মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে চাকরিতে ফেরা
সামিহা সুলতানা অনন্যা১২ নভেম্বর, ২০১৮ ইং
মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে চাকরিতে ফেরা
 

বাংলাদেশে চাকরি ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় এখনও অনেক কম। চাকরিজীবন শুরু করলেও অনেক সময় দেখা যায় মধ্যপথেই সেই কাঙ্ক্ষিত চাকরি নারীকে ছেড়ে দিতে হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে আমাদের দেশে সন্তান জন্মানোর পর চাকরি ছেড়ে দেওয়া নারীর সংখ্যা অনেক বেশি। সন্তানকে দেখাশোনার লোক বা ডে কেয়ারের অভাব, নানা পারিবারিক -সামাজিক চাপ এর পেছনে অন্যতম কারণ। সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা মূলক আচরণই পারে চাকরি থেকে অকালে ঝরে পড়া নারীর সংখ্যা কমাতে। সন্তান জন্মদানের মধ্যে দিয়ে প্রতিটি নারীর শুরু হয় এক নতুন জীবন। মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে চাকরিতে যোগদান, সন্তান দেখাশোনা, সংসার সামলানো একইসাথে এই সব দায়িত্ব পালন প্রতিটি মায়ের জন্য হয়ে পড়ে খুবই কঠিন। ছুটি শেষে চাকরিতে যোগদান করতে গিয়ে সম্মুখীন হতে হয় নানা বাধার তেমনি সন্তানকে ফেলে চাকরি করায় ভুগতে হয় আত্মযন্ত্রণায়। এই কঠিন সময় পার করতে নারীর কি করণীয় জানতে কথা হচ্ছিল দুজন চাকরিজীবী নারীর সাথে।

 ফারিয়া আক্তার প্রাইভেট ব্যাংকে আছেন। তিনি বলেন, আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি যে আমি ছয়মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি পেয়েছি। আগে প্রাইভেট ব্যাংকগুলোতে নারীদের চল্লিশ দিন পরেই যোগ দিতে হত। এজন্য চল্লিশ দিন পরেই সন্তানকে বাইরের দুধ দিতে হত। এসময় অনেকেই তাই চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হত। তেমনি ছয়মাস ছুটি শেষে চাকরিতে যোগদান করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে যে, আমার পক্ষে এই চাকরি করে যাওয়া সম্ভব নয়। এখনও আমি যে চাকরি করছি এর পেছনে আমাকে কি পরিমাণ সংগ্রাম করতে হয়েছে নিজের সাথে, অফিসের সাথে ও পরিবারের সদস্যদের সাথে তা বলে বুঝাতে পারব না। এসময় আমার একই সাথে প্রমাণ করতে হয়েছে যে সন্তানের কারণে আমার কাজে কোনো ঘাটতি হচ্ছে না আবার আমি চাকরি করছি দেখে আমার সন্তানের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। অফিসে যোগদানের পরে সহকর্মীদের কাছ থেকে প্রথমেই শুনতে হয়েছে “আপনাদের তো মজা, ছয় মাস কাজ না করেই বেতন পেলেন”। এসময় প্রতিটি নারী জীবন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে সন্তান জন্মদান করে। প্রায় সম্পূর্ণ সময় সন্তানের সাথে রাত জেগে কাটাতে হয় কিছুক্ষণ পর পর খাওয়াতে হয়। সন্তানকে দেখাশোনা করতে গিয়ে সম্পূর্ণ ঘরে বন্দি থাকতে হয়। তবু শুনতে হয় ছয়মাস আনন্দে ছুটি কাটিয়েছি। এখন ডাক্তাররা বলে সন্তানকে একবছর পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়াতে। চাকরি শুরু করার পর আমি যে দুপুরে এসে সন্তানকে খাইয়ে যাব তার উপায়ও ছিল না। শুনতে হত আমি ফাঁকি দিচ্ছি। অন্যদিকে বাসায় শুনতে হয়েছে, তোমার এই চাকরির জন্য বাচ্চা বঞ্চিত হচ্ছে। প্রথম যেদিন অফিসে যোগ দিয়েছি মনে হয়েছে বাচ্চাকে ফেলে আমার পক্ষে অফিসে থাকা সম্ভব না। সেসময় মানসিক সাহসের দরকার ছিল তার পরিবর্তে পরিবারের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে, আমাকে না পেয়ে সন্তান কত কেঁদেছে, খুঁজেছে। মনে হয়েছে মা হিসেবে আমি অন্যায় করছি। এখন আমার মেয়ে ক্লাস ফাইভে পরে। আমি ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধু। অফিস শেষে বাড়ি ফিরলে আমাদের গল্প, পড়াশোনা শুরু হয়। আমাকে চাকরির ব্যাপারে আমার মেয়েই উত্সাহ দিচ্ছে। আমাকে কম সময় পাচ্ছে বলে তার কোন অভিযোগ নেই। আমি সেইসময় সব বাধার মুখে চাকরি করে গেছি বলে আজকে এই অবস্থানে আসতে পেরেছি তবে অনেকেই হয়ত পারবে না। সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন নারীদের চাকরিজীবনকে অনেক সহজ করে দিতে পারে।

আমি যখন মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে প্রথম অফিসে ঢুকি মনে হচ্ছিল আমি নিতান্তই অনাকাঙ্ক্ষিত। আমার সিটে আরেকজন বসে কাজ করছে। আমি যে কোথায় বসব বা কি করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। মানুষের আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল আমি কোন অপরাধ করে এসেছি। এতদিন ছুটি কাটিয়ে কেন আবার অফিস করতে চাচ্ছি। অন্যদিকে আমার ছেলেকে তার নানির কাছে রেখে এসেছি। সারাক্ষণই আমার মনে হচ্ছে এই বুঝি ও কাঁদছে। এভাবেই নিজের মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে তার প্রথম অফিসে যোগদানের গল্প বলছিলেন নীলা। তিনি বলেন, আমাদের এখানে মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে পুনরায় কাজে ফেরা এক যুদ্ধ। এখানে সহকর্মীদের কাছ থেকে সহযোগিতা খুব কমই পাওয়া যায়। প্রথম কাজ শুরু করে মনে হয় কোন কিছুই আর আগের মত নেই। নিজের সেই কর্মপরিবেশ আবার ফিরে পাওয়া বেশ কঠিন। আমার এই ছুটিকে দুর্বলতা হিসেবেই দেখা হয়। কর্মজীবনে অগ্রগতির ক্ষেত্রে তাই একটি খারাপ প্রভাব পড়ে। ধরেই নেওয়া হয় আমার পক্ষে আগের মত কাজ করা সম্ভব নয়। যেটি কখনই সত্য নয়। আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন খুবই প্রয়োজন। আমার ছেলের দাদা-দাদি, নানা-নানি সকলেই থাকে গ্রামের বাড়িতে। আমার অফিস মতিঝিলে ছিল। মতিঝিলে এত অফিস কিন্তু ডে-কেয়ার সেন্টার অপ্রতুল। একটি দুটি অফিসে ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা রয়েছে। আমার অফিসে কোন ডে-কেয়ার সেন্টার ছিল না। আমার মায়ের পক্ষে কতদিন নিজ বাড়িঘর ফেলে নাতিকে দেখা সম্ভব। তাই দেখাশোনার লোকের অভাব এবং একই সাথে চাকরির বৈরী পরিবেশের কারণে তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। আজকে বাচ্চা রাখার ডে-কেয়ার সেন্টার থাকলে আমার জীবনে এরকম সিদ্ধান্ত নিতে হত না। জানি না ভবিষ্যতে আবার চাকরি করতে পারব কি না, তবে চেষ্টা করব।

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন