বয়ঃসন্ধিকালের নানা ট্যাবু ভাঙতে মিরাদের প্যাড ব্যাংক
৩০ এপ্রিল, ২০১৮ ইং
বয়ঃসন্ধিকালের নানা ট্যাবু ভাঙতে মিরাদের প্যাড ব্যাংক

আয়েশা আলম প্রান্তি

২৫ এপ্রিল সকাল ৯টা। মিরপুরের ধামালকোট আদর্শ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৭০ জন মেয়ে খুব খুশি। কারণ তাদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন বেশ কিছু আপু। আপুরা তাদের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলে বোঝাচ্ছেন, গল্প করছেন। এই ছোট ছোট ৭০ জন মেয়ে সবাই ধামালকোট স্কুলের সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। বয়ঃসন্ধিকালে পিরিয়ডকালীন নানা সমস্যা নিয়ে কথা বলছেন তাদের দেখতে আসা এই আপুরা। আপুদের কথা শুনে কেউ লজ্জা পাচ্ছে তো কেউ অবাক হয়ে তাকাচ্ছে। কারণ পিরিয়ড নিয়ে কথা বলা আমাদের সমাজে একটি ট্যাবু। আর এই আপুরা সবাই একটি সেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অল ফর ওয়ান’-এর সদস্য। অল ফর ওয়ান হলো কামরুন নেছা মিরার প্রতিষ্ঠা করা একটি সংগঠন, যার উদ্দেশ্য হলো সুবিধাবঞ্চিত স্কুল ছাত্রীদের স্যানিটারি ন্যাপকিন ও মাসিক চলাকালীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা। যারা মাসিক চলাকালীন স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মেয়েদের সামর্থ্য নেই স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার। তাই তারা মাসিক চলাকালীন পুরোনো কাপড় ব্যবহার করে, যেগুলো অস্বাস্থ্যকর, অপরিচ্ছন্ন যা তাদেরকে অসুস্থ করে তোলে। ফাউন্ডার কামরুন নেছা মিরা ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসে মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী।

২৫ এপ্রিল ধামালকোট স্কুলে ক্যাম্পেইনের একটি আকর্ষণীয় ব্যাপার ছিল প্যাড ব্যাংক। স্কুলে তারা রেখে এসেছেন প্যাড ব্যাংক, যাতে পিরিয়ড হলে যেকোনো মেয়ে ওই ব্যাংক থেকে প্যাড নিয়ে তা ব্যবহার করতে পারবে। আর ওই লকারওয়ালা ছোট বেগুনী রঙের বাক্সটি রাখা আছে স্কুলের একজন শিক্ষিকার অধীনে। যিনি জরুরি দরকারে মেয়েদের প্যাড সরবরাহ করবেন। সংগঠনটির সদস্যরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা করেন। এরমধ্যে ছিল কিছু অপ্রচলিত বিষয়, যেগুলো সম্পর্কে সমাজের সবাই চুপ থাকতেই পছন্দ করে আসছে যুগ যুগ ধরে, সেসব বিষয়ে কথা বলা হয়। এছাড়া বয়ঃসন্ধিকালের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন, কাপড় ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক ও স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের উপকারিতা, কীভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করতে হয়, পিরিয়ডকালীন ব্যথা কিভাবে মোকাবিলা করতে হয়, কোন খাবারগুলো খেতে হয় এই সময়ে, হঠাত্ করে স্কুলে পিরিওড হয়ে যাওয়ার বিব্রতভাব থেকে বাঁচতে ক্যালেন্ডারে ২৮ দিন পরপর কিভাবে মার্ক করে রাখতে হয়, বাচ্চাদের পিরিয়ড সংক্রান্ত সমস্যা ও সমাধান বিষয়েও আলোচনা হয়। এছাড়া বোনাস হিসেবে ছিল ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শের মাঝে কী পার্থক্য, কাদের থেকে আমরা বেশিরভাগ সময়ে এ ধরনের ব্যবহার পেয়ে থাকি, আর কেউ এমন করলে কী করা উচিত ইত্যাদি নিয়েও কথা হয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে।

জীবনে হয়তো প্রথমবারের মতো এইসব বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে পেরে ছাত্রীরা অভিভূত হয়েছে। ছাত্রীদের ভালোবাসায় অভিভূত ছিলেন অল ফর ওয়ানের সদস্য জান্নাতুল মাওয়া, হাবিবা বিনতে হাসিন, নিশা হক, কামরুন নেছা মিরা, সুমাইয়া সামিয়া, মনিরা আকতার মনি। ছোট ছোট মেয়েগুলোর জানার কি আগ্রহ! জড়িয়ে ধরে, হ্যান্ডশেক করে, ছবি তুলে বিদায় জানাল তারা সবাইকে। আর বলে দিল, ‘আপনাকে কখনো ভুলব না, আবার আসবেন!’ ছোট সামিয়া জান্নাতুল মাওয়ার হাত ধরে বলল, ‘আপু আপনি আবার কবে আসবেন?’ এ অভিজ্ঞতাটা অসাধারণ ছিল জানালেন মাওয়া।

’পুরো দলটি ক্লাসে থাকা ৭০ জন মেয়ের মাঝে স্যানিটারি প্যাড ও অন্তর্বাস বিনামূল্যে সরবরাহ করেন। এখন থেকে পরবর্তীতে দুই বছর এই মেয়েদের পিরিয়ডকালীন যাবতীয় খরচ আমাদের,’ জানালেন হাবিবা বিনতে হাসিন। সবশেষে কাজটিতে অনেক সাহায্য করার জন্য ধামালকোট স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। মেয়েদের জন্য এই স্বেচ্ছাসেবী মেয়েদের সংগঠন অল ফর ওয়ান প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করেছিল আরও ৪ জন মূল সদস্যের হাত ধরে; যারা হলেন মনিষা কাইসার, জান্নাতুল মাওয়া, হাবিবা বিনতে হাসিন এবং রুদমিলা মর্তুজা। এই সংগঠনটি তার তহবিল সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার দ্বারা। অল ফর ওয়ান একটি অলাভজনক ফাউন্ডেশন, যা দরিদ্র স্কুল মেয়েদের মাসিক স্বাস্থ্যবিধি, পরিচ্ছন্নতা এবং ভালো ও খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে সচেতন করার জন্য কাজ করে। এটি একটি স্পন্সরশিপ স্কিম, যার মাধ্যমে তারা একটি মেয়ে শিশুর দুই বছরের পিরিয়ডকালীন স্যানিটারি প্যাড, অন্তর্বাস সরবরাহ করবে। স্যানিটারি প্যাড, অন্তর্বাস বিনামূল্যে সরবরাহ, মাসিক স্বাস্থ্যবিধি নিয়মিত চিকিত্সক দ্বারা চেকআপ প্রদান ও সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। এখন মিরপুরের ধামালকোট হাই স্কুল থেকে শুরু করে পরবর্তীতে ঢাকার ১৫০টি ও চট্টগ্রামের ১০০টি স্কুল কভার করার ইচ্ছা পোষণ করেন ফাউন্ডার মিরা। তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালের ২৬ মার্চ যখন প্রথম কাজ শুরু করি শুধু নিজের সাহস দিয়ে আর মেয়েদের জন্য কিছু করার ইচ্ছা থেকে। স্বপ্নেও ভাবিনি এত রেসপন্স পাব। এত সাপোর্ট, এত ভালোবাসা আমি সত্যি আনন্দিত।’

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২১ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন