সৈয়দপুরের শাহানাজ হস্তশিল্পের অপরাজেয়
১২ নভেম্বর, ২০১৮ ইং
সৈয়দপুরের শাহানাজ হস্তশিল্পের অপরাজেয়
  মো. আমিরুজ্জামান

 

শিশুকালে বাবা হারিয়ে মা-ই ছিল তাদের সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম। মায়ের দীক্ষা ও প্রেরণা নিয়ে দুই যুগ ধরে হস্তশিল্পের অপরাজেয় বনে গেছেন নীলফামারীর সৈয়দপুরের শাহানাজ বেগম। বাজারের অতি সাধারণ পোশাকটি আজ তার কল্পনার বাহারি বুনন আর রকমারি নকশার ছোঁয়ায় আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে তার রকমারি ডিজাইনের পোশাক সরবরাহ হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অভিজাত বিপণি বিতানে। এতে তার ভাগ্য বদলের পাশাপাশি জুটছে বেকার নারীদের কর্মসংস্থান। দক্ষতায় বাড়ছে তাদের স্বনির্ভরতা।

জানা যায়, সৈয়দপুর শহরের ৫নং ওয়ার্ডের মুন্সিপাড়ার মকবুল হোসেনের ছয় সন্তানের মধ্যে "্বিতীয় মেয়ে শাহানাজ বেগম। ছয় বছর বয়সে দেখেছেন বাবার এ শহরের ব্যস্ততম বাজারের মনিহারি বিপণি বিতান। এসব কিছু মনে নেই। তবে পরে জানতে পারেন তার বাবা মানসিক রোগী থাকায় কোথাও বেরিয়ে গেছেন। আজও তার খবর কেউ জানেন না।

পরে ব্যাংক ঋণের কারণে তাদের দোকানটি ব্যাংক জব্দ হয়। আয়ের উত্স হারিয়ে সাত সদস্যর পরিবারে নেসে আসে অনটন। সন্তানদের বাঁচাতে সংসারের হাল ধরেন মা' শাহানারা বেগম। নিজ বাড়িতে বসে সেলাইয়ের কাজ করেন। পাঁচ বোনের মধ্যে শাহানাজ মায়ের পাশে বসে সেলাই কাজে সাহায্য করতেন। পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন পড়ালেখা। এভাবে তুলশিরাম গার্লস সড়ুলে নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় সৈয়দপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিস থেকে তিন মাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ নেন। আর এ প্রশিক্ষণের লব জ্ঞানে বদলে যায় শাহানাজের ভাগ্য। সুই-সুতোর পাশাপাশি ব্লক, বুটিকস, ফোরন, কারচুপির পরিকল্পিত ও নানা ডিজাইন এবং নকশার স্টাইল প্রয়োগে অতিসাধারণ পোশাকগুলো আভিজাত্যময় হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন এলাকার বিলাসবহুল বিপণি বিতানগুলোকে সমৃ" করে সৃষ্টি করে সৌখিন ও অভিজাত গ্রাহক।

বাবাকে হারানোর যন্ত্রণায় মা'কাতর না হয়ে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করেছেন। আর মায়ের দেখানো এই দীক্ষার পথে হেঁটে সফলতা পেয়েছেন শাহানাজ। তাই দুই মা-মেয়ের রোজগারে অন্যন্য বোন ও ভাইটিকে শিক্ষিত করেছেন। বোনদের দিয়েছেন বিয়ে। তবে এর পিছনের মূলমন্ত্রটি পেয়েছেন ২০০০ সালে সৈয়দপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তিন মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ। এ প্রশিক্ষণ লব জ্ঞান আর মায়ের সংকল্প সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে তাকে। মাত্র ৭শ' টাকার অর্ডারের পুঁজি দিয়ে শুরু হয় তার হস্তশিল্পের কারুকাজ। এভাবে এক যুগে অনেকটা স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন। প্রসার ঘটে তার ব্যবসার। ২০১২ সালে বিয়ের পর স্বামীর সহযোগিতায় এ হস্তশিল্পের পেশাটির বাণিজ্যিকতা শুরু হয়। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

শহরের লিবাটি সিনেমা হল সংলগ্ন ৫নং ওয়ার্ডের দর্জিপাড়া এলাকার স্বামীর গৃহে একান্ত আলাপচারিতায় শাহনাজ বেগম জানায়, তার সংগ্রামী সাফল্যগাঁথা জীবনের বেড়ে ওঠার গল্প। শাহানাজের স্বামী ফায়েজউদ্দিন নিজস্ব জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুত্ সরবরাহের ব্যবসার সাথে এ ব্যবসাও দেখাশোনা করেন। কাপড়ের ওপর নিখুঁত পরিকল্পনার ডিজাইন আর তার স্বামীর বাজারজাতের সহায়তা দুই মিলিয়ে শাহানাজের হস্তশিল্পের এ ব্যবসা অনেকদূর এগিয়েছে। এখন তার পুঁজি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। আর তার  পোশাকে পরিকল্পিত ডিজাইনে প্রায় দুই শতাধিক নারী সুচি শিল্পি নিজ বাড়িতে অন্যান্য কাজের ফাঁকে শোভাবর্ধনে এ কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

শহরের মুন্সিপাড়া, রাবেয়া মিল, কুন্দল, শ্বাসকান্দর, কাজিহাটসহ বিভিন্ন এলাকার প্রায় পাঁচ শতাধিক নারী কারিগররা শাহানাজের কাছে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়েছে। চাঁদনি খাতুন, তাবাস্সুম, আফসানা, চান্দা সরকার, সনি, মুসারত, রওশন আরা, রুহি আক্তার, লাভলী, হাফিজা খাতুন সায়কা বেগম জানায়, মিলে প্রায় দুই শতাধিক নারী নিয়মিত এ কাজ করছেন। নিজ বাড়িতে সংসারের কাজের ফাঁকে এ কাজ করে তারা মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। গড়ে তুলেছেন 'অপরাজিতা যুব মহিলা উন্নয়ন সমিতি'। উদ্দেশ্য প্রত্যেকে-প্রত্যেকের সাহায্যে এগিয়ে আসা। এখানে মাসে একবার সমাজে তাদের নিরাপদ মাতৃত্ব, বাল্য বিবাহ রোধ, যৌতুক বিরোধী ও পিছিয়ে পড়া নারীদের সচেতনতা বাড়াতে আলোচনা সভা করেন। আর আর্থিক সমস্যায় সঞ্চিত অর্থ দিয়ে করা হয় সহায়তা। যার নেতৃত্বে রয়েছেন শাহানাজ।

শাহানাজ জানায়, উত্সবে কাজের চাপ বেশি থাকে। তারপরেও বিশেষ একটি চাহিদার বাজার তাদের দখলে রয়েছে। এর মধ্যে নকশিকাঁথা, গিটভরাট, নিমপাতা, অ্যাবলিক, কাটোয়ার অ্যাবলিক, জড়ি, পুথি, ডালফোরন, সুতা বসানো, ক্রসজয়েন্ট, উল্টাক্রস, গুজরাটি, ফেব্রিক্স ও ডলার বসানো শাড়ি, থ্রিপিস, পাঞ্জাবি, জিপসি, ফতুয়া ও কারুকাজসমৃ" শট কামিজের চাহিদা বেশি। এছাড়া বুটিকস, কারচুপি, এমব্রোয়ডারি, বেডশিড, কুসনকভার, মশারির কভার, ওয়ালম্যাট, পার্টস, ব্যাগ, টিফিন ব্যাগ, কাপড় রাখার ব্যাগ, হ্যান্ড ব্যাগ, মোবাইল ব্যাগ এবং নকশি ফুল কাঁথা, বকুল ফুল কাঁথা, ক্রস ষ্টিজ কাঁথার ডিজাইন ও ম্যাচিং করে শোরুম মালিকদের ইচ্ছেমত বানিয়ে সরবরাহ করেন। এতে দেশের সকল সেনা কল্যাণ শোরুমসহ ঢাকার মিরপুর-১০, উত্তরা, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, যশোরসহ বিভিন্ন স্থানে যায় তার হস্তশিল্পের পোশাক। এভাবে প্রতি মাসে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় হয়।

শাহানাজের স্বামী ফায়েজ উদ্দিন জানায়, এ ব্যবসা বাড়াতে চলতি বছর স্থানীয় মহিলা অধিদপ্তর থেকে একটি ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহণ করি। গ্রাহক চাহিদা মেটাতে এ পুঁজি সংকুলান হচ্ছে না। কারণ স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন বাজারে এ শিল্পের পোশাকের কদর বেড়েছে। সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের সৌখিন ও অভিজাত গ্রাহক। তাই স্বল্প লাভের ব্যবসায়িক ঋণ পেলে এ হস্তশিল্পের প্রসারতা বাড়ত। সৃষ্টি হত ব্যাপক নারী কর্মসংস্থান।

সৈয়দপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা এ কে এম জিয়াবুল আলম বলেন, শাহনাজের কারচুপি পোশাকের কাজ নিয়ে এ এলাকায় নারীদের নবজাগরণ ঘটেছে। অনেকে এ পেশায় সচ্ছল হচ্ছেন। তাই এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা চলছে। সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বজলুর রশীদ বলেন, শাহানাজের হস্তশিল্পের মনোমুগকর ডিজাইনের কারণে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তার ব্যবসায়িক প্রসারে নিজ আত্মীয় ও পরিচিতজনদের কাছে বাজারজাতের ব্যবস্থা করেছি। কারণ এ শিল্পটিতে কর্মসংস্থান বাড়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তাই উপজেলা প্রশাসন সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন