তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও আজকের প্রেক্ষাপট
০৪ জুন, ২০১৮ ইং
তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও আজকের প্রেক্ষাপট
দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গত ১ জুন রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত হয় এক আলোচনা সভা। সরকারি-বেসরকারি ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সভাটির সভাপতিত্ব করেন দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আবুল কাসেম ফজলুল হক। সঞ্চালনা করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস। অনুষ্ঠানে বক্তারা নতুন প্রজন্মকে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার গল্প শোনান ও বাংলাদেশের আবির্ভাবে মানিক মিয়ার অবদানকে স্মরণ করেন। তাদের এই আলোচনা ও  মানিক মিয়া সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের ভাবনাগুলো নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। এটি সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার

গ্রন্থনায় ছাইফুল ইসলাম মাছুম ও দিপু

 

‘মানিক মিয়াকে জানতে হলে তরুণদের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে’

—তাসমিমা হোসেন

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক

 

এদেশের স্বাধীনতার পেছনে যে মানুষগুলো অবিস্মরণীয় ইতিবাচক অবদান রেখে গেছেন তাদের সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হওয়ার মতো নাম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। তার স্বতন্ত্র, মেধা ও মেজাজের দিকগুলো বিবেচনা করলে এদেশে তাকে বিরল আখ্যা দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। মানিক মিয়া কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন, আমাদের তরুণ প্রজন্ম জানে না। ভাষা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে ইত্তেফাক ও মানিক মিয়া ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠা করে এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সাংবাদিকতার একমাত্র ও প্রধান লক্ষ্য হলো গণমানুষের মুক্তির জন্য নিয়োজিত থাকা, ন্যায়ের প্রশ্নে অবিচল থাকা, এই কথা তিনি কাজ করে প্রমাণ করে গেছেন। মানিক মিয়াকে জানতে হলে তরুণ প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানতে হবে। অনেক ইতিহাস বিকৃত হয়েছে, এটা আমাদের ব্যর্থতা। তরুণ প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হবে। জাতি হিসেবে আমাদের অনেক উন্নতি হয়েছে, কিন্তু জ্ঞান অর্জনে ততটা নয়।

 

‘মানিক মিয়া রাজনীতিবিদদের অভিভাবক’

—অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

ইতিহাসবিদ

 

দৃঢ় রাজনৈতিক চেতনা এবং একনিষ্ঠ গণমুখী সাংবাদিকতার জন্য ইতিহাসের পাতায় যে মানুষটির নাম রত্নাক্ষরে লেখা থাকবে, তিনি হলেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। সাংবাদিকতার সূত্রে রাজনীতিসহ বিভিন্ন অঙ্গনে তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। পেয়েছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যও। এমনকি সাংবাদিক মানিক মিয়ার অসামান্য রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় মুগ্ধ হয়েই তাঁর ওপর বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন বিষয়ে নির্ভরশীলও ছিলেন বলে জানা যায়।

স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে রাজনীতি এবং সাংবাদিকতায় তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তিনি সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করেছিলেন উন্নতির হাতিয়ার হিসেবে। তাঁর হাতিয়ার হয়ে উঠছিল ‘দৈনিক ইত্তেফাক’। ‘মুসাফির’ ছদ্মনামে লিখে গিয়েছেন রাজনৈতিক কলাম। সাংবাদিক মানিক মিয়া সরাসরি কখনোই সম্পৃক্ত হননি রাজনীতিতে। তবে সর্বদা পাশেই ছিলেন। ১৯৬১ সালের বঙ্গবন্ধু, কমরেড মানিক সিংহ এবং কমরেড ফরহাদের গোপন সভাটি সম্ভব হয়েছিল মানিক মিয়ার হাত ধরেই। ১৯৬৬ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত সম্মিলিত বিরোধীদলের বৈঠকেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উপস্থিত হওয়ার জন্য রাজি করিয়েছিলেন তিনি। একই বছরে উত্থাপিত ৬ দফা নিয়ে সকলের মিশ্র মনোভাবের বিপরীতে ৬ দফার পক্ষে লিখে গেছেন মানিক মিয়া। পরপর ৬টি সংখ্যায় পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিয়েছেন দফাগুলোর। রাজনীতি এবং সাংবাদিকতায় দৃঢ়তা ও নিষ্ঠা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে এক ক্ষণজন্মার রূপ দেয়। তাঁর এই পরিচিতি তাঁকে তাঁর নামের মতোই রত্নে পরিণত করে। এককথায় বলতে গেলে বলা যায়, মানিক মিয়া মানিক ছিলেন, বাঙালির জন্য রত্ন ছিলেন।

 

‘মানিক মিয়া জাদুকরী লেখায় মানুষকে বদলাতে পেরেছেন।’

 

—অধ্যাপক ড. আবুল কাসেম ফজলুল হক

সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে বুঝতে হলে সঠিক ইতিহাস জানতে হবে। মানিক মিয়া ষাটের দশকে দৈনিক ইত্তেফাকে রাজনৈতিক মঞ্চে মোসাফির নামে কলাম লিখে এদেশের মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করেছেন। মানিক মিয়া এতই দূরদর্শী ছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু যখন ব্যক্তিগতভাবে ’৬৬ সালে ৬ দফা ঘোষণা করেন, তখন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা তা প্রত্যাখ্যান করেন, কিন্তু মানিক মিয়া ৬ দফার মর্ম গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, এজন্য ৬ দফা বিশ্লেষণ করে ইত্তেফাকে একেকদিন এক দফা প্রকাশ করতেন। ফলে ৬ দফা তখন ব্যাপক জনপ্রিয় হয় ও মানুষের মধ্যে জাগরণ তৈরি হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে মানিক মিয়া ও ইত্তেফাকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। সংবাদজগতে মানিক মিয়া ছিলেন একজন সক্রিয় কর্মী। মানিক মিয়ার লেখার ভাষা, বর্ণনা, চিন্তা ও ভিন্নতায় নৈপুণ্য ছিল। তিনি স্বাধীনচিত্তে কাজ করার জন্য আওয়ামী লীগের কোনো পদ গ্রহণ করেননি, কিন্তু তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদদের অভিভাবক। ওই সময়কার কোনো সাংবাদিকতাই নেই বর্তমান যুগে। তাঁর জাদুকরী লেখায় মানুষকে বদলাতে পেরেছেন।

 

‘মানিক মিয়াকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব শুধু ইত্তেফাকের একার নয়, সরকারেরও’

—অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান

অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এদেশের সাংবাদিকতায় মানিক মিয়ার মতো মানুষের আবির্ভাব ঘটেনি আজও। মানিক মিয়ার সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্যই ছিল এদেশের মানুষের মুক্তি। মানিক মিয়া লেখনীর মাধ্যমেই পাকিস্তানি শাষকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। বাঙালি জাতির স্বাধীনতার জন্য লেখনীর মাধ্যমেই এদেশের মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন। রাজনৈতিক দূরদর্শী ও বিচক্ষণ মানিক মিয়া রাজনীতিবিদদের অভিভাবক ছিলেন। তিনি ক্ষমতার রাজনীতি নয়, জনগণের অধিকার আদায়ের রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর প্রতিটি কলামে এদেশের মানুষের মুক্তির কথা ফুটে উঠেছে। গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃত্ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া বাংলাদেশে সাংবাদিকতার জগতে এক প্রবাদপ্রতিম পুরুষ। বঙ্গবন্ধুকে তিনি খুবই স্নেহ করতেন। এদেশের সঠিক ইতিহাস জানতে হলে মানিক মিয়ার লেখা পড়তে হবে। মানিক মিয়াকে জানতে হবে। তিনি রাজনৈতিক নেতাদের যেমন গুরু ছিলেন, তেমনি তত্কালীন সাংবাদিকতায় উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন। মানিক মিয়া মানেই বাংলাদেশ। তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস হয় না। এই গুণী মানুষটিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব শুধু ইত্তেফাকের একার নয়, সরকারেরও।

 

‘সাংবাদিকতার প্রতি সুবিচার করতেই রাজনীতি ছেড়েছেন তিনি’

—ইমরান আহমেদ

শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া বলেছিলেন, ‘গণকল্যাণের রাজনীতি আর ক্ষমতার রাজনীতি এক নয়।’ কথাটির গুরুত্ব আসলে অনেক। বর্তমান সময়ে সবাই আসলে ক্ষমতার রাজনীতি করতে চায়। গণকল্যাণের কথা ভাবে কজন? সবাই চায় নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি বজায় রাখতে। আর এর জন্য যেকোনো কাজ—সেটা নোংরা বা রুচি বহির্ভূত হলেও তারা নির্দ্বিধায় করে ফেলে। তাঁর মতে, রাজনীতি সুনিশ্চিতভাবেই ক্ষমতা লাভের উপায়, কিন্তু উদ্দেশ্য নয়। যাঁরা একে উদ্দেশ্য করে তোলেন, তাঁরা ক্ষমতার রাজনীতি করেন, গণকল্যাণের রাজনীতি করেন না। তিনি বলেছেন, সাংবাদিকতার প্রতি সুবিচার করতে হলে একই সময় সাংবাদিকতায় ও সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা চলে না। তাই তিনি নিজেকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান সময়ের সাংবাদিকদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকতে দেখা যায়। যা আসলে মূল ঘটনার বস্তুনিষ্ঠতা তুলে নিয়ে আসতে দেয় না। তাঁর মতে, দর্জি যদি একজন ভদ্রলোক তৈরি করতে পারে তাহলে একটি দেশও যথার্থ অর্থে তৈরি হয় সাধারণ মানুষের হাতে, অতিমানবের হাতে নয়। তাই সাধারণ মানুষকে পাশ কাটিয়ে যে রাজনীতি তাকে তিনি রাজনীতি বলে গণ্য করেন না। রাজনীতি দোষের কিছু নয়, বরং একটি পবিত্র ব্রত। দেশের এবং দেশের মানুষের হিতাকাঙ্ক্ষা থেকেই এই ব্রত গ্রহণের প্রেরণা জন্মায় প্রাণে। রাজনীতিকে যারা আত্মোন্নতির বা ভাগ্যোন্নতির অবলম্বন বলে ভাবেন, তাদের উচিত ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করা, শিল্প প্রতিষ্ঠা করা, কন্ট্রাক্টরি করা, লাইসেন্স ও পারমিটের জন্য উমেদারি করা; কিন্তু রাজনীতি করা নয়। রাজনীতির একটিমাত্র অপাপবিদ্ধ উদ্দেশ্য—দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণ। এই কল্যাণ সাধনের পথ বিঘ্নসঙ্কুল। দমন ও পীড়নের খড়্গ এ পথে নিত্য উদ্যত। গতানুগতিক বা প্রথাসিদ্ধ রাজনীতি নয়, সত্যিকার রাজনীতির এই বিঘ্নসঙ্কুল পথে যাঁরা অভিযাত্রী, তাঁরা মহাপ্রাণ, তাঁরা শ্রদ্ধেয়। ক্ষুদ্র স্বার্থের বিচারবোধ বা নিশ্চিন্ত পদ্ধতি বুদ্ধির চুলচেরা তর্ক দ্বারা তাঁদের কল্যাণবোধ ও মনুষ্যত্ববোধের পরিমাপ সম্ভব নয়।

 

‘মানিক মিয়া ও ইত্তেফাক বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ’

—সনজিত্ সরকার উজ্জ্বল

সভাপতি, বাংলাদেশ জার্নালিজম স্টুডেন্টস কাউন্সিল

 

মানিক মিয়া ও ইত্তেফাক বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দুই শিষ্য শেখ মুজিব ও মানিক মিয়া ছিলেন মানিক জোড়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং শেখ মুজিবুর রহমানের বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পিছনে সাংবাদিক মানিক মিয়ার অবদান অপরিসীম। জনগণের কথা বলার জন্যই মানিক মিয়া কলম হাতে নিয়েছিলেন। জনগণের ভাষায় তিনি কথা বলতেন। নীতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। সাধারণ মানুষকে পাশ কাটিয়ে যে রাজনীতি, তাকে তিনি রাজনীতি বলে গণ্য করেননি। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের জন্ম ও বিকাশের ধারার সঙ্গে মানিক মিয়ার সম্পর্ক ছিল নিবিড়। শুধু রাজনৈতিক কারণে একজন সাংবাদিক বা সংবাদপত্র সম্পাদক মানিক মিয়ার দীর্ঘ কারাবরণের নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন জাতীয়তাবাদ বিকাশে রাজনৈতিক আন্দোলনের শিল্পী, সবচেয়ে বড় কলমযোদ্ধা। রাজনীতি ও সাংবাদিকতার মধ্যে একটি অনন্য সেতুবন্ধন রচনা করেছিলেন মানিক মিয়া। রাজনীতিকে পবিত্র ব্রত হিসেবে দেখতেন তিনি। গণতন্ত্রের অন্যতম হাতিয়ার মুক্ত গণমাধ্যম। সেই গণতন্ত্রের আদর্শ প্রচারের হাতিয়ার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয় দৈনিক ইত্তেফাক। রাজনৈতিক মঞ্চের কলামিস্ট মোসাফির জাতীয় স্বার্থে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কলম চালিয়েছেন। দলের স্তুতি করেননি। মূলত এমনই ছিল তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার রাজনৈতিক দর্শন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ইশতেহার , ’৫৮-এর আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন এবং বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফার পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পদনায় দৈনিক ইত্তেফাকের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনের নির্ভীকতা ও সততা চর্চা করেছেন আজীবন। জীবনের ন্যায় লেখার মধ্যেও তিনি কোনো দিন মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেননি। মানিক মিয়া ছিলেন কর্মবাদী পুরুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন কাজের মধ্যেই মানুষ বেঁচে থাকে। পদের মাঝে নয়। মানিক মিয়া ছিলেন ঘোর সংসারী ও স্নেহপ্রবণ পিতৃহূদয়ের অধিকারী। মানিক মিয়ার আদর্শকে বুকে ধারণ করে তরুণ সাংবাদিকদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের সেবায় এগিয়ে আসতে হবে। তবেই সাংবাদিক মানিক মিয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।

 

‘স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু, মানিক মিয়া ও ইত্তেফাক একই সরলরেখা’

—শুভ হালদার

চতুর্থ বর্ষ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

সাংবাদিকতা নিয়ে পড়ার প্রবল আগ্রহ নিয়ে ঢাকায় পড়তে আসা এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। সাংবাদিকতা বিভাগে তখন সবেমাত্র ক্লাস শুরু। চোখমুখ ভর্তি উত্সাহ আর উদ্দীপনা। এরকম সময় ‘ইন্ট্রোডাকশন টু জার্নালিজম’ কোর্সে স্যারের প্রশ্ন—বাংলাদেশের কয়েকজন বিখ্যাত সাংবাদিকের নাম বলো। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমরা বর্তমান প্রজন্মের কয়েকজন টিভি তারকা ব্যক্তিত্বের নাম বললাম। কিন্তু স্যার আমাদের ভুল ভাঙিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন কাঙাল হরিনাথ, মওলানা আকরম খাঁ, মানিক মিয়া প্রমুখের সঙ্গে। এই প্রথম মানিক মিয়া তথা তফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়ার নামের সাথে আনুষ্ঠানিক পরিচয়। এর আগে তাঁর নাম জেনেছি কোনো কলেজের নামে কিংবা মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে। কিন্তু সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ার সুবাদে সাংবাদিকতার ইতিহাস ও বাংলাদেশের অভ্যুদয় নিয়ে পড়তে গিয়ে বারবার ফিরে এসেছে মানিক মিয়ার নাম। অরাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল মানিক মিয়ার। সাংবাদিকতা চর্চায় তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ইত্তেফাক। তিনি ইত্তেফাকের পাতায় আপামর বাঙালির কণ্ঠ তুলে ধরেছেন। প্রথমে সোহরাওয়ার্দী এবং পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর ও বাংলার মানুষের হয়ে কাজ করেছেন। ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, চৌষট্টির দাঙ্গা নিবারণে অগ্রজ ভূমিকা রেখেছেন মানিক মিয়া ও তাঁর ইত্তেফাক। যার জের ধরে ইয়াহিয়া সরকার ইত্তেফাক বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীতে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর ইত্তেফাক খুলে দিতে বাধ্য হয়। মানিক মিয়া ঊনসত্তরে মারা গেলেও ইত্তেফাক কাজ করে গেছে বাংলা ও বাঙালির হয়ে। বঙ্গবন্ধু যেকোনো প্রয়োজনে মানিক মিয়ার সাথে আলাপ করতেন ও পরামর্শ নিতেন। তেমনি মানিক মিয়াও বঙ্গবন্ধুর বার্তা পৌঁছে দিতেন বাংলার ঘরে ঘরে। তাই তো স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরুতেই জ্বালিতে দেওয়া হয় ইত্তেফাক অফিস। গণমানুষের হয়ে কাজ করতে গিয়ে মানিক মিয়া জেল খেটেছেন, আরাম-আয়েশের চাকরি ছেড়ে কলম হাতে নিয়েছেন। আর সাংবাদিকতা বিষয়ক কাজ করতে গিয়েই রাওয়ালপিন্ডিতে মারা যান। কিন্তু থেকে যায় তাঁর আদর্শ, তাঁর নৈতিকতা আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আর তাই তো স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু ফিরে ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির নাম দিলেন মানিক মিয়া এভিনিউ। আর আমার কাছে মনে হয় স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু, ইত্তেফাক ও মানিক মিয়া যেন একই সরলরেখায় চলা কোনো বিন্দু।

 

‘নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের

আদর্শ পুরুষ মানিক মিয়া’

—নাজিরুল ইসলাম মামুন

শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

 

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, বাংলার গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃত নির্ভীক সাংবাদিক ও আধুনিক বাংলা সংবাদ পত্রের রূপকার। তিনি বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্যানভাসের সবচেয়ে বড় চিত্রশিল্পী, সবচেয়ে বড় কলমযোদ্ধা। প্রবাদপ্রতিম এই সাংবাদিক দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলা ভাষার সাংবাদিকতাকে আমূলে বদলে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং হতাশা বেদনাকে সরল-সহজ অথচ বলিষ্ঠ ভাষায় তুলে ধরার জাদুকরী ক্ষমতা ছিল। তিনি নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের আদর্শ পুরুষ। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, একদিন সাংবাদিকরা লেখার স্বাধীনতা গণমানুষের স্বাধীনতা ফিরে পাবে। সাংবাদিকরা বাংলার মানুষের স্বপ্ন, অধিকারের কথা, নির্যাতনের কথা লিখবেন। তিনি বিশ্বাস করতেন স্বাধীনতা মানে শুধু নির্দিষ্ট ভূখণ্ড ফিরে পাওয়া নয়; ফিরে পাওয়া নিজের সংস্কৃৃতি, গণমানুষের মৌলিক অধিকার। মানিক মিয়ার রাজনীতি কিংবা সাংবাদিকতার মূল দর্শন ছিল সাংবাদিকতার জন্য রাজনীতি নয়, বরং রাজনীতির জন্য সাংবাদিকতা। সাংবাদিকতার মাধ্যমে নিজেকে সপে দিয়ে আমৃত্যু তিনি নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন অধিকার আদায়ে যুদ্ধের। দৈনিক ইত্তেফাকের পাতায় রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি রঙ্গমঞ্চ ও রাজনৈতিক মঞ্চ নামের কলামে ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে তিনি স্বাধীনতাকামী জনগণকে উজ্জীবিত করেন। দৈনিক ইত্তেফাক ছিল তাঁর সংগ্রামী জীবনের হাতিয়ার। বাঙালির শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃৃতির প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। তিনি অসাম্প্রদায়িক এবং শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক দর্শনের অনুসারী এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সহকর্মী। এদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ব্যক্তি মানিক মিয়া অতিদ্রুতই একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হন। এই যোদ্ধা স্বাধীন বাংলাদেশ দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শে স্বাধীনতার মুখ দেখে বাংলাদেশ। যতদিন সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকতা থাকবে, ততদিন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার নাম চিরস্মরণীয় থাকবে।

 

 

‘মানিক মিয়ার আদর্শ যুগ যুগ ধরে লালন করতে হবে’

—আমিনুর রহমান হূদয়

শিক্ষার্থী,সাংবাদিকতা বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়

 

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া—এই নামটির সাথে আমার পরিচয় ঘটে সপ্তম শ্রেণিতে। তখন দৈনিক ইত্তেফাকসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকা নিয়মিত পড়তাম। পত্রিকা পড়ার কারণেই হয়তোবা এই মানুষটি সম্পর্কে জানতে পেরেছি। আমার বন্ধুুদের অনেকেরই তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া নামটির সাথে পরিচয় নেই। এই মানুষটিকে তারা চিনেও না, তাঁর সম্পর্কে জানেও না। সবাই তো আর আমার মতো পত্রিকা পড়ে না। আর বর্তমান তরুণ প্রজন্মের অনেকেই তো আবার পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখে। তাই তারা অনেক ইতিহাস জানা থেকেও বঞ্চিত। আমার মতে, বর্তমানে ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠতে শুরু করেছে। যে প্রজন্মের তরুণরা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াসহ বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে অবদান রাখা মানুষদের ভুলতে বসেছে। তরুণ প্রজন্মের মাঝে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে আরো নানা উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। মানিক মিয়ার রাজনীতিমনস্ক থাকলেও তিনি কখনোই রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী ছিলেন না। এদেশের গণমুখী প্রতিবাদী সাংবাদিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও রেখে গেছেন তিনি। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য তাঁর অসামান্য অবদানের জন্যও আমাদের তাঁকে স্মরণ করতে হবে। মানিক মিয়ার আদর্শ যুগ যুগ ধরে লালন ও ধারণ করেই আমাদের তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে যেতে হবে।

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৪ জুন, ২০১৯ ইং
ফজর৩:৪৪
যোহর১১:৫৭
আসর৪:৩৭
মাগরিব৬:৪৬
এশা৮:০৯
সূর্যোদয় - ৫:১০সূর্যাস্ত - ০৬:৪১
পড়ুন