দেখা হবে বন্ধু কারণে অকারণে...
শেখ হাসান হায়দার০৮ আগষ্ট, ২০১৬ ইং
দেখা হবে বন্ধু কারণে অকারণে...
বন্ধুত্ব’ শব্দটাই যেন মনের নীল আকাশটায় ডানা মেলে উড়তে থাকা রঙিন ঘুড়ির মতো। শত ব্যস্ততার যান্ত্রিক জীবনের মাঝে যা হঠাত্ বৃষ্টির মতো এক পশলা সুখ এনে দেয়। বয়সটা যার যেমনই হোক, বন্ধুত্বের ছোঁয়ায় যেন আমরা ফিরে পাই ফেলে আসা শৈশব, কৈশোর আর ঝলমলে উচ্ছ্বাসে ভরা তারুণ্যের শক্তি। দলবেঁধে স্কুলে যাওয়া, টিফিন ভাগাভগি করে খাওয়া, খেলার মাঠে গোল্লাছুট, লুকোচুরি, হিং-টিং-ছটসহ আরও কত কী খেলে বেড়ানো; কথায় কথায় আঙুলে আঙুল ঠেকিয়ে ভাব নেওয়া আর আড়ি কাটার সেই দিনগুলোই ছিল ছেলেবেলার বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব সবচেয়ে নিখাদ এক সম্পর্ক, যেখানে নেই কোনো ধরাবাঁধা নিয়মের বেড়াজাল। শুধু আছে আদি-অকৃত্রিম ভালোলাগার আত্মিক টান। শৈশব ঘিরে থাকা সেই বন্ধুগুলোই যেন সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে আপন। ধীরে ধীরে সময়ের পরিবর্তনে শৈশব কাটিয়ে এসে কৈশোরের দিকে পা বাড়ানো কলেজজীবনে দেখা মিলে নতুন কিছু মুখের। চিন্তা-চেতনা, মেধা আর মননে বিকশিত হতে শুরু করা কৈশোরে বন্ধুত্ব ডানা মেলতে শুরু করে ভিন্ন রূপে।

সেই স্কুলের প্রথম দিন ভয়ে সন্ত্রস্থ থাকার সময় হাসিমুখে এগিয়ে এসে যে সব ভয় দূর করে মুহূর্তে আপন করে নিল, সেই বন্ধু কিংবা চলার পথে পরিচয় থেকে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব—সব ক্ষেত্রেই বন্ধুত্ব সবসময় নিঃস্বার্থ। কখনো মনের টানে, কখনোবা প্রাণের ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা এই বন্ধুত্ব যেন আজীবনের। সকল সমস্যার সমাধান এই বন্ধুদের কাছেই তো মিলে। ইংরেজি সাহিত্যের লেখক ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন, ‘কেউ কেউ পুরোহিতের কাছে যায়, কেউ কবিতার কাছে, আমি যাই বন্ধুর কাছে।’

দিন বাড়ে, সময় বাড়ে; পুরানো হয় বন্ধুত্ব, নাকি বলব আরও দৃঢ় হয়! বাবার কাছে বকা খেয়ে-স্কুল পালিয়ে কিংবা মনের অজানা কথা বলার পাত্র এই বন্ধুরাই। বন্ধুত্ব এখানে সাধারণ, নেই তাতে কোনো ছলনা, নেই কোনো লোক দেখানোর প্রবণতা; শুধুই আছে একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোলাগা। আর এজন্যই তো এই সাদামাটা বন্ধুত্ব আমাদের এত প্রিয়। রবীন্দ্রনাথ তার  কবিতা-গানেও সাহিত্য দিয়ে তুলে ধরেছেন বন্ধুত্বের হাজার দিক। তিনি বন্ধুত্বকে দেখেছেন তার মতো করে। ‘বন্ধুত্ব আটপৌরে, ভালোবাসা পোশাকী। বন্ধুত্বের আটপৌরে কাপড়ের দুই-এক জায়গায় ছেঁড়া থাকিলেও চলে, ঈষত্ ময়লা হইলেও হানি নাই, হাঁটুর নীচে না পৌঁছিলেও পরিতে বারণ নাই। গায়ে দিয়া আরাম পাইলেই হইল।’ কত সহজে তিনি বুঝিয়ে দিলেন বন্ধুতে নেই কোনো ভেদাভেদ, নেই জাতি-শ্রেণি।

আমরা যত প্রবীণ হই, বন্ধুত্বের পরিধিটাও যেন তত কমতে থাকে। এককালে যে প্রিয় বন্ধু ছিল, তার খোঁজ নেওয়া হয়ে ওঠে না। ভুলে যাই অনেককে ছোট ছোট অভিমানে। কিন্তু মনের গহীনে তারা ঠিকই একবার হলেও জাগিয়ে দেয় সেই ভালোলাগার স্মৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে চায়ের কাপে বন্ধুদের সঙ্গে সেই ঝড়-তোলা আলাপ কিংবা প্রিয়তমাকে ভালোবাসার কথা বলতে সাহায্য করার সময়ের সেই বন্ধুত্ব সবই যেন চলে যেতে থাকে সময়ের তালে, কখনো নিজেদের ছোট ভুলে, কখনো আবার ভুল বোঝাবুঝিতে। কখনো আবার বন্ধুত্ব নষ্ট হয় মাঝে প্রেম চলে আসায়। বন্ধুকে ভালোবেসে ফেললেও বন্ধু হয়তো ওভাবে ভাবছে না। হুমায়ূন আহমেদ যেমন বলেছিলেন—ছেলে ও মেয়ে বন্ধু হতে পারে, কিন্তু তারা অবশ্যই একে অপরের প্রেমে পড়বে। হয়তো খুবই অল্প সময়ের জন্য অথবা ভুল সময়ে। কিংবা খুবই দেরিতে, আর নাহয় সবসময়ের জন্য। তবে প্রেমে তারা পড়বেই। কিন্তু বন্ধুত্ব তো বন্ধুত্বই। বন্ধুকে বন্ধু ভাবতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করুন। এখানে ছেলে নাকি মেয়ে, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকারই নেই। আর একজন মেয়ে আরেকজন ছেলের ভালো বন্ধু এবং শুধুই বন্ধু হতেই পারে। তবে ভালোবাসা বা প্রেম অন্য বিষয়, মনের বিষয়। ব্যাটে-বলে মিলে গেলে ভালোবাসা হয়েও যেতে পারে! ভালোবাসা থেকে বন্ধুত্ব খুব কমই হয়, কিন্তু বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা হরহামেশাই হতে দেখা যায়। কারণ বন্ধুর সঙ্গে মনের মিলটা যে একটু বেশিই। আবার সেই রবীন্দ্রনাথের উক্তি এনেই বলি, ‘প্রেম মন্দির ও বন্ধুত্ব বাসস্থান। মন্দির হইতে যখন দেবতা চলিয়া যায়, তখন সে আর বাসস্থানের কাজে লাগিতে পারে না, কিন্তু বাসস্থানে দেবতা প্রতিষ্ঠা করা যায়।’ আর আমাদের ছোট এই জীবনে বন্ধুত্বের মতো দামি জিনিস খুব কমই আছে। তাই তো ইগো কিংবা অভিমান যাই থাকুক না কেন, এগুলোকে দূরে ঠেলে কাছে টেনে নিতে হবে বন্ধুকে। বন্ধুত্বে ছোট-বড় কিছু নেই, নেই আত্ম-অহংকারের জায়গা। তাই সবকিছু ভুলে আজই মিটিয়ে ফেলুন বন্ধুর সঙ্গে সকল মান-অভিমান। মিটিয়ে ফেলুন ভুল বোঝাবুঝি, দেখবেন আপনার বন্ধুই আপনাকে আবার সবার আগে আপন করে নেবে। একা একা পথ পাড়ি দেওয়ার চেয়ে বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে এগিয়ে যাওয়াতেই তো জীবনের আনন্দ। তাই কল দিয়ে ফেলুন না আজ সেই বন্ধুকে, যার সঙ্গে স্কুল-কলেজে চষে বেড়াতেন শহর, সময়ের স্রোতে খোঁজ নেওয়া হয় না যার, ছোট কারণে রাগ করে এতদিন কথা বলেননি যার সঙ্গে। কী হবে এত রাগ, এত  অভিমান দিয়ে। দেখুন না আপনার এই সামান্য কথা বলাতেই আপনার বন্ধু আবার কীভাবে বন্ধুত্বের উষ্ণ চাদরে জড়িয়ে নেয় আপনাকে। বেঁচে থাকুক বন্ধুত্ব, বেঁচে থাকুক এই বন্ধুদের স্মৃতি। এবারের বন্ধু দিবসে আমাদের চাওয়া এটুকুই, কারণ—দেখা হবে বন্ধু কারণে আর অকারণে।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৮ আগষ্ট, ২০১৯ ইং
ফজর৪:০৯
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৪০
এশা৭:৫৯
সূর্যোদয় - ৫:৩১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
পড়ুন