ক্রিকেটের বিশ্বায়ন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে
সৈয়দ আশরাফুল হক
ক্রিকেটের বিশ্বায়ন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে
 

চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কী পারবে ক্রিকেটকে সত্যিকারের বিশ্ব-ক্রীড়া করে তুলতে? এসিসির বিদায়ী প্রধান নির্বাহী সৈয়দ আশরাফুল মনে করেন, এই দুই পরাশক্তিকে সম্পৃক্ত করা গেলেই ক্রিকেট রাজনীতির বিকেন্দ্রীকতা এবং ক্রিকেটের সত্যিকারের বিশ্বায়ন সম্ভব।  ১৯৮৩ সালে এশিয়ান ক্রিকেট কনফারেন্স নামে যখন যাত্রা শুরু হলো, তখনও তিনি ছিলেন। আজ ২০১৫ সালে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল নামে এসিসি যখন কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখনও তিনি আছেন এসিসির সঙ্গে।

বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটার, দেশের প্রাজ্ঞ সংগঠক সৈয়দ আশরাফুল হক এই মাসেই শেষ করছেন নিজের এসিসি অধ্যায়। সেই সঙ্গে এসিসিও কার্যক্রম গুটিয়ে নামে মাত্র এক সংগঠনে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে না চাইলেও এসিসির এই প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ, এসিসির সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলেছেন আশরাফুল হক।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতি, এশিয়ার ক্রিকেট রাজনীতি নিয়ে এসিসি প্রধান নির্বাহীর এই অন্তরঙ্গ ও দীর্ঘ সাক্ষাত্কার নিয়েছেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়

এসিসির মূল্যায়ন করতে বসলে কী বলবেন? কতোটা সাফল্য পেয়েছিলেন আপনারা?

শুরুর উদ্দেশ্য তো পুরোটাই সফল ছিলো। প্রথম যাত্রা শুরু করেছিলাম আমরা ১৯৮৩ সালে। তখন আমাদের একত্রিত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিলো, আমরা বিশ্বকাপকে ইংল্যান্ড থেকে বের করতে চাই। সেই সঙ্গে এশিয়ান দলগুলো চিন্তা করলো, জনপ্রিয়তার দিক থেকে তারা যেহেতু ভালো অবস্থায়, তারা একটা প্রেশার গ্রুপ তৈরি করতে চায়। সে জন্যই এশিয়ান ক্রিকেট কনফারেন্স তৈরি হলো। তো সেই প্রথম উদ্দেশ্যে তো আমরা সফল হয়েছিলামই। আমরা ১৯৮৭ সালে বিশ্বকাপ ভারতে আনতে পেরেছিলাম। একটা শক্তিশালী গ্রুপ হিসেবেই এশিয়ান ক্রিকেট দলগুলো পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিলো, আমরা এশিয়া কাপটা শুরু করতে পারলাম।

এশিয়া কাপকে এতো গুরুত্বপূর্ণ কেন বলছেন?

একেবারে যদি বাংলাদেশের দিক থেকে ভাবেন, এশিয়া কাপে বাংলাদেশ নিয়মিত খেলা শুরু করার কারণেই কিন্তু কোনো স্ট্যাটাস পাওয়ার আগেই একটা এক্সপোজার পাওয়া শুরু করলাম আমরা। বাইরের দেশগুলো বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে শুরু করলো। আমি তো বলবো, এটা শেষ বিচারে বাংলাদেশকে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ায়ও দারুণ ভূমিকা রেখেছে। কারণ, এই সময়ে আমরা অনেক আন্তর্জাতিক ম্যাচ এশিয়া কাপে খেলেছি; যা বাকিরা পারেনি।

এসিসির শেষ দিকে মূল ব্যাপারটা তো ছিলো টেস্ট না খেলা দেশগুলোতে ক্রিকেট উন্নয়ন?

হ্যাঁ, সেটাই আসলে বড় ব্যাপার। এটা ঘটলো আসলে ১৯৯৭ সালে জগুদা (জগমোহন ডালমিয়া) যখন আইসিসির প্রেসিডেন্ট হলো, তখন। সে তো আসলে সাড়া ফেলে দিলো। প্রথমবারের মতো ক্রিকেট প্রকৃত অর্থে অনেক টাকা আয় করতে শুরু করলো। প্রথমবারের মতো আইসিসি স্বত্ব্ব বিক্রি করতে শুরু করলো। সেটা অনেক টাকা। আর এই টাকাই এসিসিকে উন্নয়নকাজে হাত লাগানোর সুযোগ করে দিলো।

আইসিসির এই আয় কিভাবে এসিসির উন্নয়ন কাজে এলো?

ডালমিয়া আর এহসান মানি সেটা করলেন। তখন আইসিসিকে মানি ও জগুদা বললেন, ইন্ডিয়াই তো মূল আয়টা এনে দিচ্ছে। সেটা কিন্তু সত্যি কথা। তার বিনিময়ে তখন কিন্তু ইন্ডিয়া বাড়তি কোনো লাভ দাবি করেনি। সব টেস্ট খেলুড়ে দেশ সমান ভাবে আয়টা ভাগ করে নিতো। শুধু ওনারা বললেন, যেহেতু টাকাটা আমরা আয় করে দিচ্ছি, তাই উন্নয়ন বরাদ্দের অর্ধেকটা এশিয়াকে দিতে হবে। তখন আমাদের এশিয়া ক্রিকেট কাউন্সিল রেজিস্ট্রার্ড ভাবে গঠন করার দরকার হলো এবং আমরা উন্নয়ন কাজ শুরু করলাম। একইরকম ২০০৮ সালে এই ধারাবাহিকতাটা ধরে রেখেছিলেন এহসান মানি। উনি তখন লড়াই করে আবারও উন্নয়ন বরাদ্দের অর্ধেকটা এশিয়ায় নিয়ে এসেছিলেন।

সেই উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনায় কী সফল হয়েছেন?

যা লক্ষ্য ছিলো, তার কাছাকাছি গেছি বলে মনে হয়। আপনি ফলাফল দেখলেই বুঝতে পারবেন। গত যে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ হলো, সেখানে এসিসির উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে উঠে আসা চারটি দল মূল পর্বে খেলেছে। এরপর অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে ওয়ানডে বিশ্বকাপে চারটি সহযোগী দেশের দুটিই ছিলো আমাদের কার্যক্রম থেকে উঠে আসা। এই ফলাফলটাই তো আমাদের হয়ে কথা বলে। এর বাইরে আমাদের সবচেয়ে স্বপ্নের জায়গাটা ছিলো চীন।

চীন কী আদৌ ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ হয়ে উঠতো কখনো?

হ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি। চীনকে নিয়ে কাজ করা হলে ২০২০ সালের মধ্যে তারা বিশ্ব ক্রিকেটে শক্তি হিসেবে উঠে আসবে। চীনে অগ্রগতিটা অসাধারণ ছিলো। কিন্তু ২০১২ সাল থেকেই তো আমরা চীনে কাজ করতে পারছি না। শ্রীনিবাসন সাহেব এসে (আইসিসি চেয়ারম্যান পদে) সব থামিয়ে দিলেন। বললেন—চীনের দরকার নেই।

কেন বললেন? শ্রীনিবাসনদের চীন নিয়ে আপত্তিটা ঠিক কোথায়?

কেন বললেন, আমি জানি না। আমি বলতে পারি, ক্রিকেটকে বৈশ্বিক খেলা হতে গেলে আপনার নতুন দর্শক, নতুন অংশগ্রহণকারী এবং নতুন মার্কেটের দরকার। এখন এদের যুক্তি হলো, ক্রিকেট খেলবে দশটা টেস্ট খেলুড়ে দেশ এবং আর বড় জোর গোটা দশ পনের বাইরের দেশ। বাকি দেশগুলোকে তারা বোঝা মনে করেন। তারা কেন এসব জায়গায় টাকা ব্যয় করবেন।

আসলেই কী এই দেশগুলো আইসিসির বোঝা নয়?

তাই কী হয়! এভাবে বোঝা ভাবলে ফুটবল তো এতো দেশে খেলা হতো না। ফুটবল কেন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বাণিজ্য সফল খেলা? কারণ প্রায় দুইশ’ দেশ ফুটবল খেলে। আর আপনি নতুন একটা দেশকে বোঝা না ভেবে, সম্ভাবনা হিসেবে ভাবুন। আমি জোর গলায় বলছি, আপনি চীন আর যুক্তরাষ্ট্রকে সিরিয়াস ক্রিকেটে সম্পৃক্ত করতে পারলে এই অনেক ব্যক্তি বা দেশের যে একক দাপট, তা আর থাকবে না; মার্কেট বিকেন্দ্রীভূত হবে। কারণ এই দুটি দেশ আরও বেশি টাকা আয় করে দেবে আইসিসিকে।

চীন বা যুক্তরাষ্ট্র কী ক্রিকেটে সিরিয়াস হতো কখনো?

অবশ্যই। কেন নয়? একবার অলিম্পিকে ক্রিকেট অন্তর্ভুক্ত হলেই চিত্রটা বদলাতে শুরু করতো। আমরা এশিয়ান গেমসে অংশ নিলাম; চীন কিন্তু খুবই উত্সাহী হয়েছে ক্রিকেটে এই কারণে। যদিও এই শ্রীনিবাসন সাহেব খুবই আপত্তি করেছেন এশিয়ান গেমসের ব্যাপারে। অলিম্পিকের ব্যাপারেও অনেকদূর এগিয়েছিলাম। একবার সেটা করতে পারলে বিশ্বকাপের কথা ভুলে যাও; চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তখন এটা একটা অলিম্পিক গোল্ডের ব্যাপার হতো। একটা গোল্ডের জন্য ওরা কী ইনভেস্ট করতে পারে, সেটা তো সবাই জানে। সেটা সাংঘাতিক একটা ব্যাপার হতে পারতো।

ক্রিকেটে নতুন একটা মেরুকরণ শুরু হয়েছে। আপনার জগুদাদা আবার বিসিসিআই সভাপতি হয়েছেন। তিনি সম্প্রতি আ হ ম মোস্তফা কামাল, হারুন লরগাতের মতো মানুষদের নিয়ে বৈঠকও করেছেন। এই পুরোনো বন্ধুদের উত্থান কী এসিসিকে বাঁচাতে পারে?

কঠিন। দেখুন, দাদার বয়স হয়েছে, শরীরটাও ভালো নেই। ডালমিয়া চান, সিরিয়াসলি চান এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল থাকুক। ইন্ডিয়ার বেশিরভাগ সংগঠকই চান। এই তো আইপিএল ফাইনালের সময়ও দাদা, আমাকে বলছিলেন, ‘তোমাকে নিয়ে আমি হতাশ।’ আমি বললাম—কেন! উনি বললেন, ‘ছিলে তো বাঘ; বেড়াল হয়ে গেলে নাকি? তুমি লড়লে না কেন?’ আমি তখনও বলেছি, আমি চাকরি করি; কর্তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তো লড়াই করা যায় না।

অনেকে মনে করছেন, ডালমিয়াপন্থিরা আবার আইসিসি ক্ষমতায় গেলে এসিসি নতুন চুক্তি পেতে পারে।

হয়তো, হয়তো হতে পারে। আমি জানি না।

এসিসি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিটা কী হচ্ছে? এখন এশিয়ায় উন্নয়ন কার্যক্রমের কী হবে?

আক্ষরিক অর্থেই ক্রিকেটের বিশ্বায়ন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আইসিসি তো বলছে, তারা উন্নয়ন কার্যক্রম চালাবে। সেটা কতোটা চালাবে, আমি সন্দিহান। আইসিসির কর্মকর্তাদের আদৌ সে আগ্রহ আছে কি না, সে পরিকল্পনা আছে কি না; আমি জানি না। করলে ভালো। তবে আমার সন্দেহ আছে।

কোনো আফসোস নিয়ে শেষ করছেন, এই এসিসি-অভিযান?

আমার একটাই আফসোস, আমি চীন নিয়ে যে পরিকল্পনা করেছিলাম, তা করতে পারলাম না।

একসময় এশিয়ার দেশগুলোতে দৌড়েছিলেন এসিসি তৈরি করার জন্য। আজ দৌড়াচ্ছেন কার্যক্রম গোটানোর জন্য। ব্যক্তিগতভাবে কতোটা বেদনাদায়ক এটা?

খুবই খারাপ লাগছে। এটা বলে বোঝানো কঠিন। এসিসির একেবারে জন্মের দিনটা থেকে সঙ্গে ছিলাম। শুরুতে জয়েন্ট সেক্রেটারি, তারপর সেক্রেটারি। আর শেষ অবদি প্রধান নির্বাহী ছিলাম। একটা দিনের জন্য এসিসির সঙ্গে আমার সম্পর্কে বিরতি ছিলো না। সেই এসিসি গুটিয়ে আনার প্রক্রিয়াটা আমার জন্য খুবই বেদনাদায়ক।

কী পেলেন এই তিন দশকের আন্তর্জাতিক সংগঠকের ভূমিকায়?

অনেক অনেক বন্ধু। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আমার ক্রিকেট দুনিয়া জুড়ে অনেক বন্ধু পাওয়া। আমি এখন পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে গিয়ে সত্যিকার অর্থেই কাউকে ‘বন্ধু’ বলে ডাক দিতে পারি। কিছু কাজ করতে পেরেছি, ক্রিকেটের উন্নয়নে অংশীদার হতে পেরেছি, এটা বড় পাওয়া। অন্তত কিছুটা তৃপ্তি বলতে পারেন।

এখন ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা কী? নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ আছে?

আপাতত বিশ্রাম নিতে চাই। লম্বা সময় ধরে ছুটেই তো চললাম। কয়েকটা মাস একেবারে বিশ্রাম নেবো। তারপর দেখা যাক। এখন দেশে একটু বেশি সময় কাটাতে পারবো।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩১ মে, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩৬
মাগরিব৬:৪৪
এশা৮:০৭
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৯
পড়ুন