বয়স, নেতৃত্ব ও জোট
চিররঞ্জন সরকার০৬ অক্টোবর, ২০১৮ ইং
বয়স, নেতৃত্ব ও জোট

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছিলেন, ‘‘যে-বয়সে পুরুষ ভালোবাসে নারীকে, সে বয়সে তুমি/ভালোবেসেছিলে তোমার মাতৃভূমি, দক্ষিণ আফ্রিকাকে।/যে-বয়সে পুরুষ প্রার্থনা করে প্রেয়সীর বরমাল্য,/সে-বয়সে তোমার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়েছে ফাঁসির রজ্জুতে।’’ নির্মলেন্দু গুণের কবিতা ধার করে বলা যায়:যে বয়সে মানুষের অবসর নেবার কথা, নাতি-নাতনি কিংবা পোষা কুকুরের সঙ্গে খেলা করবার কথা, অথবা শখের বাগানে শীতের রোদ পোহানোর কথা, সেই বয়সে আমাদের একশ্রেণির নেতানেত্রী জোট বাঁধছেন ক্ষমতায় যাবার মোহে! যখন তারা সচল এবং সক্রিয় ছিলেন, তখন তারা জাতিকে ‘বিবেক-ভর্তা’ ছাড়া তেমন কিছুই উপহার দিতে পারেননি। এখন যাদের চলতে-ফিরতে লাঠির সাহায্য নিতে হয়, তারা দিতে এসেছেন, ‘গণতন্ত্রকে মুক্ত করার স্বপ্ন এবং ‘মুক্তির দিশা’। আমাদের কপাল মন্দ, তাই এমন দৃশ্য দেখতে হচ্ছে।

হ্যাঁ, সব কিছুরই একটা সময় বা বয়স আছে। আমাদের দেশে বিয়ে, ভোটার হওয়া, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ, চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই একটা নির্দিষ্ট বয়স সংক্রান্ত নীতিমালা মেনে চলতে হয়। শুধু রাজনীতি ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে এই নীতিমালা নেই। কে কখন, কোন বয়সে মারা যাবেন, তা যেমন বলা যায় না, ঠিক তেমনি রাজনীতিবিদগণও কখন অবসর গ্রহণ করবেন—তা হলফ করে বলা যায় না। অনেকেই আছেন যারা দয়াময় মৃত্যু এসে তুলে না নিলে চলতেই থাকেন, বলতেই থাকেন, পদ আঁকড়ে পড়েই থাকেন। বয়স এ ক্ষেত্রে কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না। 

এদিকে কাগজে-কলমে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়ে হয়েছে ৭১ বছর ছয় মাস। সেই হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আমাদের দেশের বেশ কয়েকজন ডাকসাইটে নেতানেত্রী বলা চলে ‘বোনাস-বয়সে’ আছেন। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বয়স ৮৮, তার স্ত্রী সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের বয়স ৭৫। বিকল্প ধারার চেয়ারম্যান বি. চৌধুরীর বয়স ৮৬। গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বয়স ৮১। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের একাংশের নেতা আসম আব্দুর রবের বয়স ৭৩। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বয়স ৭৩। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বয়স ৭১। দেখা যাচ্ছে, উল্লিখিত নেতা-নেত্রীদের তুলনায় বয়সে আমাদের প্রধানমন্ত্রীই ‘তরুণী’!

অথচ প্রাচীন আর্য বা হিন্দু সমাজ কর্তৃক প্রবর্তিত বর্ণাশ্রম ধর্মে মানুষের জীবনকাল চারটি আশ্রমে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস। হিন্দু শাস্ত্র মতে, হিন্দুকে প্রথমে ব্রহ্মচর্যাশ্রমে ছাত্ররূপে জীবন আরম্ভ করতে হয়, তারপর বিয়ে করে গৃহী হতে হয়; বৃদ্ধাবস্থায় গৃহাশ্রম হতে অবসর নিয়ে বানপ্রস্থ অবলম্বন এবং সবশেষে সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হতে হয়।

হিন্দু শাস্ত্র মতে, মানব-সাধারণের ধর্ম ব্যতীত প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনে বিশেষ বিশেষ কর্তব্য আছে। হিন্দুকে প্রথমে ব্রহ্মচর্যাশ্রমে ছাত্ররূপে জীবন আরম্ভ করতে হয়, তারপর বিবাহ করে গৃহী হতে হয়; বৃদ্ধাবস্থায় হিন্দু গৃহস্থাশ্রম হতে অবসর গ্রহণ করে বানপ্রস্থ অবলম্বন করে এবং সর্বশেষে সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়। বিভিন্ন আশ্রম অনুসারে জীবনের প্রত্যেক স্তরে বিভিন্ন কর্তব্য নির্দিষ্ট আছে। এই আশ্রমগুলোর মধ্যে কোনোটিই অপরটি থেকে বড় নয়। যিনি বিবাহ না করে ধর্ম কার্যের জন্য জীবন উত্সর্গ করেছেন, তার জীবন যত মহত্, বিবাহিত ব্যক্তির জীবনও ততটাই মহত্।

বর্তমান বিশ্বে বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস ধর্মের কার্যকারিতা লোপ পেয়েছে। বিদ্যাশিক্ষার পরে মানুষ গৃহী হয় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না মানুষ পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে যায় ততক্ষণ পর্যন্ত জীবন সংগ্রাম চলতে থাকে। আধুনিক জীবনে জঙ্গলে গিয়ে বানপ্রস্থ পালন এবং তত্পরবর্তী সন্ন্যাস গ্রহণের কোনো অবকাশ নেই। আজকের দিনের দীর্ঘজীবী মানুষ জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবনকে অমরত্ব দান করে। বানপ্রস্থ শব্দটি জন্ম হয়েছে বনে প্রস্থানের ধারণা থেকে। কিন্তু নদীর মতোই, শব্দও উেস যা ছিল, চলতে চলতে তা বদলে যায়। তবে বানপ্রস্থের জন্য সত্যি-সত্যিই বনে যাওয়ার প্রয়োজন সে কালেও হতো না, এ কালে তো তার উপায়ও নাই। উন্নয়নের কুঠারে অধিকাংশ জঙ্গলই সাফ হয়ে গেছে। বাকি যা আছে তাও শিগগিরই যাবে বলেই মনে হয়। প্রকৃত বানপ্রস্থ বনে নয়, মনে। একটি সময়ের পরে কর্মক্ষেত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার মানসিকতাই তার চালিকা শক্তি, তার ধর্ম। আধুনিক পৃথিবীতে কর্মজীবনে অবসর গ্রহণের ধারণাটি এর সঙ্গে তুলনীয়। একটি বয়স অবধি কাজ করার পর মানুষ অবসর নিয়ে থাকে, তার পরে অবসর জীবন। অবসর মানেই যে নিষ্ক্রিয়তা বা আলস্য, তা নয়, বস্তুত এ কালে যখন স্বাভাবিক জীবনসীমা বিস্তর বেড়েছে, কর্মক্ষমতাও, তখন অবসর জীবনকে সক্রিয় এবং ফলপ্রসূ করবার সুযোগ অনেক বেশি। কিন্তু অবসরের প্রয়োজন ফুরায় নাই। প্রত্যেকটি কর্মক্ষেত্রেই নতুনকে স্থান ছেড়ে দিয়ে পুরনো বিদায় নেবে, এটাই সঙ্গত, এতেই সেই ক্ষেত্রটিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হতে পারে।

এ বিষয়ে অন্য বিভিন্ন কর্মপরিসরের সঙ্গে রাজনীতির একটি বড় তফাত্ ঘটে গেছে, বিশেষত বাংলাদেশে। এ দেশে রাজনীতিকদের স্বাভাবিক অবসর নাই। বয়স হয়েছে, অতএব সরে দাঁড়াচ্ছি এমন কথা ও সেই অনুসারে কাজের নমুনা এ দেশে সম্পূর্ণ বিরল না হতে পারে, কিন্তু অতিমাত্রায় দুর্লভ। এ বিষয়ে বহু দল ও বহু মতে বিভাজিত বাংলাদেশে কোনো ব্যতিক্রম নেই, দলমত নির্বিশেষে মন্ত্র একটিই: যত দিন বাঁচি তত দিন রাজনীতি করি। এটি কেবল প্রবীণ রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত ক্ষমতাভিলাষের দুর্মরতা নয়, বাংলাদেশি রাজনীতি একে মেনেও নিয়েছে। রাজনীতি সমাজ থেকেই উত্পত্তি। আমাদের সমাজে বয়স্কতন্ত্র মজ্জাগত, বয়সজনিত প্রবীণতাকে এই সমাজ প্রজ্ঞার সমার্থক বলে মনে করে, তার রাজনীতির পরিসরেও অতএব সত্তর আশি নব্বইয়েরা দলে দলে নট-আউট।

আমাদের দেশে রাজনীতিতে নিয়ম থাকা উচিত। সক্ষমতা তো আর অনন্তকাল স্থায়ী হয় না। তাই বলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পদ আঁকড়ে থাকাটা মোটেও যৌক্তিক নয়। এর অর্থ তাঁদের গুরুত্ব বা অবদানকে ছোট করে দেখা নয়। তাঁরা দলের বলিষ্ঠ নেতা। তাঁদের অভিজ্ঞতা বিপুল। তরুণতর প্রজন্মের নায়কদের অবশ্যই তাঁদের কাছে অনেক কিছু জানবার আছে, বুঝবার আছে। কিন্তু সে জন্য তাঁদের সক্রিয় রাজনীতিতে থাকবার কিছুমাত্র প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। আমরা দেখি রাজনীতিতে একবারে যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। তাঁদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা কেবল প্রকট নয়, দৃষ্টিকটু। ক্ষমতার ভাগ পাবার দুর্মর বাসনা এমনভাবে বিজ্ঞাপিত হলে বয়সের গৌরব বাড়ে না। একথা আমাদের নেতানেত্রীদের  কে বোঝাবে?

পুনশ্চ:বয়স হলে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের স্মৃতিশক্তি কমে। নানা ধরনের ভুলভ্রান্তি বাড়ে। এ ব্যাপারে ময়মনসিংহের এক বৃদ্ধার কাহিনি উল্লেখ করা যেতে পারে। তো এক বৃদ্ধা ময়মনসিংহের বাসে উঠেছেন! বাসে উঠেই সে হেল্পারকে বলল, ‘ভালুকা আইলে আমারে কইয়েন যে!’

হেল্পার তাকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে।’

বাস চলতে শুরু করল! বৃদ্ধা দুই মিনিট পরেই হেল্পারকে বলল, ‘ভালুকা আইছে?’

হেল্পার উত্তরে ‘না’ বলল! কিন্তু বৃদ্ধা দুই মিনিট পর পর হেল্পারকে এই প্রশ্ন করতে লাগল! হেল্পার ও বাসের যাত্রীরা বিরক্ত হয়ে বৃদ্ধাকে ধমক দিলো! বৃদ্ধা তখন ভয়ে চুপ।

এদিকে বাস চলতে চলতে ভালুকা ছাড়িয়ে সামনের স্টপেজের মাঝামাঝি চলে এলো। তখন হেল্পারের মনে পড়ল যে বুড়িমা তো ভালুকার কথা বলে রেখেছিল! বাসের সব যাত্রী তখন হেল্পারকে বকাঝকা করে বাস ঘোরাতে বলল। তো বাস আবার ঘুরিয়ে ভালুকায় এলো। হেল্পার বৃদ্ধাকে বলল, ‘বুড়িমা, ভালুকা আসছে! আপনে নামেন!’

বৃদ্ধা চোখ কুঁচকে জবাব দিলো, ‘নামমু ক্যা? নাতি আমারে ডাহাত্তন (ঢাকা থেকে) একটা টেবলেট খাওয়াইয়া কইছে ভালুকায় গিয়া আরেকটা খাইতে! আমি এখন টেবলেট খাইবাম! পানি দেন!’

n লেখক:রম্য রচয়িতা

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৬ অক্টোবর, ২০২১ ইং
ফজর৪:৩৬
যোহর১১:৪৭
আসর৪:০৩
মাগরিব৫:৪৫
এশা৬:৫৬
সূর্যোদয় - ৫:৫১সূর্যাস্ত - ০৫:৪০
পড়ুন