুনায়েদ, এলোপাতাড়ি মারের কারণে শিখার মৃত্যু ঘটে তত্ক্ষণাত।

কেবল শিখাই নয় দেশে নারীর প্রতি যে সহিংসতা              চলছে, তার ৯৫ ভাগই পরিবারের সদস্যদের কাছে থেকে হয়ে থাকে। যে পরিবারে শান্তির স্থান নেই সেই পরিবারেই নারী সবচেয়ে অরক্ষিত। তা ছাড়া পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো সমাজে ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, গত দুই বছরে দেশে সামাজিক অপরাধের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এখনই যদি এ অবস্থা প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তবে সাত-আট বছরের মধ্যে তা ‘মহামারীর’       রূপ নেবে।

সম্প্রতি দেশে পরপর কয়েক দিন বেশ কয়েকটি মর্মান্তিক পারিবারিক খুনোখুনির ঘটনা ঘটার পর বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের সংঘটিত হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন তারা। এগুলো হলো- মানুষের ধৈর্য-সহ্য শক্তি কমে যাওয়া, খাদ্যে ভেজাল, অর্থের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত লোভ, সামাজিক অবস্থানে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অসম প্রতিযোগিতা, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতা, অন্য দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর অযথা চেষ্টা, দাম্পত্য কলহ ও স্বামী-স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাসহীনতা, স্বল্পসময়ে ধনী হওয়ার ইচ্ছা, সামাজিক উন্নয়নে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া, সুস্থ বিনোদনের অভাব ও মাদকাসক্তি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে সারা দেশে ৩ হাজার ৬১টি খুনের ঘটনা ঘটে। এ সময়ে রাজধানীতে ১৯ জন খুন হন, যার মধ্যে ১৬টি খুনের কারণ সামাজিক ও পারিবারিক। পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রতিদিন গড়ে খুন হচ্ছেন ১৪-১৫ জন। এর অধিকাংশই পারিবারিক ও সামাজিক কারণে হচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাব মতে, গত পাঁচ বছরে শুধু যৌতুকের কারণে এক হাজারের বেশি নারী হত্যার শিকার হয়েছেন। এই বাইরে  আত্মহত্যা, শারীরিক মানসিক নির্যাতনের ঘটনা তো আছেই।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম বলেন, ‘প্রতিটি পরিবারেরই ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা থাকে। আর অনেক কারণ একত্রিত হয়ে এ ধরনের পারিবারিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। তবে এর পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে হতাশা, পরকীয়া, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যাওয়া, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ইত্যাদি। এখন মানুষের মধ্যে সুস্থ বিনোদনের অভাব হওয়ায় তাদের আচরণেও ক্রমাগত পরিবর্তন ঘটছে। এতে তারা অন্যের কাছে নিজের আবেগ প্রকাশ করতে পারছেন না। একই সঙ্গে প্রযুক্তির কারণে নর-নারীর মধ্যে এখন এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা কাজ করছে। আকাশ সংস্কৃতির কারণে অসুস্থ অনুষ্ঠান দেখে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। মানুষের আচরণ ক্রমেই সহিংস হয়ে পড়ছে। আর এ পরিস্থিতিতে অনেকেই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে আপন মানুষটিকে হত্যা করছেন।’

সামাজবিজ্ঞানী আবদুল্লাহ হেল বাকী বলেন, ‘দেশে বর্তমানে ৬৫ থেকে ৮৫ লাখ মানুষ অতিমাত্রায় বিষণ্নতায় আক্রান্ত। আর এ কারণে সামাজিক অপরাধ আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে ষাটের দশকের তুলনায় বর্তমানে বিবাহবহির্ভূত ও বিবাহপূর্ব অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার পরিমাণ তিনগুণ। পরকীয়া পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্যতম একটি বড় কারণ। আগের মতো বাংলাদেশে যৌথ পরিবার প্রথা নেই। মানুষ ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। এখন মানুষ যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ কারণে আপন মানুষটিকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করছে না।’

পারিবারিক সহিংসা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ দেশে প্রচলিত অন্যান্য আইনের তুলনায় আধুনিক ও আলাদা। কিন্তু আইনটির উপকারভোগী  ও বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ অনেক সময় পুরনো ধ্যানধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। তবুই আইনে সহিংসতার শিকার নারী ক্ষতিপূরণ পান। এই আইনের বলে বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত নারী যে বাড়িতে বসবাস করছিলেন সেই বাড়িতে থাকতে পারেন। কেবল আদালতের নিষেধ অমান্য করলে অপরাধী কঠোর শাস্তি পেয়ে থাকে। এ ছাড়া অপরাধীকে নির্দিষ্ট সময়ে জন্য সমাজকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত থাকার নির্দেশও দিতে পারেন আদালত। আইনটি প্রণয়নের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তারা বলছেন যে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা সংসার করতে চান। সহিংসতার শিকার নারী এ আইনের সুবিধা পেলে সংসারই নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে থাকতে পারেন। নয়তো শান্তিপূর্ণভাবে আলাদা হয়ে যেতে পারেন।

পরিবার হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না। সেখানে সব সদ্যস্যের অধিকার সমান। সাধারণ বিবেচনায় পরিবার হচ্ছে সমাজের মৌলিক প্রতিষ্ঠান মৌলিক অর্থনৈতিক একক। নারীর প্রতি নির্যাতন বন্ধ করতে হলে সবার আগে পুরুষদের মনমানসিকতার পরিবর্তন দরকার। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কেউ হয়তো এখনো মনে করে স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা স্বামীর অধিকার। এ মানসিকতার পরিবর্তন করলেই সমাজের বহু নারী নির্যাতন বন্ধ হয়ে যাবে। শুধু আইন দিয়ে সমাজের এই অন্যায়-অনাচার দূর হবে না। মনে রাখতে হবে সহিংস পরিবার সুষ্ঠু সমাজ নির্মাণে বড় অন্তরায়।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৪ জুন, ২০২০ ইং
ফজর৩:৪৪
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩৭
মাগরিব৬:৪৬
এশা৮:০৯
সূর্যোদয় - ৫:১০সূর্যাস্ত - ০৬:৪১
পড়ুন