কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে কারণে ভয়ংকর
ড. মো. নাছিম আখতার১২ নভেম্বর, ২০১৮ ইং
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে কারণে ভয়ংকর

মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার ‘কাছের দেশ’ লেখাটিতে ৩০ বছর আগের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। কার্নেগি মিলান ইউনিভার্সিটিতে কোনো এক কনফারেন্সে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ হার্ভাড সাইমনের সঙ্গে তার সাক্ষাত্ হয়েছিল। তখন মাত্র ইন্টারনেট ইমেল-এর প্রচলন শুরু হয়েছে। নতুন টেকনোলজি নিয়ে সবাই উদ্দীপ্ত। এখন ‘আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ কথাটির সঙ্গে সবাই কমবেশি পরিচিত। সেসময় জাফর ইকবালের সঙ্গে কথোপকথনের একপর্যায়ে এই শব্দটি হার্ভাড সাইমন ব্যবহার করেন। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ বিষয়টি নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলেন। একেবারে ঘোষণা দিয়ে তিনি নিজেকে এসব থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। তার ভাষায়, ‘যখন আমার প্রয়োজন হয় তখন আমি কারো সাথে যোগাযোগ করব, সবাই ঢালাওভাবে না চাইতেই দুনিয়ার খবর দিয়ে আমাকে ভারাক্রান্ত করে ফেলবে আমি তাতে রাজি নই।’ এই প্রসঙ্গে জাফর স্যার লিখেছেন, ‘আমার তখন বয়স কম ছিল। আমি গলার রগ ফুলিয়ে তার সঙ্গে তর্ক করেছিলাম, সময়মতো খবর পাওয়া যে কত জরুরি, সেটি বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। তিনি আমার কথাকে কোনো গুরুত্ব দেননি! এতদিন পর আমি আবিষ্কার করেছি, আসলে যে বিষয়টি বুঝতে আমার ৩০ বছর লেগেছে, তিনি সেটি অনেক আগেই বুঝে গিয়েছিলেন।’

ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিন্স তার এক বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ মানবজাতিকে ধ্বংস করতে পারে। কারণ, পূর্ণাঙ্গ বিকশিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার নিজের দায়িত্ব নিজেই নিয়ে ক্রমবিকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে অনেক দ্রুত। কিন্তু মানুষ ধীরগতির জৈবিক বিবর্তনে সীমাবদ্ধ। তারা পূর্ণাঙ্গ বিকশিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকতে পারবে না।’

কিছুদিন আগে একজন নিবেদিতপ্রাণ গবেষকের অফিসকক্ষে গিয়েছিলাম। তার রুমে সবসময় মাস্টার্স এবং পিএইচডির স্টুডেন্ট থাকে। একজন মাস্টার্স স্টুডেন্ট আমাকে হেসে বলল, ‘স্যার আপনার একটা গবেষণা নিবন্ধ বানিয়ে দেই।’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘আপনি তো ভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিন-এর ছাত্র, আপনি আমার বিষয়ে নিবন্ধ বানাবেন কি করে?’ সে বলল, ‘স্যার একটু বসে আমার জাদুকরী ক্ষমতা দেখেন। ছাত্রটি আমার বিষয় কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্টে আমার নাম দিয়ে SCIgen নামক একটি ফ্রি সফটওয়্যারে বাটন প্রেস করতেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমার নামে একটি পেপার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হলো—রেফারেন্স, কম্পোজিশনসহ একটি বিশ্বমানের গবেষণাপত্র, যা প্লাজারিজম টেস্টেও অসাধারণ মৌলিকত্বের পরিচয় দেয় অর্থাত্ অন্য কোনো গবেষণাপত্রের সাথে মিল নেই বললেই চলে। এমন উচ্চমানের একটি গবেষণাপত্র নিঃসন্দেহে যেকোনো বিখ্যাত জার্নালে প্রকাশিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে এবং হয়েছিলও ঠিক তাই।

দি গার্ডিয়ান পত্রিকার How computer generated fake papers are flooding academeia and being accepted at conferences শিরোনামের লেখাটি পড়ে আমি হতবাক হয়েছি। এক ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে অনেকেই বিশ্বের নামকরা জার্নালগুলিতে তাদের নকল গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। একশ’রও বেশি SCIgen সৃষ্ট নকল গবেষণাপত্র যুক্তরাষ্ট্রের ইন্সটিটিউট অব ইলেট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারস (IEEE) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও ১৬টি এ ধরনের নকল গবেষণাপত্র বিখ্যাত গবেষণা জার্নাল Spinger-এ প্রকাশিত হয়েছে। জালিয়াতির এই বিষয়টি সর্বপ্রথম উদঘাটন করেন ফ্রান্সের গবেষক কিরিল ল্যাবে। গবেষক কিরিল ল্যাবের এই ধরনের পেপারগুলোকে সনাক্ত করার জন্য একটি সফটওয়্যার লিখেন যা অতিসহজেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পেপারগুলোকে সনাক্ত করতে পারে। অঙ্ক বিষয়েও ম্যাথ-জেন নামে এরূপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফ্টওয়্যার ইন্টারনেটে রয়েছে। আমাদের দেশে যে কনফারেন্স ও জার্নালগুলো প্রকাশিত হচ্ছে সেগুলোতে নকল নিবন্ধ সনাক্তকরণের জন্য কিরিল ল্যাবের SCIdetect সফটওয়্যার ব্যবহার করা উচিত অথবা SCIgen, MATHgen-এর মতো সফটওয়্যারগুলোর অ্যালগরিদম বিশ্লেষণ করে এমন একটি সফটওয়্যার তৈরি করা—যা নকল গবেষণাপত্র সনাক্তকরণে পারদর্শী হবে।

SCIgen নামক সফটওয়্যারটির উত্পত্তিগত ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রের MITটির তিনজন গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট মাত্র কয়েকদিনের চেষ্টায় প্রোগামটি লেখেন। তত্কালীন সময়ে SCIgen লিখিত পেপারে তারা তাদের নাম দেয় এবং একটি কনফারেন্সে প্রেরণ করে এবং তা অত্যন্ত দ্রুত গৃহীত হয়। ঘটনাটি ছিল ২০০৫ সালের ঘটনা। কিন্তু এর পরে অসাধু গবেষকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সফটওয়্যারটি ব্যবহার করে গবেষণা ক্ষেত্রে একধরনের বিড়ম্বনার সৃষ্টি করেছে, যা প্রতিহতের প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন ফ্রান্সের গবেষক কিরিল ল্যাবে।

গবেষণা ক্ষেত্রে এই ধরনের অসাধুতা নিরসনের লক্ষ্যে বিশ্বের সমস্ত রিসার্চ সংগঠনগুলোকে একসঙ্গে সতর্ক হতে হবে। এই ধরনের সফটওয়্যার আপলোডের জন্য গুরুশাস্তি বিধান করতে হবে। অন্যথায় গবেষণা জগতে ভালো ও মন্দের কোনো পার্থক্য থাকবে না। সবকিছুই তার মৌলিকত্ব হারাবে। পৃথিবী হারাবে সভ্যতাকে এগিয়ে নেওয়ার হাতিয়ার— গবেষণা। পৃথিবীর অনাগত ভবিষ্যতের উন্নয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল ইতিবাচক কর্মযজ্ঞের হাতিয়ার হয়ে উঠুক।

n লেখক :অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ,

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন