সোহরাব হোসেন
নজরুলসংগীতের বরপুত্র
শাহীনুর রেজা১১ অক্টোবর, ২০১৭ ইং
নজরুলসংগীতের বরপুত্র
বিশ শতকের ছয় দশক থেকে প্রায় সত্তুর বছর যিনি সুরে, কথকতায় রসিকতায় এবং প্রাণপ্রাচুর্যে ঢাকার সংস্কৃতি-অঙ্গনকে মাতিয়ে রেখেছিলেন তিনি সোহরাব হোসেন। উদাত্তকণ্ঠ এবং কণ্ঠমাধুর্যের বরপুত্র হিসেবে তিনি সংগীতকে নিয়ে গেছেন এক উচ্চমার্গে। এই বিরল প্রতিভাবান মানুষটিকে নিয়ে আমাদের এবারের পথিকৃত্—

শাহীনুর রেজা

 

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

সোহরাব হোসেন ১৩৩০ বঙ্গাব্দে (৯ এপ্রিল ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার আয়েশতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম তহিরুদ্দিন মন্ডল ও মাতার নাম গুলনাহার বেগম। ছিলেন ৩ ভাই ও ২ বোন এর মধ্যে চতুর্থজন হলেন সোহরাব হোসেন।

রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম হওয়ায় লড়াইটা সহজ ছিল না। পরিবারে সাংগীতিক আবহ ছিল না মোটেই। মাতবর গোছের মানুষ ছিলেন বাপ-চাচারা, গানের ধার ধারতেন না। ব্যবসা করতেন ভুসি মালের, পাটের। গানের ছিটেফোঁটা কিছুটা যে নানাবাড়ির সূত্রে পেয়েছিলেন তা তাঁর স্মৃতিচারণ থেকে পাওয়া যায়—‘নানা তমিজউদ্দিন মিয়া বাবার মতোই ব্যবসা করতেন, সম্পত্তি ছিল ভালোই। আমার এক খালাত ভাই ওয়াজিউদ্দিন আমাকে কোলে করে নিয়ে নানা বাড়িতে যেত। আর আমার চাচাত ভাই ছিল অনেকগুলো। তারা ধরত, নানা গান শোনাও। নানা শোনাতেন। ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানটা প্রথম নানার মুখেই আমি শুনেছি। তখন আমার বয়স পাঁচের নিচে হবে। আরো পরে আমাদের গ্রামে এক বুড়ো মানুষ পাউরুটি বিক্রি করত। তাকে আমি বললাম, রুটি কিনব তোমার কাছ থেকে যদি তুমি গান শোনাও। সেই বুড়োও ক্ষুদিরামের ফাঁসির গান গাইলো।’ এভাবে শুনতে শুনতে সোহরাব হোসেন গায়েন হতে শুরু করলেন।

 

সংগীতসূত্র

তেরো বছর বয়সে রানাঘাট মহকুমা শহরের জয়নাল আবেদীনের কাছে সোহরাব হোসেনের প্রথম সংগীতে হাতেখড়ি হয়। পরবর্তী গুরু কিরণ চন্দ্র দে। তাঁর কাছে সংগীতে তালিম নেবার ঝক্কি বেশ বড়। সোহরাব হোসেনের কথায়—‘আমাদের আয়েশতলা গ্রামের মাঝখান দিয়ে চূর্না নদী, এখনো আছে। সেই নদী পার হয়ে আমাকে ওপারে যেতে হতো। ওপারে আমাদের দোকান ছিল। খেয়া নৌকার মাঝির নাম ছিল গোপী। ওপার থেকে একদিন নৌকা আসতে দেরি হচ্ছে। আমি খুব জোরে গান ধরেছি। পাশেই ক্ষিরোদ পাল চৌধুরী বলে এক জমিদার ছিলেন। তিনি শুনে বললেন, কে গান গাচ্ছে, ছেলেটাকে নিয়ে এসো। একটা লোক এসে তখন আমাকে বলল, জমিদার বাবু ডাকছে। শুনে ভয় পেলাম। তখন জমিদার মানে সাংঘাতিক ব্যাপার। তো তিনি আমাকে দেখেই বললেন, খোকা তোমার বাড়ি কোথায়? বললাম, আয়েশতলা গ্রামে। তিনি একটা গান শোনাতে বললেন। আমি একটা শ্যামাসংগীত গাইলাম—মা তোর বরণ কালো কিসে মাগো বল। তিনি হিন্দু বলেই আমি শ্যামাসংগীতটা গাইলাম। তাঁর চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। তিনি বললেন, বাবা, তুমি গান শিখবা? ওনার জমিদারি ক্লাব ছিল। তার নাম ‘হ্যাপি ক্লাব’। ওই ক্লাবে জমিদারের মতো লোক ছাড়া কেউ মেম্বার ছিল না। সেই ক্লাবের আমিই প্রথম মুসলমান মেম্বার হলাম। জমিদার বাবু আমাকে একজন শিক্ষক ঠিক করে দিলেন। তাঁর নাম কিরণ চন্দ্র দে।’

প্রতিদিন খেয়া নৌকা পার হয়ে সোহরাব হোসেনের গানের তালিম নেয়া চলতে থাকল। ঘটনাটা একদিন বাড়িতে জানাজানি হয়ে গেল। বড় ভাইরা বকাঝকা করলেন। সোহরাব হোসেনের মনটা খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু তিনি দমলেন না। রাত করে যাতায়াত শুরু করলেন। গোপী মাঝি চুপি চুপি নৌকা পার করে দিত। বাড়ির বৈঠকখানায় থাকতেন সোহরাব হোসেন। বাড়ি থেকে সেটা আলাদা ছিল। মাঝরাতে মেজো ভাইয়ের টর্চ লাইটটা চুরি করে লোহার একটা ফলা নিয়ে (জীবজন্তুদের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য) ওস্তাদের কাছে গান শিখতে যেতেন।

তো এভাবে কিছুদিন চলল। কিন্তু এটাও শেষ পর্যন্ত জানাজানি হয়ে গেল। সোহরাব হোসেনের কথায়—‘একদিন ঘাটে গিয়ে শুনি গোপী দা আমাকে নৌকায় নেবেন না। মুখ ভার করে বললেন, তোমার ভাই এসেছিল, পার করতে নিষেধ করে গেছেন। মনটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু বাড়িতে না ফিরে নদী সাঁতরে ওস্তাদের বাড়িতে গেলাম। কিরণ চন্দ্র দে শিষ্যকে দেখে বললেন, তোমার এ অবস্থা কেন? সব খুলে বললাম। ওস্তাদ জমিদারকে সমস্ত ঘটনা খুলে জানালেন। তখন রানাঘাটে বিদ্যুত্ ছিল না। জমিদারের নিজস্ব ডায়ানামা ছিল। সেটা চালাতেন আয়েশতলা গ্রামের  আব্দুল আজিজ। তাঁকে জমিদার বললেন, আমার স্পিডলঞ্চ আছে। আজিজ তুমি যখন রাত বারোটার সময় বাড়িতে যাবে তখন এই ছেলেটাকে স্পিডলঞ্চে নিয়ে যাবে।’ এরপর থেকে সোহরাব হোসেন ওস্তাদের বাড়িতে জমিদারের স্পিডলঞ্চে যেতেন। কিন্তু সে আর কতদিন! রক্ষণশীল পরিবারের লোক হওয়ায় ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয়েছে অনেক। একসময় এ বিষয়টিও জানাজানি হয়ে গেল। একবার তো বড় ভাইরা সোহরাব হোসেনকে খুব মারধর করল। গ্রামের মুরুব্বিরা বলল, মাতব্বরের ভাই গান গাইবে এটা আমরা দেখতে চাই না। সোহরাব হোসেনের গান শেখা নিয়ে গ্রামের লোকেরা দুই ভাগ হয়ে গেল। সোহরাব হোসেন একঘরে হয়ে গেলেন। এ সময় তিনি গ্রামের স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন। সংগীত শেখাতে তাঁর যত বাধা আসতে থাকে ততই সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়ল বৈ কমল না।

 

আব্বাসউদ্দীনের সান্নিধ্য

১৯৪৪ সালের কথা। কী একটা কাজে রানাঘাটে কবি জসীম উদ্দীন, আব্বাসউদ্দীন আহমেদ ও ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু এলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। রানাঘাটে আয়েশতলা গ্রামের এক মুসলমান রেলওয়ের টিকেট চেকার থাকতেন। তাঁর বাসায় আব্বাসউদ্দীন উঠলেন। উনি আব্বাসউদ্দীনকে বললেন, আমাদের এখানে একটা ছেলে আছে, ভালো কণ্ঠ, তাকে চান্স দেবেন। আব্বাসউদ্দীন বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ।

বলার অপেক্ষামাত্র। পরদিনই ওই ভদ্রলোক সোহরাব হোসেনকে নিয়ে গেলেন আব্বাসউদ্দীনের কাছে। আব্বাসউদ্দীন দরাজ গলায় বললেন, গান শোনাও। আর তখনই বাধল বিপত্তি। প্রতিদিন এত এত গান করতাম, বললেন সোহরাব হোসেন। অথচ ওই সময় আর কোনো গান মনে আসে না, আসলেও গলা থেকে বেরোতে চায় না। অদ্ভুত এক অবস্থা। অনেক কষ্ট করে কয়েকটা শোনালাম।

আর ওই ক’টা গান শুনেই ভালো লেগে গেল আব্বাসউদ্দীনের। যাঁর বাড়িতে উঠেছিলেন তাঁকে বললেন, কোনো মুসলমান ছেলের এত সুন্দর কণ্ঠ আমি আর শুনিনি। সোহরাব হোসেনের কাছে তাঁর বিস্তারিত কথা শুনলেন। আর বললেন, আমি এখানে এলে তুমি আমার কাছে আসবে। এরপর থেকে আব্বাসউদ্দীন নদীয়া গেলেই সোহরাব হোসেন তাঁর কাছে যেতেন। আব্বাসউদ্দীন সোহরাব হোসেনকে দু-একটি করে গান শেখাতে লাগলেন এবং অনুষ্ঠানে গান করান। তারপর আস্তে আস্তে সঙ্গী করে নিলেন।

বদলে গেল সোহরাব হোসেনের পোশাক-আশাক, চাল-চলন। আব্বাসউদ্দীন শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক সাহেবকে সোহরাব হোসেনের গান শোনালেন। তিনি খুশি হলেন। কলকাতা রেডিওর সং পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্ট-এ একটা পোস্ট খালি ছিল। কবি জসীমউদ্দীন ছিলেন সং পাবলিসিটির অর্গানাইজার। আব্বাসউদ্দীনের সুপারিশে সং পাবলিসিটিতে একজন সিঙ্গার হিসেবে  চাকরি হয়ে গেল সোহরাব হোসেনের।

 

কলকাতায়  গান শেখা

আব্বাসউদ্দীন নিজে যেমন কিংবদন্তি গায়ক তেমনি কুড়িয়ে এনেছিলেন এক রত্ন প্রতিভা। সোহরাব হোসেন আব্বাসউদ্দীনের কাছে পল্লীগীতি এবং নজরুলসংগীত শিখতে শুরু করেন। একসময় গভীরভাবে নজরুলসংগীতের মায়ায় ডুবে যান। নজরুল ইসলাম এবং আব্বাসউদ্দীনকে দিয়ে সংগীতে মুসলমানদের নতুন যে রেনেসাঁকাল শুরু হয়েছিল, সোহরাব হোসেন সাথে এসে তা পরিপূর্ণ হলো। পরবর্তীসময়ে তিনি ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুর নিকট উচ্চাঙ্গ সংগীতে এবং সুধীরলাল চক্রবর্তী ও গিরীন চক্রবর্তীর কাছে আধুনিক গানের তালিম নেন। এছাড়া তিনি ইন্দুবালা, আঙ্গুর বালা, সরযুবালার কণ্ঠের গান শুনে নজরুলসংগীতের গায়কী গ্রহণ করেন।

 

পরিবারের কথা

সোহরাব হোসেন ১৯৪৫ সালে সুরাতন নেসা’র সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের তিন মেয়ে দুই ছেলে। তাঁরা হলেন—মোয়াজ্জেম হোসেন, রওশন আরা সোমা, মারুফ হোসেন, রাহাত আরা গীতি ও রিফাত আরা আলম। ছেলেমেয়েদের মধ্যে রওশন আরা সোমা ও রাহাত আরা গীতি প্রতিষ্ঠিত নজরুলসংগীত শিল্পী।

রওশন আরা সোমা পিতা সম্পর্কে বলেন, পিতা এবং শিল্পী সোহরাব হোসেন সম্পর্কে সংক্ষেপে বলা সহজ না। পিতা হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহপরায়ণ। এমন স্নেহপরায়ণ পিতা আমি খুব কমই দেখেছি। আর তিনি ছিলেন আমার প্রথম গুরু। তাঁর কণ্ঠের গান শুনেই আমি সংগীত-জগতে এসেছি। উনি শুধু আমার পিতা ছিলেন না, একাধারে ছিলেন গুরু, বন্ধু এবং সুখ-দুঃখের সাথী। মোট কথা উনি ছিলেন আমার আদর্শ। উনার আদর্শকে আমি মেনে চলতাম। উনার চাল-চলন কথা-বার্তায় কোনো অহংবোধ ছিল না। উনি যে মস্ত বড় মাপের শিল্পী ছিলেন তা চলে যাবার পর আমরা বুঝতে পারি। মানুষের সাথে উনি মানুষের মতো মিশতেন।

রাহাত আরা গীতি পিতা সম্পর্কে বলেন, আমার বাবা একজন অসাধারণ শিক্ষক ও বাবা। এমন বাবার মেয়ে হতে পেরে আমি ধন্য। আমি এমন এক মানুষের সন্তান যিনি দেশে-বিদেশে অসংখ্য মানুষকে সংগীত শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি শুধু পাঁচ সন্তানের জনক নন অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীদেরও জনক। এমন মানুষ সত্যিকার অর্থে বিরল। ছোটবেলায় যখন কাঁদতাম, আমার কান্নার শব্দ বাবার শ্রবণে বুলিয়ে দিত সুরের প্রশান্ত পরশ, তাই তিনি আমার নাম রেখেছেন গীতি।

 

স্থায়ীভাবে ঢাকায়

’৪৭-এর দেশভাগের সময় সোহরাব হোসেন মাতা ও ভাইবোনদের সাথে বৃহত্তর যশোরের চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা থানার কার্পাসডাঙ্গা গ্রামে চলে আসেন। ততদিনে পিতা পরলোকে।

ঢাকায় পূর্ববাংলার রাজধানী স্থাপিত হলে অন্যান্য মুসলমান শিল্পীদের সাথে সোহরাব হোসেনও স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন। তিনি ঢাকাতে চাকরি করতেন পূর্ববাংলা সরকারের পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে। নিয়মিত গান গাইতেন ঢাকা বেতারকেন্দ্রে। আর থাকতেন জিন্দাবাহার লেনে, কলকাতা থেকে আগত শিল্পীদের সঙ্গে মেস বাড়িতে।  পরবর্তীসময়ে সরকার মোহাম্মদপুর বাজারের পাশে একটি প্লট বরাদ্দ দিলে তিনি একতলা বাড়ি করে সপরিবারে বসবাস শুরু করেন। ঢাকায় স্থায়ীভাবে থাকলেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর গ্রামের সাথে যোগাযোগ ছিল।

ঢাকায় তিনি গানের টিউশনি ও বেতারের রেকর্ডিংয়ে প্রাপ্ত টাকায় সংসার চালাতেন। সে-সময় এক-একজন শিল্পীকে এক-একদিন পনেরো মিনিটের সিটিং-এ সব রকমের গান গাইতে হতো। সোহরাব হোসেন কুশলতার সাথে আধুনিক, পল্লী ও নজরুলসংগীত গাইতেন। টিউশনি করার সময়ও তিনি প্রায় সব ধরনের গান শেখাতেন।

টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই সোহরার হোসেন সংগীত পরিবেশন করেছেন। বেশ কয়েকটি  ই.পি, এল.পি, ক্যাসেট, সিডি তাঁর প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সিনেমাতেও নিয়মিত প্লে-ব্যাক করেছেন। মাটির পাহাড়, যে নদী মরুপথে, এদেশ তোমার আমার, শীত বিকেল, গোধূলির প্রেম, আগন্তুক ইত্যাদি চলচ্চিত্রে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন।

 

ছাত্র-ছাত্রী

সোহরাব হোসেনের ছাত্র-ছাত্রী রবীন্দ্র-নজরুল-আধুনিক-লোক সব পর্যায়ে ছড়িয়ে আছে। তাঁর ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা হাতে গুনে শেষ করা যাবে না। স্বনামখ্যাতরা হলেন—আতিকুল ইসলাম, ইসমত আরা, রওশন আরা মাসুদ, রওশন আরা মুস্তাফিজ, জেবুন্নেসা জামাল, আবিদা সুলতানা, রেবেকা সুলতানা, শাহীন সামাদ, জোসেফ কমল রড্রিক্স, রফিকুল ইসলাম, আব্দুল লতিফ, শাহনাজ রহমতুল্লাহ, খায়রুল আনাম শাকিল, শবনম মুশতারী, পারভীন মুশতারী, বেনু, এস এম আহসান মুর্শেদ, কন্যাদ্বয় রওশন আরা সোমা ও রাহাত আরা গীতি প্রমুখ।

 

একটি অন্যরকম গল্প

একবার এক টিভি সাক্ষাত্কারে সোহরাব হোসেনের কাছ থেকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ছাত্র-ছাত্রীদের নাম জানতে চাওয়া হলে তিনি অনেকের নাম বললেন। কিন্তু ভুলবশতঃ দেশবরেণ্য শিল্পী ড. সন্জীদা খাতুনের নাম বলেননি। পরে সন্জীদা খাতুন ফোন করে অনুযোগ করলে তিনি তড়িত্ জবাব দেন এই বলে যে সন্জীদা খাতুন অনেক খ্যাতি ও সুনামের একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ। তাই তিনি তাঁর নাম অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে যুক্ত করতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। আসলে তিনি নামটা ভুলে গিয়েছিলেন সেটা চেপে গেলেন। যা হোক কিছুদিন পর আরেকটি সাক্ষাত্কারে ড. সন্জীদার নাম সবার আগে বলে অনুযোগের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করেছিলেন।

 

পুরস্কার ও পদক

সাদামাটা, কৌতুকপ্রিয় এবং একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে সোহরাব হোসেন ছিলেন সবার শ্রদ্ধার পাত্র। সততা ও নিষ্ঠা তাঁর চরিত্রের অন্যতম দিক। সংগীতের একনিষ্ঠ সাধক হিসেবে সোহরাব হোসেন ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে নজরুল একাডেমি স্বর্ণপদক, ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে বেগম জেবুন্নেছা ও কাজী মাহাবুব উল্লাহ কল্যাণ ট্রাস্ট স্বর্ণপদক, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পুরস্কার, ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে কবিতীর্থ চুরুলিয়া আকাদেমী পুরস্কার, ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক, ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত পরিষদ পদক, ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে নজরুল পদক, ১৯৯৮ খ্রিস্টাবেদ নজরুল জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’ কর্তৃক বিশেষ সম্মাননা প্রতীক ও সাংবাদিক আসাদ-উদ-দৌলা পুরস্কার, চ্যানেল আই ও মেরিল প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা লাভের পাশাপাশি শতাধিক পুরস্কার ও পদক লাভ করেন।

 

বিদেশ সফর

কর্মজীবনে সোহরাব হোসেন দীর্ঘদিন সরকারের সং পাবলিসিটি বিভাগে চাকরি করেন। এছাড়া ছায়ানট, নজরুল ইনস্টিটিউট এবং কচিকণ্ঠ ললিতকলা একাডেমির অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মকালীন সোহরাব হোসেন সরকারি ও বেসরকারি ভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। যেমন—১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে সিঙ্গাপুর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সংগীত সম্মেলন, ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে তত্কালীন পাকিস্তান সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হিসেবে লন্ডন, ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের আর্ট সোসাইটির আমন্ত্রণে লন্ডন, ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতের বোম্বে, ১৯৭৫ খিস্টাব্দে ভারতের দিল্লি ও বোম্বে, ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে আফগানিস্তান, ১৯৮৬ খিস্টাব্দে বার্মা, ১৯৯০ ও ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা, ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে কানাডা এবং ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে গমন করেন। নজরুলসংগীতের শিল্পী হিসেবে এতগুলো দেশে ভ্রমণ সোহরাব হোসেনের জন্য ছিল অত্যন্ত সম্মানের।

 

নেশা যখন ভিন্ন

সোহরাব হোসেন সরকার কর্তৃক গঠিত নজরুলসংগীত প্রমাণীকরণ পরিষদ-এর অন্যতম সদস্য ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি সংগীত কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। বেতার ও টেলিভিশনের সম্মানিত বিচারক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। সংগীতে এত এত সম্পৃক্ততা সত্ত্বেও তাঁর ছিল ভিন্ন নেশা।

স্কুলজীবনে থিয়েটার দেখার প্রচণ্ড নেশা ছিল। মাঝে এমন হলো যে, মাকে না বলে পয়সা নিয়ে থিয়েটার দেখতে চলে যেতেন। ফুটবল খেলার নেশা ছিল প্রচণ্ড। এত ভালো খেলতেন যে, গায়ক না হলে খেলোয়াড় হতেন। টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলা দেখতেন আয়োজন করে। বন্ধু সুধীন দাশের সাথে মাছ ধরার একটা নেশাও ছিল প্রচণ্ড রকমের। সব কিছু ছাপিয়ে তিনি একজন নজরুলসংগীত শিল্পী।

এই God Gifted Voice-এর শিল্পী সোহরাব হোসেনের পরিবেশিত রেডিও, টিভি, চলচ্চিত্রের সমস্ত গান সংগ্রহ করে আর্কাইভ করা জরুরি। সময় চলে যাচ্ছে। এগিয়ে আসতে হবে হয় সরকারকে, না হয় পরিবারকে, না হয় সোহরাব হোসেন স্মৃতি সংসদকে। হ্যাঁ, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা কার্পাসডাঙ্গাতে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে       ‘সোহরাব হোসেন স্মৃতি সংসদ’। উদ্যোক্তাদের অভিনন্দন।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ অক্টোবর, ২০২১ ইং
ফজর৪:৩৯
যোহর১১:৪৬
আসর৩:৫৮
মাগরিব৫:৪০
এশা৬:৫১
সূর্যোদয় - ৫:৫৪সূর্যাস্ত - ০৫:৩৫
পড়ুন