বন্ধুত্ব, চিঠি থেকে চ্যাটবক্সে
সাজেদুল ইসলাম শুভ্র০৮ আগষ্ট, ২০১৬ ইং
বন্ধুত্ব, চিঠি থেকে চ্যাটবক্সে
নব্বইয়ের দশকের শেষটাতেও বাড়ির গেট বানাতে হলে তাতে একটা চিঠির বাক্স থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। কাজের চিঠি তো আসবেই, তাতে আসত দূর দেশ-বিদেশের বন্ধুদের চিঠি। ডাকপিয়নদের ব্যস্ততা ছিল ঢের, যেসব বাসায় নিয়মিত চিঠি আসত, সেসব বাসার লোকদের সঙ্গে তো রীতিমতো আত্মীয়তা হয়ে যেত। হলুদ খামে, কখনোবা বিদেশ থেকে আসা সে লাল-নীল ডোরাকাটা ফ্রেমের সাদা খামে উড়ে আসত একখণ্ড কাগজ, শব্দে শব্দে গাঁথা থাকত ভালোবাসা, কখনো ভালোবাসার চেয়েও বেশি কিছু। পত্রমিতালির সে যুগেও নিছক চিঠি পেয়ে আমেরিকা থেকে আমাদের আন্দরকিল্লায় চলে এসেছেন কেউ কেউ, যশোর থেকে কেউ হয়তো চলে গেছেন জোহানেসবার্গে! দেশ-বিদেশের এক হাজার ছেলেমেয়ের নাম-ঠিকানা ও ফোন নম্বরের স্লোগানওয়ালা পত্রমিতালী গাইডের বিজ্ঞাপন বোধ হয় এখনো কালেভদ্রে পত্রিকায় দেখা যায়। প্রযুক্তি এখন মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে এসেছে, জীবনকে গতিময় করছে। হাতে চিঠি লিখে খামে পুরে ডাকঘরে গিয়ে পোস্ট করার দিন ফুরিয়েছে ইন্টারনেট আসার সঙ্গে সঙ্গে। মেইল-টেক্সট চ্যাটের পরে ভয়েস চ্যাটে বাড়ছে যোগাযোগ। ক’বছর আগে থেকে বাংলাদেশে টেলিগ্রাম সেবা বন্ধ হয়ে গেছে। পাপিয়া সরোয়ার কি এখনো গাইবেন—‘নাই টেলিফোন নাইরে পিয়ন, নাইরে টেলিগ্রাম’; কিংবা মাকসুদের ‘আজ তোমার চিঠি যদি না-ই পেলাম, তবে ভেবে নেব ডাকপিয়নের অসুখ হয়েছে’। এসবই গল্প হবে একদিন।

ডাকঘরের এই চিঠির দিন আজ ফুরিয়ে গেছে। সভ্যতার অগ্রযাত্রায় চিঠির বদলে এসেছে কম্পিউটারে ই-মেইল, সেলফোনের ক্ষুদে বার্তা (শর্ট মেসেজ), সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস ‘হোয়াটস অন ইউর মাইন্ড’ বক্সে লেখা। বর্তমানে কুরিয়ার সার্ভিসে যে চিঠি আদান-প্রদান হয়, তার বেশিরভাগই প্রাতিষ্ঠানিক ও অফিসিয়াল। সেদিনের ও আজকের চিঠি সবই চিঠি। তবে কোন চিঠিতে প্রাণের আকুলতা কতটুকু সেটাই প্রশ্ন! বর্তমানে যার কাছে আমরা চিঠি লিখতে চাই, তাকে স্কাইপি বা ভাইবারের মাধ্যমে কম্পিউটারের মনিটরে দেখে কথা বলা যায়। সেল ফোনে সরাসরি কথা বলা যায়। ক্ষুদে বার্তায় অতি সংক্ষেপে জানান দেওয়া যায়। ছোটবেলায় আমরা প্রায় সবাই বাংলা দ্বিতীয় পত্রে ‘চিঠি লিখন’-এ একটা চিঠি প্রায়ই লিখতাম, ‘অমুক দেশে থাকা তোমার পত্রবন্ধুর কাছে নিজের দেশের বর্ণনা দিয়ে চিঠি লিখ’। মনে আছে নিশ্চয়ই আপনাদের? কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই জিনিসটায় একটু বদল আনা উচিত। কারণ তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বন্ধুত্বের ধরনটাই পাল্টে গেছে। এখন বন্ধু মানে ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টের একজন অথবা এসএমএস চ্যাটের একজন পার্টনার। সবকিছু এতই সহজ হয়ে গেছে, একারণেই হয়তো আমাদের কাছে চিঠির মূল্যায়নটাও কমে গেছে। একটা অংশ এরকমই মনে করেন, কারণ এখন এক নিমিষেই যোগাযোগ করা যায় হাজারো বন্ধুর সঙ্গে। পড়াশোনা বা চাকরি করতে গিয়ে, একই এলাকায় থাকলে অনেক সময় বন্ধু তৈরি হয়। কিন্তু বর্তমানে বেশিরভাগ বন্ধু তৈরি হয় ফেসবুকে। তাই ভার্চুয়াল এই বন্ধুদের প্রতি আবেগটাও কেমন যেন কৃত্রিম হয়। ব্যাকরণ বইয়ের পত্রমিতালি এখন আর নেই।

আরেক অংশ মনে করেন, আমাদের বন্ধুত্বটা এখন আরও দৃঢ় হয়েছে। বাংলা ভাষায় একটা কথা আছে যে, ‘দূরত্ব বাড়লে সম্পর্ক কমে’। আর বর্তমানে প্রযুক্তির যুগে দূরত্ব কোনো ব্যাপারই না। আজ পত্রবন্ধু থেকে হয়ে গেছে ফেসবুক ফ্রেন্ড। কিন্তু তাতে কী! বন্ধু তো বন্ধুই। প্রত্যেকেরই উচিত বন্ধুদের সম্মান জানানো; ব্যস্ততা যেন আমাদের বন্ধুদের কাছ থেকে আমাদের দূরে ঠেলে না দেয়, সে ব্যাপারে সচেতন থাকা।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৮ আগষ্ট, ২০১৯ ইং
ফজর৪:০৯
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৪০
এশা৭:৫৯
সূর্যোদয় - ৫:৩১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
পড়ুন