শিশুদের পাশে
১৫ জুন, ২০১৫ ইং
শিশুদের পাশে
 যে বয়সে স্কুলে বসে নিজের ভবিষ্যতের গল্প লেখার কথা সে বয়সে শ্রমিক হয়ে নিজেদের ঠেলে দিচ্ছে নিরাপত্তাহীনতায়। ২০০৩ সাল থেকে প্রতিবছর ১২ জুন ‘শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস’টি পালন হয়ে আসছে। দিনটি স্মরণ করে আমাদের এই আয়োজন। আয়োজনটি সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার, গ্রন্থনায় সাজেদুল ইসলাম শুভ্র, শেখ হাসান হায়দার ও ইশরাত বিনতে আফতাব

 

অভিনেত্রী ববিতা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সংগঠন ডিসট্রেসড চিলড্রেন অ্যান্ড ইনফ্যান্টস ইন্টারন্যাশনালের (ডিসিআই) শুভেচ্ছাদূত হয়েছেন। ডিসিআই আয়োজিত একটি কনফারেন্সে অংশগ্রহণের জন্য ববিতা নিউইয়র্ক যান। সম্মেলনে বাংলাদেশ ও ববিতা সংশ্লিষ্ট মাহফুজুর রহমান খান নির্মিত পাঁচ মিনিট ব্যাপ্তির ‘জেনেসিস অব ববিতা’ প্রদর্শিত হয়। যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান, এ দেশের বিভিন্ন তথ্য এবং ববিতা সম্পর্কে খুব সংক্ষেপে কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়। ‘জেনেসিস অব ববিতা’ প্রদর্শনের পরপরই ববিতা তার বক্তব্য তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের অধিকারবঞ্চিত অসহায় শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। ববিতা বলেন, ‘বাংলাদেশে বহু শিশু আছে যারা তিন বেলা খেতে পায় না, স্কুলে যেতে পারে না। আমি তাদের জন্যই কাজ করতে এসেছি।’ ববিতা তার বাকি জীবন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য উত্সর্গ করারও ঘোষণা দেন।

শুভেচ্ছাদূত হিসেবে তার কাজ কী হবে? ববিতা বললেন, ‘আমাকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাচ্চাদের সাথে কাজ করতে হবে। তাদের বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কথা জানাব। তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে বাংলাদেশের শিশুদের জীবনযাত্রার পার্থক্য তুলে ধরব। তৃতীয় বিশ্বের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সাহায্যার্থে উন্নত দেশের স্কুলের বাচ্চারা তাদের টিফিনের পয়সা পর্যন্ত দান করে। তার পরিমাণও হয় অনেক। সেই তহবিল নিয়ে বাংলাদেশের শিশুদের উন্নয়নের জন্য কাজ করা হবে।’

ববিতা আরও বলেন, ‘১৯৮৯ সালে রোমান হলিডের নায়িকা অড্রে হেপবার্ন ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। ওই সময় তার সঙ্গে আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। আমি তার কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম, তিনি অভিনয় করে যত আনন্দ পান, তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দিত হন মানব সেবা করে। আমার মনেও এ ধরনের ইচ্ছা ছিল। এবার সেই সুযোগ এসেছে।

শিশু অধিকার নিশ্চিত করার জন্য ডিসিআই ‘হলিস্টিক কনসেপ্ট’ অনুসারে কাজ করে, যা ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন নিশ্চিত করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যান্য বিষয় হচ্ছে অন্যান্য দেশের শিশুদের সহায়তা করার জন্য ডিসিআই উত্তর আমেরিকার যুব সমাজকে সংযুক্ত করেছে যা তাদেরকে বিশ্ব মনস্ক ও ভবিষ্যতের নেতা হওয়ার প্রেরণা জোগায়। এই কারণে আমি ডিসিআইকে বিশ্বাস এবং সহায়তা করি।’

চিলড্রেন অ্যান্ড ইনফ্যান্টস ইন্টারন্যাশনালের (ডিসিআই) একটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার বিষয়ক সংস্থা, যা প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৩ সালে। ডিসিআইয়ের লক্ষ্য শিশু অধিকার রক্ষা, শিশু শ্রম বন্ধ এবং পরিবারকে সাহায্য করা; যাতে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পারিবারিক সহায়তা এবং আয়বৃদ্ধির সুযোগ দ্বারা দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হয়ে আসতে পারে। এ ছাড়া ডিসিআই চেষ্টা করে অন্যান্য দেশের কম সুবিধাপ্রাপ্ত শিশুদের সাথে আমেরিকান যুব সমাজের সংযোগ স্থাপন করা, এই চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তাদের শিক্ষা দেওয়া, তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতার উন্নয়ন এবং মানবিক বিষয়ক কর্মকাণ্ডের জন্য নেতৃত্ব হাতে নেওয়ার জন্য তাদের উত্সাহ দেওয়া।

শামসুল আলম বকুল

ডেপুটি ডিরেক্টর-সিআরজি, সেভ দ্য চিল্ড্রেন

 

সেভ দ্য চিল্ড্রেন মূলত একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। যেটি প্রধানত দেশের সুবিধাবঞ্চিত ও নির্যাতিত শিশুদের সহায়তার পাশাপাশি দেশের মানুষকে শিশুর অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে নিরলসভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। এছাড়া শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পারিবারিক নির্যাতন থেকে শিশুদের রক্ষা করার মতো বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির কাজ করে যাচ্ছে তারা।  বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় এদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ দরিদ্র। আর এর ফলেই এদেশের শিশুদের একটি বড় অংশ সরাসরি শ্রমের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, শিশু শ্রমিকরা তাদের পরিবারে প্রায় ২৫ শতাংশ অর্থ সংস্থান করে থাকে। তাই হুট করেই যদি কিছু না ভেবেই আমরা শিশুশ্রম বন্ধের কথা বলি তাহলে এই পরিবারগুলোতে ও সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়বে।

তাই আমরা শিশুশ্রম বন্ধের জন্য একটি দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। শিশুশ্রমকে আমরা ২ ভাগে ভাগ করেছি—ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ও ঝুঁকিহীন কাজ। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদেরকে কোনোভাবেই যেন নিয়োজিত না করা হয় সে ব্যাপারে আমরা জিরো টলারেন্সে কাজ করছি। আর ঝুঁকিহীন কাজের ক্ষেত্রে শিশুদেরকে নিয়োজিত করার পূর্বে যেন বেসিক কিছু বিষয় মানা হয় সে ব্যাপারেও আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে নজর দেওয়া হচ্ছে তা হলো—শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করা, কাজের উপযোগী পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের দিক খেয়াল রাখা এবং ন্যায্য মজুরি যেন পায় তা লক্ষ রাখা। এরপর তাদেরকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন দক্ষতার প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সুবিধা যা তাদের প্রাপ্য তা নিশ্চিত করার কাজ করা জরুরি। এর ফলে একসময় ঝুঁকিহীন কাজেও শিশু শ্রমিকদের সংখ্যা কমতে থাকবে। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো, সেভ দ্য চিল্ড্রেন শিশুশ্রম আইন নিয়েও কাজ করে যাচ্ছে।  আমাদের দেশ উন্নয়নশীল হওয়ায় এবং জনশক্তির এক বড় ক্ষেত্র হাতে থাকায় আমাদের চেষ্টা থাকা উচিত এই জনশক্তিকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার, তা না হলে এই জনশক্তি আমাদের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। তাই দেশের দরিদ্র শিশুদের শুধু শিক্ষা নিশ্চিত করলেই হবে না, তাদেরকে কর্মমুখী শিক্ষা দিতে হবে। যাতে তারা ধীরে ধীরে দক্ষ হয়ে উঠে। সর্বোপরি আমরা শত চেষ্টা, আইন করেও শিশুশ্রম প্রতিরোধ করতে পারব না; যদি না এ বিষয়ে সচেতন হই। আমাদেরকে সচেতন হতে হবে, খেয়াল রাখতে হবে শিশুদের স্বাস্থ্যের দিকে, নিশ্চিত করতে হবে তাদের শিক্ষা।        

শারমিন আফরোজা

আইসিটি, মিডিয়া ও নলেজ ম্যানেজমেন্টের ম্যানেজার, সেভ দ্য চিল্ড্রেন

 

ন্যাশনাল চিল্ড্রেন টাস্কফোর্স বা এনসিটিএফ জাতীয় পর্যায়ের একটি শিশু সংগঠন, যা শিশুদের দ্বারা গঠিত ও পরিচালিত। বাংলাদেশ সরকার এনসিটিএফ গঠনের প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করে ২০০৩-এর সেপ্টেম্বরে এবং এনসিটিএফ কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয় ২০০৫-এর জানুয়ারিতে। যদিও এনসিটিএফ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল যৌন নির্যাতন, বঞ্চনা ও পাচার বিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিবীক্ষণ (মনিটরিং) করার জন্য, কিন্তু পরবর্তীতে এনসিটিএফের ভূমিকা পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে সমগ্র দেশের শিশু অধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, মনিটরিং করা এবং পরবর্তীতে তা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অ্যাডভোকেসি করাই হচ্ছে এনসিটিএফের প্রধান কাজ।

বর্তমানে এনসিটিএফ কাজ করে যাচ্ছে শিশু অধিকার সনদ কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং তার অগ্রগতি কী তা নিয়ে এবং (তৃণমূল, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে) নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং করে। শিশু যৌন নিপীড়ন, শোষণ এবং শিশু পাচারের বিরুদ্ধে সরকারের গৃহীত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং করা, সর্বস্তরে শিশুদের বৈষম্যহীন অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি ও শিশুদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বড়দের সাথে নানা কাজে শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং পলিসি পরিবর্তনে উদ্যোগ গ্রহণ করাসহ শিশু অধিকার বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে দায়িত্বশীল ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গকে শিশু অধিকার পরিস্থিতি বিষয়ে অবগত করার মাধ্যমে এনসিটিএফ নিশ্চিত করছে শিশু অধিকার আর কমিয়ে আনছে শিশু শ্রম, শিশু নির্যাতন।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৫ জুন, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১১:৫৯
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৪৯
এশা৮:১৪
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৪
পড়ুন