বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ :মহাকাশে বাংলাদেশের পতাকা
মেহেদী হাসান৩০ এপ্রিল, ২০১৮ ইং
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ :মহাকাশে বাংলাদেশের পতাকা

আমাদের গ্রামে একজন সৌদি প্রবাসী ছিলেন। আনুমানিক ইংরেজি ২০০০ সালের দিকে উনি দেশে ফেরার সময় একটি রেডিও নিয়ে আসলেন সঙ্গে করে। দেখতে অন্য সব রেডিওর মতো হলেও তার ছিল অনন্য বৈশিষ্ট্য। এটার মাধ্যমে কথা শুধু একপাশেই শোনা যেত না, অন্যপাশের মানুষও শুনতে পারত সে যত দূরেই থাকুক না কেন। সারা গ্রাম তোলপাড়। বড়ই আশ্চর্য। রেডিও সদৃশ তারবিহীন টেলিফোনটা দেখার জন্য সেই প্রবাসী ভদ্রলোকের বাড়িতে কৌতূহলী মানুষদের বেশ জটলা থাকত।

মাত্র ১৮ বছর আগে বাংলাদেশের একটি সাধারণ গ্রামের চিত্র এটি। আর সেই গ্রামের বর্তমান চিত্র কারোই অজানা থাকার কথা নয়। রেডিও সদৃশ তারবিহীন টেলিফোনটা আজ স্মার্টফোনে পরিণত হয়েছে। এই স্মার্টফোনের সাহায্যে সেই কৌতূহলী মানুষগুলোই আজ থ্রি-জি /ফোর-জি ইন্টারনেট সেবার মাধ্যমে সারা দুনিয়ার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। নীরবে একটা বিপ্লব ঘটে গেছে বাংলাদেশে। এ বিপ্লব তথ্যপ্রযুক্তির। এ বিপ্লব উন্নয়নের। তথ্যপ্রযুক্তির আশীর্বাদ আমাদের সার্বিক জীবনযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেই চলেছে।

আগামী ৭ মে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ মহাকাশে নিয়ে যাচ্ছে স্পেসএক্স-এর রকেট ফ্যলকন-৯; এর সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব স্যাটেলাইটের অধিকারী বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বাংলাদেশ। স্যাটেলাইট হলো কৃত্রিম উপগ্রহ যা একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে নির্দিষ্ট গতিতে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করে। এ স্যাটেলাইট স্থাপনের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে আমূল পরিবর্তন আসবে। যদি এ স্যাটেলাইট নির্দিষ্ট কক্ষপথে সফলভাবে স্থাপিত হয় তাহলে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক হবে।

দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ প্রকল্প এটি। ২০১৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উেক্ষপণ ও সেবা পরিচালনার জন্য প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার এই বৃহত্ প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় একনেক। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন। পূর্বঅভিজ্ঞতা না থাকায় কাজটি কমিশনের জন্য মোটেও সহজসাধ্য ছিল না। তাদের সর্বোচ্চ শ্রম ও মেধা দিয়ে তারা এই প্রকল্পটিকে আলোর মুখ দেখাতে যাচ্ছেন এজন্য তাদেরকে অগ্রিম ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

ভূমি থেকে স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশে দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি করা হয়েছে। তন্মধ্যে গাজীপুর জেলার জয়দেবপুরে মূল স্টেশন এবং রাঙ্গামাটি জেলার বেতবুনিয়ায় ব্যাকআপ স্টেশন স্থাপিত হবে। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’-এর উেক্ষপণ পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BCSCL) প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থল স্টেশন থেকে উপগ্রহকে নিয়ন্ত্রণ করা, বিপণন ও বিক্রয় সেবা ইত্যাদির জন্যে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কোম্পানি প্রাথমিকভাবে উন্নত স্যাটেলাইট সেবা যেমন ডি-টু-এইচ, ভি-স্যাট, ভিডিও-ডিস্ট্রিবিউশন, ব্রডব্যান্ড, কমিউনিকেশন ট্র্যাঙ্ক  ইত্যাদি প্রদানের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করছে। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’-এর মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে। এরও মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। বাকি ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি/ভাড়া দেওয়ার জন্য রাখা হবে। স্যাটেলাইট ভাড়া বাবদ দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলো বছরে প্রায় ১২৫ কোটি টাকা ব্যয় করছে। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ চালু হলে সে অর্থ দেশেই থেকে যাবে। উপরন্তু, স্যাটেলাইট তরঙ্গ ভাড়া দিয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। তথ্য অধিদপ্তরের মতে টেলিকমিউনিকেশন বাবদ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’-এর বদৌলতে এই অর্থও দেশে থেকে যাবে।

‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ চালু হলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিফোন সংযোগ নেওয়া যাবে যা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে আরও সুদৃঢ় করবে। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলগুলোতেও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিবে। এতে করে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ও ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আসবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। এছাড়া শিক্ষাকার্যক্রম, অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক কাজও বেগবান হবে। সবচেয়ে যুগান্তকারী সাফল্য আসবে প্রতিরক্ষা/সামরিক ও যোগাযোগ সেক্টরে। সামরিক বিমান, সমুদ্রে নৌবাহিনীর টহল জাহাজের সঙ্গে যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ স্থাপন আরও সহজতর হবে। স্থল, নৌ বা আকাশপথে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ বহিরাগত ও অপ্রত্যাশিত যেকোনো বস্তু স্বল্পতম সময়ে নিরূপণ ও পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মতো বড় নদী আছে যেখানে প্রায়ই কালবৈশাখী ঝড় হয়। এছাড়া দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো বছরের প্রায় বিভিন্ন সময়ে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়ে। এতে জানমালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়। আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও দুর্যোগ-ব্যবস্থাপনায় ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ একটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে। যাতে করে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব হবে।

এতক্ষণ যা আলোচনা হলো তার সবই ইতিবাচক। আমরাও চাই দেশের প্রথম স্যাটেলাইট আমাদের জন্য ইতিবাচক সাফল্য বয়ে আনুক। তবে নেচিবাচক প্রভাব থেকে বাঁচতে হলে আমাদেরকে কয়েকটি বিষয়ের ওপর লক্ষ রাখতে হবে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে স্যাটেলাইট উেক্ষপণের ক্ষেত্রে সরকারকে আরো সতর্ক থাকতে হবে। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উেক্ষপণের বিষয়টি দক্ষিণ-এশীয় আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। আমাদের প্রতিবেশী অনেক দেশই বিষয়টিকে ভালোভাবে নিবে না। যার ফলাফল আমরা ইতোমধ্যে পেয়েছি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চাপের কারণে, বাংলাদেশের ন্যায্য ৮৬-৮৮ ডিগ্রি পূর্বদ্রাঘিমায় ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ কে স্লট দেয়নি আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন। এরকম বিষয়গুলো সর্বোচ্চ কূটনৈতিক দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে হবে।

উন্নত ও বিশ্বমানের সেবা প্রদান করতে হবে। বিশ্বমানের সেবা প্রদানে ব্যর্থ হলে এই স্যাটেলাইট থেকে সেবা নিতে দেশি-বিদেশি সব প্রতিষ্ঠানই অনীহা প্রকাশ করবে। যার ফলে এই প্রকল্পটি মুখ-থুবড়ে পড়তে পারে।

‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি সেক্টরে একটি আশীর্বাদ। এর ব্যবহার যদি সুষ্ঠুভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না যায় সেক্ষেত্রে এটা দেশের জন্য অভিশাপও হতে পারে। সবার আগে তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে যেন জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ কিংবা পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের মতো অপরাধ সংঘটিত হতে না পারে সে বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে। স্যাটেলাইট পরিচালনার পূর্বে সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে। কোম্পানি পরিচালনার নেতৃত্ব উচ্চশিক্ষিত, সত্ ও যোগ্য ব্যক্তিবর্গকে দিতে হবে। বাংলাদেশের কোনো মানুষই চাইবে না এই কোম্পানির দিকেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠুক।

আমরা সবাই কামনা করি উেক্ষপণের পর ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ সফলভাবে তার অরবিটে স্থাপিত হয়ে তার কার্যক্রম শুরু করুক। বিশ্বে বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বল হোক। বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা বহনকারী স্যাটেলাইট মহাকাশে ঘুরে বেড়াক তার কক্ষপথে। যেন মহাকাশে একখণ্ড বাংলাদেশ।

n লেখক :শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২১ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন