নজরুল সংগীতের দিকপাল সুধীন দাশ
০৩ মে, ২০১৭ ইং
নজরুল সংগীতের দিকপাল সুধীন দাশ
ব্রিটিশ-পাকিস্তান-বাংলাদেশ আমল—এই তিন শাসনামলের সংগীতিতিহাস যিনি প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি হলেন বরেণ্য সংগীতজ্ঞ বাংলা গানের অনন্য ব্যক্তিত্ব, নজরুল সংগীতের দিকপাল সুধীন দাশ। ৩০ এপ্রিল তাঁর ৮৭ বছর পূর্ণ হলো। সংগীতের জন্য উদার, প্রাণময়, সৃজনশীল এই মানুষটিকে নিয়েই আমাদের এবারের পথিকৃত্

শাহীনুর রেজা

১৯৩০ সালের ৩০ এপ্রিল কুমিল্লা শহরের তালপুকুর পাড়ের বাগিচা গাঁওয়ে সুধীন দাশ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা নিশিকান্ত দাশ ছিলেন ব্যবসায়ী। মা হেমপ্রভা দাশ গৃহিণী। তাঁদের পৈতৃক ভিটা ছিল বিক্রমপুরের রায়েরবাগ গ্রামে। বাবাকে ব্যবসার কাজে বেশির ভাগ সময় কুমিল্লাতেই থাকতে হতো। সে-সূত্রেই একসময় তাঁরা কুমিল্লা শহরের তালপুকুরে স্থায়ীভাবে চলে আসেন। সুধীন দাশের জন্ম এখানেই। সাত ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি হলেন সবার ছোট। ভাইয়েরা হলেন—সুরেন্দ্র নারায়ণ দাশ, ধীরেন্দ্র নারায়ণ দাশ (অকাল প্রয়াত), যতীন্দ্র নারায়ণ দাশ, সৈরেন্দ্র নারায়ণ দাশ, নরেন্দ্র নারায়ণ দাশ, রবীন্দ্র নারায়ণ দাশ। বোনেরা হলেন—তিলোত্তমা দাশ, অনিতা দে ও কনিকা  দাশ। ভাইয়েদের নামগুলো হাল আমলে ছোট হয়ে সুরেন দাশ, বীরেন দাশ, যতীন দাশ, সৈরেন দাশ, নরেন দাশ, রবীন দাশ-এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে সুধীন্দ্র নারায়ণ দাশ সুধীন দাশ হয়ে ওঠেন।

ছোট বলে ভাই-বোনদের আদর-স্নেহ একটু বেশিই পেতেন, সবার নয়নমণি। খুব চঞ্চল ছিলেন ছোটবেলায়। সারাদিন ছোটাছুটি আর খেলাধুলা। পড়াশোনা যতটা হতো তারচেয়ে বেশি হতো গান-বাজনা। বাউণ্ডুলে একটা ভাব ওই বয়সেই ছিল।

শিক্ষাজীবন

স্মৃতিতে থাকা শিক্ষাজীবনের খেরোখাতাটা এভাবে মেলে ধরলেন—‘পড়াশোনার প্রথমে হাতেখড়ি হয়েছিল রামচন্দ্র পাঠশালায়। এরপর তৃতীয় শ্রেণিতে উঠে চলে যাই ঈশ্বর পাঠশালায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে সেই পাঠশালা বন্ধ হয়ে গেলে কুমিল্লা জেলাস্কুলে ভর্তি হই। আমাদের প্রধান শিক্ষক ইন্দুভূষণ বড়ুয়া ছিলেন সংগীত অনুরাগী। আমি ভালো গান গাইতাম বলে অত্যন্ত স্নেহের চোখে দেখতেন। সেখান থেকে মেট্রিক পাস করে ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ি। কলেজ পেরুলে বিএ পরীক্ষায় ডাক।’ কিন্তু পড়াশোনার চেয়ে অন্যদিকে মন দিয়েছেন তিনি। এ সময় দাবা খেলাটা নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল। পরীক্ষাটা আর দেওয়া হলো না। পড়াশোনার এখানেই ইতি টানতে হলো।

সংগীত শিক্ষা

প্রসঙ্গটা তুলতেই দেয়ালে টানানো বড় ভাই প্রয়াত সুরেন দাশের ছবিটা দেখিয়ে বলেন, ‘আমার সংগীতের প্রতি ভালোবাসার বীজটা ওই বড় ভাই বপন করেছিলেন। তিনিই আমার গানের গুরু। আর কারো কাছে আমি কিছু শিখিনি। প্রথম প্রথম গান শেখাতে চাইতেন না তিনি। মা বললেন—ছেলেটা যখন গান শিখতে চাইছে, তুই বারণ করছিস কেন? দাদা উওর করলেন, আগে লেখাপড়াটা করতে দাও, তারপর দেখা যাবে।’

বড় ভাই সুরেন দাশ কলকাতা থেকে সংগীতাচার্য উপাধি পেয়েছিলেন, সেখানেই চাকরি করতেন। তিনি ছিলেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের দিকপাল গিরিজা শংকর চক্রবর্তীর শিষ্য। একবার টাইফয়েড জ্বর হলো, ফিরে এসে আর যাননি। সুরেন দাশ বাড়িতেই গান শেখাতেন। তাঁর অনেক ছাত্র-ছাত্রী ছিল। উচ্চাঙ্গ আর রবীন্দ্রসংগীত শেখাতেন তিনি। আর রাগপ্রধান বাংলা গান তো ছিলই। ‘দাদা ছেলেমেয়েদের গান শেখাতেন, আমি ঘরের পেছনে দাঁড়িয়ে শুনতাম। সব শুনে ফাঁক পেলেই মাঠে গিয়ে গলা সাধতাম। একদিন ছাত্ররা গান তুলতে পারছে না, দাদা রেগে গেলেন—এত চেষ্টা করেও তোমাদের শেখাতে পারছি না, অথচ ঘরের পেছনে যারা ঘুরঘুর করছে, তারা তো ঠিকই শিখে চলে যাচ্ছে। ব্যস, আর কী চাই, সেই কথাগুলোই আমার সংগীতজীবনের বড় প্রেরণা। এরপর দীর্ঘদিন দাদার কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতে তালিম নিয়েছি। তাঁর ভালোবাসা আর শিক্ষাই আমার পাথেয় হয়ে আছে।’ ভাইয়ের পাশাপাশি তিনি নতুন নতুন অসংখ্য গান শিখেছেন গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে। তাঁদের বাড়িতে ছিল বিভিন্ন শিল্পীর নানা ধরনের গানের রেকর্ড। সেগুলো বাজিয়ে সুধীন দাশ নিবিষ্ট মনে শুনতেন। পঞ্চকবির গান ছাড়াও সেই সময়ের সব খ্যাতনামা সংগীত শিল্পীদের গান তিনি শুনতেন এবং তা শিখে নিজের জ্ঞানের ভাণ্ডার পূর্ণ করেছেন। তবে বেশি পছন্দের  ছিল রবীন্দ্রনাথের গান।

নেশা যখন ভিন্ন

ছেলেবেলার দুরন্তপনার অধিকাংশ সময় জুড়ে থাকত খেলাধুলা। কিন্তু এরমধ্যে ঢুকে পড়ে নিবিষ্ট চিত্তের খেলা দাবা। সুধীন দাশকে নেশায় পেয়ে বসে এ দাবা খেলা। পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটার  জন্য এই দাবা খেলা একটা বিশেষ কারণ। সাথে ছিল মাছ ধরার প্রচণ্ড নেশা। স্কুলজীবন থেকেই তাঁর এ নেশা ছিল। স্বাধীনতার পূর্বের সময় থেকে শৌখিন মত্স্যশিকারি সমিতির সদস্য ছিলেন। অসংখ্য প্রতিযোগিতায় তিনি অংশ নিয়েছেন, বড় বড় মাছ ধরার জন্য পুরস্কার পেয়েছেন। কুমিল্লা থেকে এ নেশা ধানমন্ডি লেক পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সারাদিন গান-বাজনা আর রাত হলে চলে যেতেন লেকের পাড়ে। ঘোর নেশা বলতে যা বুঝায়। হাতে ছিপ, পাশে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন। মাছেরা হতাশ করত না। সে-সময় তিনি ৩৬/৩৭ কেজি ওজনের মাছ পর্যন্ত ধরে বাড়িতে এনেছেন। সুধীন দাশের এমন কোনো বন্ধু-বান্ধব নেই যাঁরা তাঁর বড়শিতে ধরা মাছ খাননি।

বেতারের দিন

১৯৪৭ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ার সময় রেডিওতে অডিশন দেন সুধীন দাশ। সে-সময় নিয়মানুযায়ী বোর্ডে একজন অংশগ্রহণকারীকে তিনটি গান গাইতে হতো। কিন্তু সুধীন দাশের গান এত ভালো হয়েছিল যে, তালিকাভুক্তি বোর্ডের সদস্যরা মুগ্ধ হয়ে তার কাছে ১৬টি গান শোনেন। রেডিওতে তিনি রাগপ্রধান গান বেশি গাইতেন। সাথে পঞ্চকবির গান। এরমধ্যে রবীন্দ্রসংগীত ছিল অন্যতম। শোনা যাক তাঁর মুখেই, ‘রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা অফিস ছিল চানখারপুলে। দোতলা দালানে তিনটি স্টুডিও। একটা একটু বড়, সেখানে নাটক হতো। অন্যটিতে সংবাদ, আরেকটিতে গান আর আলোচনা। মহড়া করতাম দোতলার বাইরের বারান্দায়। কোনো রেকর্ডিং এর ব্যবস্থা ছিল না। সরাসরি গাইতে হতো। মাসে চার বার কুমিল্লা থেকে ঢাকায় আসতাম। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ১০টি গান গাইতে হতো। প্রতিদিনের জন্য পাওয়া যেত ১০ টাকা, মাসে ৪০ টাকা। যাতায়াত খরচ বাদে পকেটে থাকত ২০ টাকা। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের নামে শিল্পীর অনুকূলে চেক হতো।’ এ সময় গান সুর করার একটা সুযোগও তিনি পান। যেহেতু সুরকারের অভাব ছিল, তাই অন্য শিল্পীরা নতুন নতুন গানের জন্য তাঁর ওপর নির্ভর করতেন। একটা গান সুর করলে পাওয়া যেত ৫ টাকা। আয়-রোজগার দিন দিন বাড়তে থাকে। ১৯৬৫ সাল থেকেই তিনি টেলিভিশনের সঙ্গে জড়িত হন।

সংসার জীবন

বড় ভাই সুরেন দাশের কাছে অনেক নামী-দামী সংগীত ব্যক্তিত্ব যেমন আসতেন তেমনি অনেক ছাত্র-ছাত্রীকে তিনি গান শেখাতেন। এদের সবার সাথে সুধীন দাশের জানাশোনা ছিল। তাদের একজন ছিলেন নীলিমা দাস। সুধীন দাশ তাঁর সাথে ১৯৫৫ সালে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। সুধীন দাশ-নীলিমা দাশ দম্পতির ঘরে নিলয় দাশ ও সুপর্ণা দাশ দুই সন্তান। নীলিমা দাশ নিজে গান করেন, গান শেখান। বিভিন্ন সংগীত একাডেমির সঙ্গে জড়িত। এখন খানিকটা অসুস্থ। সন্তানদের কথা জিজ্ঞেস করায় সুধীন দাশ চুপ করে গেলেন। বয়সের ভারে এমনিতে অসুস্থ। হাঁটা-চলা করতে অসুবিধা হয়। চোখে ঝাপসা দেখেন। এবার চশমা খুলে চোখ মুছে নিলেন। বাইরের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মেয়েকে তো দেখলা, ছেলে ৪৫ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাকে ১১ জানুয়ারি ২০০৬ সালে মারা গেছে। আমার কাছে গান শিখেছে। গান লিখত, সুর করত। একটা অ্যালবাম বেরিয়েছিল, ভালো গিটার বাজাত, শেখাত, ওর অনেক ছাত্র-ছাত্রী এখন ভালো করছে। মেয়ে তিন তলায় থাকে, আমাদের দেখাশোনা করে। গান শেখে আমার কাছে। রবীন্দ্র সংগীত ভালো গায়। ওর দুই ছেলে-মেয়ে। একজন হলো দীপা, আর একজন ঐশী।’ নীলিমা দাশ তাঁর স্বামী সম্পর্কে বলেন, ওঁর মতো স্বামী পেয়ে অহংকার বোধ করি। আমার  জীবনের সাফল্যের পেছনে প্রথম জীবনে বাবা, পরে ভাসুর সুরেন্দ্র নারায়ণ দাশ ও স্বামী সুধীন দাশ ছিলেন অগ্রগণ্য। বাবা সম্পর্কে সুপর্ণা দাশ বলেন, আমি গর্ববোধ করি যে, আমার বাবা-মা সুধীন দাশ-নীলিমা দাশ। বাবার মতো সংগীতে নিবেদিত আর নজরুল প্রেমিক বাংলাদেশে কেউ আছে কি-না সন্দেহ। আমার বাবাই আমার শিক্ষাগুরু, আমার আদর্শ। আমার সন্তানরাও সেই আদর্শে মানুষ হোক এই আমার চাওয়া।

নজরুল সংগীত প্রসঙ্গ

আমরা যে সময়ের গল্প সুধীন দাশের কাছে শুনছি তার অল্প কিছুদিন আগে নজরুল বাকরুদ্ধ (৯ জুলাই ১৯৪২) হয়েছেন। কলকাতা বেতার এবং ঢাকা বেতারে নজরুলের গান তখন নিয়মিত প্রচার হচ্ছে—কিন্তু নজরুল সংগীত, নজরুল গীতি বা নজরুলের গান কোনো শিরোনামে নয়, আধুনিক গান হিসাবে। রেডিও-তে বলা হতো, আধুনিক গান শুনবেন। শিল্পী অমুক, রচনা কাজী নজরুল ইসলাম। অনেক পরে এর উত্তরণ হয়। কিন্তু সর্বনাশটা পাকাপোক্ত হয় সে-সময়। নজরুল সংগীতের অন্ধকার যুগ বলা যায় সে-সময়কে। যে যার মতো করে নজরুলের গানে বাণী আর সুর বসিয়ে গাচ্ছে। অসম্ভব জনপ্রিয় হচ্ছে সেসব গান। এই জনপ্রিয়তাকে উস্কে দিচ্ছে কলকাতা থেকে আসা স্বরলিপি। সেসব বই সংগ্রহ করে গান গাইতে গিয়ে থমকে দাঁড়ান সুধীন দাশ। একি! ছোটবেলায় নজরুলের গান যেভাবে শুনেছি, এখানে সুর তো সেভাবে নেই! এরপর নিজ উদ্যোগে নজরুলের গানের আদি গ্রামোফোন রেকর্ড সংগ্রহ শুরু করেন তিনি। এবার আবার মেলানোর চেষ্টা করেন। না স্বরলিপি তো একবারেই অন্যরকম! গানের কথাও ঠিক নেই! এ ধরনের বিকৃত স্বরলিপি প্রকাশের প্রতিবাদে তিনি কলকতা যান, কথা বলেন স্বরলিপিকারদের সাথে, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। ব্যাপারটি নিয়ে ঢাকার অনেকের সাথে যোগাযোগ ও আলোচনা করেও খুব একটা লাভ হলো না। তবে নজরুল একাডেমি ভূমিকা নিল। তাদের উদ্যোগে গত শতকের সত্তরের দশকে এই স্বরলিপি তৈরির কাজ তিনি শুরু করেন। বই প্রকাশিত হলো। ইতিহাস শুরু এখান থেকেই।

ইতোমধ্যে নজরুল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা হলো। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার নজরুল সংগীতের স্বরলিপির শুদ্ধতা যাচাই, প্রমাণীকরণ ও সত্যায়নের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করলেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান সংগ্রহ, সংরক্ষণ, স্বরলিপি প্রকাশে এ প্রতিষ্ঠান অগ্রগণ্য ও একমাত্র। সুধীন দাশকে তারা স্বরলিপি প্রণয়ন করার দায়িত্ব দিলেন। তিনি সত্যায়ন বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হলেন। প্রতিটি গ্রন্থে ২৫টি করে গান অন্তর্ভুক্ত হলো। এ পর্যন্ত তিনি ২৫টি স্বরলিপি গ্রন্থের কাজ করেছেন। স্বরলিপিকার হিসেবে সুধীন দাশ দুই বাংলার তথা গোটা বিশ্বের বাংলা গানের মানুষের কাছে শ্রদ্ধাভাজন হয়ে আছেন। নজরুল সান্নিধ্যধন্য ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্র, জগত্ ঘটক, সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় সুধীন দাশের স্বরলিপি গ্রন্থের ভূয়সি প্রশংসা করে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এখন শুধু সুধীন দাশ নন, তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরাও নজরুল ইনস্টিটিউটে স্বরলিপির কাজ করছেন। স্ত্রী নীলিমা দাশেরও দু’টি খণ্ড আছে। নজরুলের গানের বাণী ও সুর শুদ্ধরূপে সবার মাঝে পৌঁছে দিতে সুধীন দাশের অবদান অবিস্মরণীয়।

স্বরলিপি কাজের অগ্রগতির পর সুধীন দাশ বুঝতে পারলেন, শিল্পীদের অনেকেই স্বরলিপির চর্চা করেন না। কিন্তু শোনার ব্যাপারে তাদের যথেষ্ট আগ্রহ আছে। তাই তিনি নজরুল ইনস্টিটিউটে সংরক্ষিত আদি গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে সিডি তৈরির ব্যপারে কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ গানের আদি শিল্পীদের রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছে।

শুধু নজরুলের গানই না, সংগীতের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য তিনি লালনের গানের স্বরলিপি বইও প্রকাশ করেছেন। খোদাবক্স সাঁই-এর কণ্ঠে আখড়ার সুর সংরক্ষণের জন্যই তিনি এ তাগিদ অনুভব করেন। সুধীন দাশ দুঃখ করে বলেন, স্বরলিপি কাজের জন্য আমাকে অনেক ঝড়-ঝাপটা, অনেক সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বিভিন্নজন আমার বিরুদ্ধাচারণ করেছে, একটি পত্রিকা দীর্ঘদিন আমার সমালোচনা লিখেছে। এত কিছুর পরে আজ নজরুলের গানে একটা স্থিতি এসেছে । রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে  মন্তব্য করতে বললে, সুধীন দাশ বলেন, ‘আমি বাঙালি, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাংলা ভাষার প্রকৃত স্বরূপ জানা যাবে না, তেমনি নজরুল ছাড়াও জানা যাবে না। দুজনই আমার পরম আদর্শ, শ্রদ্ধেয়। তাছাড়া শিল্পী হিসেবে, একজন সংগীত সাধক হিসেবে আমি সব ধরনের বাংলা গান পছন্দ করি।’

সুরকার সুধীন দাশ

প্রথমে বেতার জীবনে বিভিন্ন জনের সুর করলেও সিকান্দার আবু জাফরের নাম তিনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করলেন। সুধীন দাশ জানালেন, সিকান্দার আবু জাফর দেশের গানের পাশাপাশি প্রেমের গান রচনাতেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন। যেমন—আমার জানলা দিয়ে যখন তখন করত যাওয়া আসা/ দেখি সে দুটি চড়ই পাখির বাসা। এ গানটি প্রথমে আমি গাইলেও পরে নীলুফার ইয়াসমীন গেয়েছেন। গানটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল।

সুরকার হিসেবে সুধীন দাশ কতখানি জনপ্রিয় ছিলেন বা কতখানি ভালো সুর করতে পারতেন তা বোঝা যায় পরের গল্পে। একবার বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রযোজক কাজী আবু জাফর সিদ্দিক নজরুলের ‘ঝিলিমিলি’ নাটকের জন্য নজরুলের ১০টি অপ্রকাশিত গান সুর করার দায়িত্ব দেন সুধীন দাশকে। সুধীন দাশ বিনয়ের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন এই বলে যে, নজরুলের গান সুর করার মতো যোগ্যতা তাঁর নেই। কিন্তু লাভ হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁকে সুর করতে হয়। ১০টি গানই গেয়েছেন ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী। ‘শুকালো মিলন মেলা আমি তবে যাই’—নজরুলের এ গানটি সুধীন দাশের সুরে গাওয়া হয়। অন্য গানগুলোর কথা তিনি আর স্মরণ করতে পারেন না।

পুরস্কার ও সম্মাননা

সংগীতে অবদানের জন্য সুধীন দাশ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য পুরস্কার-পদক-সম্মাননা পেয়েছেন। ১৯৮৮ সালে একুশে পদক ছাড়াও তিনি মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার, চ্যানেল আই আজীবন সম্মাননা, রাইটার্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ সম্মাননা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পদক, নজরুল পদক, নজরুল একাডেমি চুরুলিয়া সম্মাননা, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের সম্মাননা, কথা ললিতকলা একাডেমি গুণীজন সম্মাননা, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় সম্মাননা, নজরুল জন্ম শতবর্ষে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সম্মাননা, সুরসপ্তক আজীবন সম্মাননা, আমীন জুয়েলার্স-এর ৫০ বছর পূর্তি সম্মাননা, শহীদ আলতাফ মাহমুদ পদক, দোলনচাঁপা সংগীত নিকেতন পদক, গীতাঞ্জলী সম্মাননা পদক, ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদ উচ্চাঙ্গ সংগীত ফোরাম সম্মাননা , বাংলা একাডেমি পদক, বেগম জেবুন্নেছা মাহবুবুল্লাহ ট্রাস্ট স্বর্ণপদক ইত্যাদি পদক লাভ করেন।

শেষ কথা

দেশের প্রায় সমস্ত সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সুধীন দাশ জড়িত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স-মাস্টার্স পরীক্ষার পরীক্ষক, বেতার-টেলিভিশনের গ্রেডেশন বোর্ডের প্রধান বিচারক, বাংলাদেশ টেক্সবুক বোর্ডের অন্যতম সদস্য, স্বরলিপি প্রমাণীকরণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বয়সের ভারে বেশ খানিকটা নুয়ে পড়লেও এখানো সুধীন দাশের সময় কাটে ছাত্র-ছাত্রী, পরিবার-পরিজন ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে। এ বয়সে তাঁর কারো প্রতি কোনো খেদ নেই।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩ মে, ২০১৯ ইং
ফজর৪:০২
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:৩১
এশা৭:৪৯
সূর্যোদয় - ৫:২৩সূর্যাস্ত - ০৬:২৬
পড়ুন