জলবায়ু পরিবর্তন কৃষিউন্নয়নের জন্য চ্যালেঞ্জ
ড. মো. হুমায়ুন কবীর০৬ অক্টোবর, ২০১৮ ইং
জলবায়ু পরিবর্তন কৃষিউন্নয়নের জন্য চ্যালেঞ্জ
কোনোস্থানের স্বল্প সময়ের বায়ুমণ্ডলের গতিপ্রকৃতির পর্যায়ক্রমিক ধারাক্রমকে দৈনন্দিন আবহাওয়া হিসাবে বিবেচনা করা হয়। আর দীর্ঘ সময়ের অর্থাত্ কোনো স্থানের কয়েক বছরের আবহাওয়ার গড় ফলাফলকে জলবায়ু বলা হয়ে থাকে। এ পুরো বিষয়টির উপরেই পরিবেশ-প্রতিবেশ ইত্যাদি নির্ভর করে। পরিবেশ আবার সার্বজনীন একটি বিষয়। জলবায়ু প্রতিনিয়তই পরিবর্তনশীল। কিন্তু কালে কালে এ পরিবর্তনটা নির্দিষ্ট একটা মাত্রা পর্যন্ত হয়েছে বিধায় তখন তা পরিবেশের জন্য এতটা ক্ষতি বয়ে আনে নাই। এ পরিবর্তনটা যখন ব্যাপকভাবে হতে লাগল তখনই এর কুফল মানুষের জন্য দুর্যোগ বয়ে আনছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখন শুধু বাংলাদেশের একক কোনো সমস্যা নয়। এ বিষয়টি আসলে কী, সে সম্পর্কে একটু আলোকপাত করলে পরিষ্কার হওয়া যাবে। মোদ্দাকথায় বলতে গেলে বর্তমানে প্রতিযোগিতা-মূলক বিশ্বব্যবস্থায় আধুনিক বিশ্বগড়ার জন্য দ্রুত শিল্পায়ন হচ্ছে। সেই শিল্পায়নের জন্য স্থাপনকৃত কলকারখানা হতে প্রতিনিয়ত  কার্বন নির্গত করছে। নিঃসরিত এ কার্বন বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি করছে। আমরা জানি সবুজ গাছ তার শ্বাস-প্রশ্বাসে যথাক্রমে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ ও অক্সিজেন ত্যাগ করে, আবার প্রাণির ক্ষেত্রে পুরো উল্টো। এগুলো ভারসাম্যের জন্য অবশ্যই সবুজ বনানী বেশি করে সৃজন করা প্রয়োজন। নগরায়নের ফলে ইটভাটা ও শিল্পাঞ্চল, কল-কারখানা, গাড়ি ও যানবাহন হতে নির্গত কালো ধোঁয়া বাতাসে ক্ষতিকর গ্রিন হাউজ গ্যাস মিথেন, ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন (সিএফসি), সীসা এবং আরো অন্যান্য হেভি মেটাল উত্পন্ন হয়ে বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ওজোন স্তর ভেঙে দিয়ে তাকে ফুটো করে দিচ্ছে। সে ফুটো দিয়ে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিসমূহ পৃথিবীতে চলে আসে। ফলশ্রুতিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে পৃথিবীকে মনুষ্য বাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে দিনদিন। পৃথিবী-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে  এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব কৃষিকেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মেরু অঞ্চলের জমাকৃত বরফ গলে গিয়ে সাগরের পানির উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্র তীরবর্তী দ্বীপ ও উপকূলের নিম্নাঞ্চল আস্তে আস্তে সমুদ্রবক্ষে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, সেইসঙ্গে কমে যাচ্ছে কৃষি জমি। ইতোমধ্যে তার অনেকগুলো আলামত দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বর্ষাকালে বর্ষা হচ্ছে না, শীতকালে শীত পড়ছে না, গরমকালে অতিগরম-তাপদাহ, শীতকালে-শৈত্যপ্রবাহ, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, খরা-বন্যা, অনিয়মতান্ত্রিক ঝড়-ঝঞ্ঝা, সুনামি, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প, দাবানল, তুষারপাত, কুয়াশা, বালুঝড়, আগ্নেয়গিরির অগ্নুত্পাত ইত্যাদি এখন আর কোনো নিয়ম মেনে হচ্ছে না।

কৃষিক্ষেত্রে এ প্রভাবের দরুন বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ইত্যাদি সহিষ্ণু নতুন নতুন উচ্চ ফসলী জাত উদ্ভাবনের জন্য কৃষি গবেষণা অব্যাহত রাখার বিষয়ে সরকারের নজর সম্প্রসারিত করতে হবে। তাছাড়া বন্যা ও লবণাক্ততাকে প্রতিরোধ করার জন্য আরো বেশি এবং উঁচু করে প্রতিরোধ বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। যেমনিভাবে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে উত্তরবঙ্গে মঙ্গাকে জয় করা সম্ভব হয়েছে। সবুজ বনানী তো ধ্বংস করা যাবেই না উপরন্তু সারাদেশে ্ব্যাপক গাছ লাগাতে হবে এবং উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনি গড়ে তুলতে হবে। কলকারখানার জন্য বর্জ্য শোধনাগার তৈরি করতে হবে। কমপক্ষে দু’কোটি মানুষকে বৈধপথে অভিবাসনের জন্য উত্সাহিত করতে হবে যাতে দেশে জনসংখ্যার চাপ ও ঘনত্ব কিছুটা কমে। তাছাড়াও (3R) অর্থাত্ Reduce, Reuse & Recycle এ তিনটি মূলমন্ত্র অনুসরণ করেও পরিবেশ দূষণের হাত থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়া যাবে। সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশসমূহকে গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ কমানোর জন্য আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। আর যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশে অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণসহ প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করলেই সাময়িক ক্ষতি কমিয়ে বৃহত্তর কল্যাণে দীর্ঘসময়ের সুফল হিসাবে সফল পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষা করা সহজ হবে বলেই অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। আমাদের সকলের প্রত্যাশাও তাই।

n লেখক: কৃষিবিদ ও  ডেপুটি রেজিস্ট্রার,

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৬ অক্টোবর, ২০২১ ইং
ফজর৪:৩৬
যোহর১১:৪৭
আসর৪:০৩
মাগরিব৫:৪৫
এশা৬:৫৬
সূর্যোদয় - ৫:৫১সূর্যাস্ত - ০৫:৪০
পড়ুন