লোক-মোটিফে আবহমান বাংলার চিত্রকর
২৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
লোক-মোটিফে আবহমান বাংলার চিত্রকর
মোহাম্মদ আসাদ

 

আমাদের চিত্রকলায় লোকঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়েছন শিল্পী আব্দুস শাকুর শাহ্। তাঁর ফ্রেমে তুলে এনেছেন ময়মনসিংহ গীতিকার চরিত্র মহুয়া, মলুয়া, নদের চাঁদ, চম্পাবতীর আখ্যান। বিষয় পুরনো হলেও তাঁর রং ও রেখায় আধুনিকতা স্পষ্ট। আব্দুস শাকুর চিত্রকর্মের মাধ্যমে আমাদের লোকঐতিহ্য দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে নিয়ে গেছেন বহির্বিশ্বে। 

আব্দুস শাকুর শাহ্ ১৯৪৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর বগুড়া শহরের কাছেই নিশিন্দরা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা আলহাজ ওসমান আলী শাহ্ জেলা পরিষদে চাকরি করতেন। মা হামিদা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। ৯ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে শাকুর শাহ্ ছিলেন পঞ্চম। মধ্যবিত্ত পরিবারে টানাপোড়েনের মধ্যেই তাঁদের বড় হতে হয়েছে। শিক্ষাজীবনের শুরুটা হয় নিজ গ্রামের বকুলতলা প্রাইমারি স্কুলে। প্রাইমারি শেষ করে ভর্তি হন করনেশন উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে মিউনিসিপ্যাল উচ্চ বিদ্যালয়ে এসে মেট্রিক পাস করেন। বগুড়ায় তাঁর জীবন ছিল বাধাহীন। স্কুলজীবন থেকেই যুক্ত ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে। চিত্রশিল্পী হবেন—এটি কখনোই ভাবেননি। তাঁর শিল্পের প্রতি ভালোবাসা জুগিয়েছে বগুড়ার সাংস্কৃতিক পরিবেশ। তখনো তাঁর জানা হয়ে ওঠেনি ঢাকায় আর্ট কলেজ আছে। তাঁর এক সহপাঠীর ভাই ছিলেন সিনেমা পেইন্টার। সে গল্পই তাঁর শিল্পী হওয়ার প্রেরণা। মেট্রিক পাস করে বগুড়ায় কোথাও আর্ট শেখা যায় কি না, ভাবতে লাগলেন। এরই মধ্যে তাঁর বড় ভাই আর্ট কলেজের সন্ধান দিলেন। শাকুর শাহ্ ১৯৬৫ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসে পাস করেন। তখন মুক্তিযুদ্ধ লেগে যায় যায় অবস্থা। ঢাকায় চলছে আন্দোলন। মিছিলে অংশগ্রহণ, শহীদ মিনারে ব্যানার বহন করে নেয়া ছিল নিয়মিত কাজ। এরই মধ্যে তাঁর চাকরি হয়ে গেল সিলেট ক্যাডেট কলেজে। সেখানে জয়েন করার পরই শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। নতুন জায়গায় কেউ নেই পরিচিত। অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আশ্রয় নিলেন দূরের এক গ্রামে। দু-একবার সিলেট শহরে এলেও যুদ্ধের নয় মাস কেটেছে সিলেটের দূরের এক গ্রামে। ১৯৭৬ সালে নতুন কর্মস্থল চট্টগ্রাম টিচার্স কলেজ। সেখান থেকে সে-বছরই স্কলারশিপ নিয়ে যান ভারতের বরোদা। বরোদায় থাকাকালীন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয় করে অসাধারণ কিছু কাজ করেন। ১৯৭৮ সালে বরোদা থেকে ফিরে আবার যোগ দেন চট্টগ্রাম টিচার্স কলেজে। সেখান থেকে ১৯৮০ সালে যোগ দেন ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে। কাজ শুরু করেন চারু ও কারুকলা বিভাগে। এই বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘদিন। ২০০৬ সালে চারকলা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর পরিচালকের দায়িত্ব নেন। ২০০৯ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ হলে তিনি ডিনের দায়িত্ব পান। ২০১০ সালে নির্বাচিত ডিনের হাতে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। ২০১২ সালে তিনি রিটায়ার্ড করেন। বর্তমানে অনারারি শিক্ষক হিসেবে আছেন চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুই সন্তানের মধ্যে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে ইংরেজিতে অনার্স করেছে। বর্তমানে তিনি উত্তরাস্থ নিজ ফ্ল্যাটে শিল্পচর্চায় নিমগ্ন আছেন।

চারুকলা ইনস্টিটিউটে অ্যাকাডেমিক নিয়মেই কাজ শিখতে হয়। পাস করার পর আস্তে আস্তে তিনি বিষয়গুলোকে ভাঙতে থাকেন। কিছুদিন ইম্প্রেশনিস্ট ধারায় ছবি আঁকেন। সেখানে বিষয় ছিল তৃতীয় বিশ্বের সমস্যা নিয়ে। সে কাজে দেখতে পান, এখানে শুধু দুঃখই চলে আসে। ফিরে আসেন সে বিষয় থেকে। আমলে নেন এই দেশকে। খুঁজে নেন আমাদের লোকঐতিহ্যের মোটিফগুলো। রঙ-রেখায় বাংলার লোক-মোটিফ তাঁর ফ্রেম বাংলাদেশকে উপস্থাপন করেন।

‘উপমহাদেশে আধুনিক শিল্পের সাথে লোকশিল্পের সম্মিলন ঘটে ব্রিটিশ শাসনের শেষের দিকে। এই সময় ভারতীয় শিল্পকলা বিদেশি শিল্পকলা থেকে আলাদা হয়ে নিজস্ব শিল্পের গোড়াপত্তন করে। কলকাতায় এই ঘটনাটা ঘটল, তার কারণ সেখানকার শিল্পীরা চাচ্ছিলেন যে দেশাত্ববোধ বা বঙ্গধারা। দেশাত্ববোধ তাঁরা আধুনিক পেইনটিংয়ে নিয়ে আসলেন। তার আগে কিন্তু বিভিন্ন জিনিসের অনুকরণে ছবি আঁকা হতো। এরপর দ্বন্দ্ব লেগে গেল, আধুনিক শিল্পকলা দেশাত্ববোধ হলে এতে কী বিষয় আসতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এঁদের এক ঘরানা। যামিনী রায়, রামকিঙ্কর বেইজ এঁদের আরেক ঘরানা। বাংলার লোকঐতিহ্য, মোটিফ-ফর্ম আধুনিক শিল্পকলায় প্রথম নিয়ে আসেন যামিনী রায়। তিনি শিল্পকলায় লোক-মোটিফ আনার পর ভারতবর্ষে একটি শিল্প-আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। তখন অনেকেই বলেছেন যামিনী রায় তো কপি করছেন। আবার সুধীজনরা বলছেন, এটাই বঙ্গধারার পেইনন্টিং। এই নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। যামিনী রায়ের তখন ব্যাপক প্রচার শুরু হলো। বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য যে পুরাতন এবং শক্তিশালী সেটাই যামিনী রায় তুলে এনেছেন। লোকজ শিল্পীরা যে কাজগুলো করেন সেগুলো অসাধারণ কাজ। তাঁদের কাজের ভেতর কোনো খাদ নেই। কিন্তু তাঁরা পরিচিতি পান না। যামিনী রায় সে সমস্ত জিনিস এনে পরিচিত করেন। যেমন—বাকুরার টেরাকোটা ফর্ম। এভাবেই ভারতের লোকশিল্প  প্রথম পরিচিতি পায়। পরবর্তীকালে ওখানকার অনেক শিল্পী তাঁদের ক্যানভাসে এসব লোক-মোটিফ ব্যবহার করেছেন। আমাদের এখানেও জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান লোক-মোটিফ নিয়ে কাজ করেছেন। এটার মূল বিষয় দেশাত্ববোধকে তুলে ধরা। এভাবেই লোকঐতিহ্য আমাদের শিল্পকলায় আসে। তখন একটা ধারা ছিল অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং। আরেকটা হলো ফিগারেটিভ। এই দুই ধারার মধ্যে বিরাট দ্বন্দ্ব ছিল। পাকিস্তান আমলে এসে সেটা আরো বেশি প্রকট হলো। দেশের বেশির ভাগ শিল্পীই চাচ্ছিলেন দেশের জিনিসকে নিয়ে লোকজ ভাবধারায় আধুনিকভাবে কাজ করতে। কামরুল হাসানের কাজের প্রথম দিকে লোকজ ফর্ম ছিল না। ছাপ্পান্নর দিকে লোকজ ফর্ম নিয়ে কাজ শুরু হয়। তখন তো তিনি চারুকলার শিক্ষক। কাঠের পুতুল, টেরাকোটার পুতুল তিনি আধুনিকভাবে তাঁর ক্যানভাসে নিয়ে এসেছিলেন। লম্বা করে চোখ আঁকা। হাতপাখার পাখি, ময়ূর, পেঁচা, ষাঁড় আঁকলেন। অনেকগুলো ফর্ম নিয়ে আসলেন শীতলপাটি, লক্ষ্মীসরা, নকশিকাঁথা, শখের হাঁড়ি থেকে। বিভিন্ন জায়গা থেকে নিয়ে এসে আধুনিকায়ন করেছেন। কামরুল হাসান দীর্ঘদিন এই ফর্মগুলো ব্যবহার করেছেন। পরে আরও আধুনিকতা যোগ করার জন্য পিকাসোর কিছু ফর্মের সঙ্গে মিশ্রণ করে কিছু কাজ করলেন। আমাদের এখানে লোকশিল্পকলা ফর্ম ব্যবহার করে আধুনিক শিল্পকলা চর্চা এভাবে এগোয়। পরবর্তী সময়ে আবেদিন বা কামরুলের চিন্তা ধারণ করে কাজ করেছেন রশীদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী, হাশেম খান।’

শাকুর শাহ্ ওরকম কাউকে ফলো করেননি। যামিনী রায়কে নিয়ে চিন্তা করেছেন। কামরুল হাসান দেখেছেন। তিনি চিন্তা করেছেন তাঁর ফর্মটা কী ধরনের হবে। এটা দিয়ে বাংলাদেশ বুঝাতে পারা যায় কি না। কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী দেশজ বিষয়ের সাথে আধুনিকতা যোগ করেছেন। শাকুর তাঁর উল্টোটা করলেন। তিনি ছবির সঙ্গে কথাগুলো যুক্ত করলেন। এটাই তাঁর নিজস্বতা।

শাকুর শাহ্ আগে মডার্ন পেইন্টিং করতেন। জাপানে একটি আন্তর্জাতিক পেইন্টিং প্রতিযোগিতায় দুইটি ছবি পাঠিয়েছিলেন। ছোট্ট কাগজে শীতলপাটি থেকে নেয়া লোক-মোটিফ। এ ঘটনা তাঁকে দেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনে। তারপর তাঁর অধ্যায়টা পরিবর্তিত হয়ে যায়। লোক-ফর্মগুলো তিনি ডেকোরেটিভ টাইপ করে ব্যবহার করেন। তারপর এক বছর পরই তিনি তাঁর ফ্রেমে ময়মনসিংহ গীতিকা যুক্ত করেন। এই সমন্বয়টা করার পর একটা ফলাফল পান। তারপর তিনি দেখেন বিদেশিরা তাঁকে বেশি উত্সাহিত করছে। শোনা যাক তাঁর মুখেই— ‘ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত প্রথম আমাকে বললেন, তুমি একটা ভালো বিষয় পেয়েছ। এটা বাদ দিয়ো না, সরে যেয়ো না। জাপানে গেলাম, একই কথা—তুমি ঠিক জায়গা পেয়েছ। এভাবে ইংল্যান্ডে আমার কিছু পেইন্টিং নিয়ে গেলাম বাচ্চাদের শিক্ষার জন্য। তখন আমি বুঝতে পারলাম পথটা ঠিক আছে।’

শাকুর শাহ্ গুরু শিল্পীদের অনুসরণ করে যে পথে চলেছেন, তিনি দেখলেন সেটা পুরোই ঠিক আছে। তখন তিনি কাজে জোর দিলেন। আগের সবই বাদ দিয়ে দিলেন। এর ফলাফল, ইংল্যান্ডে ৫১টা ছবি শিশুদের শিক্ষায় দেখানো হচ্ছে। এখন ওয়েবসাইট করে সেখানে রেখেছে। এটাতে বাংলাদেশ থেকে শাকুর শাহেক নির্বাচন করেছে।

‘সে-সময়ের কাজে লেখা তেরাবাঁকা হতো। কিন্তু অনেকে বলেছে এগুলাই ভালো হয়েছে। এভাবেই লেখাটাকে আয়ত্তে আনলাম। ব্রাশটাকে নিজের গ্রিপে আনলাম। মহুয়ার সাথে নদের চাঁদের যে ঘটনাটা ঘটছে তা কতভাবে আনা যায়। চন্দ্রাবতী যে প্রথম কবি—এটা আমরা জানতাম না। এটা অনেক পরে জেনেছি। তখন এই চিন্তাগুলো করেছি মহুয়া, মলুয়া, চন্দ্রাবতী কী চেহারার হতে পারে। তখনকার সময় অনুযায়ী পরিবেশ কী রকম হতে পারে। সে এলাকার পাখি কেমন। এভাবে করে করে আজকের এই জায়গায় আসলাম। এটাই দেশচিন্তা করে ছবি আঁকা। যেটা কামরুল হাসান করেছেন। জয়নুল আবেদিন, কাইয়ুম চৌধুরী করেছেন।

‘আর্টের জীবন হচ্ছে ফোক আর্ট। প্রতি বছর বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও মেলায় দেখে প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন জয়নুল আবেদিন। এই আর্টকে প্রোমোট করার জন্য নিজের তাগিদেই সোনারগাঁয়ে ফোক মিউজিয়াম করলেন। এখন সেটা একটু রিভাইব হয়েছে। আগে ভদ্রসমাজ এই লোকশিল্প দেখত না, কিনতও না। এখন আবার মানুষের পছন্দের তালিকায় উঠে এসেছে। লোকশিল্প ভালোবাসার লোক বেড়েছে। কিন্তু টোটাল জিনিসটা ছিল যেমন ৩২টা আইটেম, তার সবগুলো রিভাইব করেনি। এসব ফোক আর্টিস্ট ব্যবসা পরিবর্তন করে ফেলেছেন। আমারদের এই ফোক আর্ট যদি শেষ হয়ে যায় তাহলে তো ইউরোপের মতো হবে। ফোক ট্র্যাডিশন বলতে কিছু থাকবে না।

‘এই ফোক আর্ট সার্ভাইভ করার শিল্পরসিক, শিল্পী, শিল্পসমঝদারদের কিছুটা হলেও দায়িত্ব আছে। আর আছে সরকারের। সরকার ওদের বছরে কিছুটা হলেও অনুদান দিতে পারে। যেইটা পারভীন আহমেদ (সাঈদ আহমেদের স্ত্রী) করতেন। তিনি তো মারাই গেলেন। তিনি ফোক আর্টিস্টদের টিকিয়ে রাখার জন্য পুরস্কার হিসেবে প্রতি বছর কিছু টাকা তুলে দিতেন। এখনো করে কেউ কেউ করে। কিন্তু মূল বিষয়টা হলো এই উপকরণের বাজারজাতকরণ। বিদেশে গেলে গেল, না হলে স্থানীয়ভাবে বিক্রি করে ওদেরকে টিকিয়ে রাখতে হবে। যাতে ওরা শিফট করে অন্য ব্যবসায় না যায়। কারণ, ওরা তো বংশপরম্পরায় এই কাজ করে। প্রতি বছর নতুন করে ফোক আর্টিস্ট তৈরি করা যায় না। ওরা শিখে শিখে তৈরি হয়। রাষ্ট্র আর একটু এগিয়ে এলেই এরা টিকে যাবে। তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশের হাজার হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী ফোক আর্ট কিছুটা হলেও পাওয়া যাচ্ছে।

‘ফোক আর্টের মধ্যে সিনেমার ব্যানার ও রিকশা আর্ট বিশুদ্ধ ট্র্যাডিশনাল না। এটা শহরকেন্দ্রিক লোকশিল্প। পরবর্তী সময়ে এগুলো ট্র্যাডিশনাল হয়েছে। এটার শুরু ব্রিটিশ আমলে। সিনেমার আগে যাত্রা হতো। যাত্রায় কোনো ব্যানার পেইন্টিং ব্যবহূত হয়নি। রিকশা জাপান থেকে আসে। এটা প্রথম ব্রিটিশরা পরিচয় করিয়ে দেয়। তখন রিকশাটা এমন ছিল, লোকের দেখে ভালো লাগত না। রাজাদের পালকি ছিল খুব নকশাখচিত। সেটার অনুকরণেই রিকশা সাজানো হলো। লোকশিল্পের ট্র্যাডিশনাল মূল যে কয়টা বিষয় আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো গাজীর পট, কাঠের হাতি-ঘোড়া-পুতুল, টেপা পুতুল, নকশিকাঁথা, শখের হাঁড়ি, শীতলপাটি, মনসার ঘট, হাতপাখা, শোলার কাজ, মুখোশ। এগুলো হলো একেবারে টিপিক্যাল ফোক আর্ট। আর ওই দুইটা হলো পরে। আধুনিক শিল্পীরা এই লোকশিল্প থেকে নিচ্ছেন। অনেক কিছু নিয়ে তাঁরা পেইন্টিংয়ে ব্যবহার করছেন। সরাসরি না নিয়ে রংটা নিচ্ছেন, না-হলে ফর্মটা নিচ্ছেন। কেউ মোটিফগুলো নিয়ে নিজের মতো ব্যবহার করছেন। আসলে বাংলাদেশ হওয়ার পরই শিল্পকলার ব্যাপক পরিবর্তনটা হয়েছে। শিল্পীরা তাঁদের ফ্রেমে দেশজ একটা বিষয় তুলে আনার চেষ্টা করছেন। এই সময়ে তরুণরা সাহস দেখিয়েছে, বিশাল বিশাল পেইন্টিং করেছে। কী হবে না হবে সেটা না দেখে তারা কাজ করে যাচ্ছে। এর আগে দুই ফিট দুই ফিট, তিন ফিট তিন ফিট কাজ করেছে।  আর বাঙালি জাতির একটা নিজস্বতা তো আছেই। বাঙালি জাতির সৃষ্টিশীল চিন্তাটা বেশি। এখানে প্রতিটা লোকই গান গাইতে চায়, প্রতিটা লোকই কবিতা লিখতে চায়। প্রতিটা লোকই কিছু না কিছু একটা করতে চায়। এর মূলে হলো—আমরা মাছ-ভাত খাওয়া। এই নিয়ে ব্রিটিশরাও বলে গেছে। ভারতের অন্যান্য এলাকার চাইতে বাংলার লোকজন চিন্তা করে বেশি। এবং তাদের ক্রিয়েটিভিটিও বেশি। 

‘লোকজ ফর্ম নিয়ে আমি কাজ করি প্রায় দুই দশক ধরে। এর মধ্যে কোনো কিছুতেই আমি ইচ্ছে করে পরিবর্তন আনিনি। কম্পোজিশনের স্বার্থেই কখনো রংটা বদল হয়। মহুয়া, মলুয়া, নদের চাঁদ আমার ফ্রেমে কখনো একা এসেছে, কখনো বন্ধুর সাথে। কখনো পিছনে গাছপালা দিয়ে বসন্তের একটা পরিবেশ আনা হয়েছে। কখনো শুধুই একটা মুখমণ্ডল সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। সে-সমাজকে দেখছে সে। এখানে আমি দেখাতে চেয়েছি সেই সময়কার সমাজ আর এখনকার সমাজের মধ্যে কতখানি পার্থক্য। তখন তো সমাজ তাকে দেখেছে। এখন যদি মহুয়া বেঁচে থাকত, বর্ণনা অনুযায়ী সে সমাজকে দেখত। এখন যদি গুলশান-বনানীতে মহুয়া থাকত তাহলে সে কী দেখত? এই সমাজের বিশাল বিশাল ভবন দেখে মহুয়া কী করত। এমন চিন্তা মাথায় নিয়েই আমার চরিত্রগুলোতে পরিবর্তন আসে। ফ্রেমে কখনো কালো রং, কখনো সবুজ রং আবার কখনো গোলাপি রং, কখনো বেগুনি রং এসেছে। পিছনে ফ্লাট সারফেসে আমি স্কয়ার ফর্ম ব্যবহার করেছি। নিজস্বতা আনার জন্য ময়মনসিংহ গীতিকার সুন্দর কিছু কথা নিচে লিখে দিয়েছি। হয়তো কোনো লেখার সাথে পেইন্টিংয়ের কোনো মিলই নেই। গত বিশ বছরে এভাবেই আমার ফ্রেমে পরিবর্তন এনেছি। এখন একটা স্টাইলাইজড হয়ে গেছে। যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারে এটা আমার কাজ। রং কখনো ব্রাইট হয়, কখনো মিনিমাইজড হয়। এটাই আমার এক্সপ্রেশন। এটা নিয়ে আমার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই। মাঝখানে আবার পেছন ফিরে কাজ করেছি। আমার প্রথম দিককার কাজের লোক-মোটিফগুলো ক্যানভাসে ছড়িয়ে দিয়েছি। বড় ক্যানভাসে নকশিকাঁথা, শীতলপাটি, লক্ষ্মীসরার বিভিন্ন মোটিফ ছড়িয়ে দিয়েছি। সাদা বা লাল ক্যানভাসে ভিন্ন রকম হয়েছে। ওখান থেকে ফর্মগুলো নিয়ে মডার্ন কম্পোজিশন করেছি। এভাবেই আমার সামনে আসা, আবার ফিরে যাওয়া। এটার ভেতরই আমি আছি। এখান থেকে বেরিয়ে আমি যদি মনে করি আবার অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিংয়ে যাব, সেটা নীতিগতভাবে এটা গ্রহণযোগ্য হবে না। মানুষ এটা পছন্দ করবে না। এটাকেই যদি আমি আরও শক্তিশালী করতে পারি এবং সেটা করেই যেতে হবে। মাঝখানে বেশকিছু ড্রয়িং করেছি। ফ্রি ড্রয়িং। অনেক সময় শুধু পাখি এঁকেছি। হাতি-ঘোড়া এঁকেছি। এভাবেই আমি সামনে এগিয়ে চলেছি।’          

এরই মধ্যে ২১টি একক প্রদর্শনী ছাড়াও বহু দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন শাকুর শাহ্। তিনি ২০০৮ সালে এস এম সুলতান পদক এবং ২০১৪ সালে জাপান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পদকসহ আরও অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৭ নভেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৫:১৮
যোহর১২:০০
আসর৩:৪৪
মাগরিব৫:২৩
এশা৬:৪১
সূর্যোদয় - ৬:৩৯সূর্যাস্ত - ০৫:১৮
পড়ুন