ছাত্র রাজনীতির হালচাল
২৪ নভেম্বর, ২০১৪ ইং
আলোকপাত

প্রফেসর ডা. মো. ফজলুল হক

দেশ ও দেশের মানুষকে মন থেকে ভালবেসে রাজনীতি করার মানসিকতা আজ অনেকের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া কঠিন। সমগ্র দেশব্যাপী কতিপয় ছাত্রের মারামারি, হানাহানি ও অনৈতিক কাজের জন্য ছাত্রদের অভিভাবকসহ সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষ চিন্তিত ও শংকিত। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তখন বিভিন্ন সংগঠনের নামে সে দলের দিকে ঝুঁকে পড়ে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষীমহল। দলের দোহাই দিয়ে অনৈতিক, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ইত্যাদি দ্বারা পকেট ভারি করতে থাকে।

রাজনীতিতে ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু কতিপয় ছাত্র নেতার অনৈতিক কার্যকলাপ ও অন্তর্দ্বন্দ্ব ছাত্র রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ছাত্রলীগকে সতর্ক করে বলেন ক্যাম্পাসে কেউ ছাত্রলীগের নামে সন্ত্রাস করলে বিশৃংখলা করলে তাদের পুলিশের ধরিয়ে দিতে হবে। এটি একটি আশার আলোও বটে। সজীব ওয়াজেদ জয় দৃঢ়তার সাথে বলেন, যখন দল ক্ষমতায় থাকে, তখন সবাই ছাত্রলীগ আর আওয়ামী লীগের হয়ে যায়। নিজেদের দুর্নীতি ও লাভের জন্য আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালাতে থাকে। সাধারণ মানুষের বক্তব্য হলো দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত তাদের ভূমিকা ভাল ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা উত্তর ছাত্রলীগ বা ছাত্রদলের ভূমিকা প্রশ্নাতীত নয়। শিবির আরও ক্ষতিকারক দল। বিশ্বের অনেক দেশেই ছাত্র রাজনীতি নেই, সেদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লেখাপড়া ও গবেষণার কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশেও কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নেই, তাই সেখানে সমস্যাও নেই। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি না থাকার কারণে সেখানে শিক্ষা কার্যক্রম যথারীতি চলছে। একাডেমিক নিয়ম-কানুন যথাযথ ভাবে চলছে। ছাত্র রাজনীতির নামে অন্তর্কলহ কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়। তিনি আরও বলেন, আমরা যদি সত্ থাকি, তবে চিন্তার কোন কারণ নেই। কেউ সঠিক শিক্ষা নিলে তার দুর্নীতি বা চাঁদাবাজি করার দরকার হয় না। আগামী ১ ডিসেম্বর হতে ৭ ডিসেম্বর সারা দেশে ক্লিন এন্ড সেইফ ক্যাম্পাস কর্মসূচি পরিচালনার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্য দেয়ার জন্য জয়কে ধন্যবাদ।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের রাজনীতির কোন ধারণা নেই, কারণ বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় রাজনীতির ইতিহাস, রাজনীতিবিদদের জীবনীও তারা পড়ে না। তাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতাদের কাছ থেকে রাজনীতির ট্রেনিং নিয়ে রাজনীতি করা প্রয়োজন। কারণ ছাত্র রাজনীতি ছাত্রদের নিয়েই। কিন্তু নিজের পকেট ভারি করার জন্য দল চালানোর কথা বলে ছাত্রদের নিকট হতে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলেই বিবেচিত। তারা ছাত্র রাজনীতির দোহাই দিয়ে যখন রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করবে, তখনও দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ ও জনগণকে হয়রানি ছাড়া আর কি করতে পারবে। বর্তমানে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ব্যক্তি স্বার্থ নিয়ে, ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে। ক্ষমতায় গিয়ে বড় রাজনীতিবিদ হবেন এ চিন্তার মানুষ খুবই কম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া ছাত্রলীগের ভূমিকা ইতিহাস হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর জীবনী না পড়ে রাজনীতি যারা করেন তারা সত্যিকারের দেশ প্রেমিক রাজনীতিবিদ হতে পারবেন না। সত্যের উপর টিকে থাকতে পারবেন না। বঙ্গবন্ধু মানুষকে সাহায্য করতেন। ছাত্রজীবনেই তার সম্বন্ধে অনেক কিছু জানার সৌভাগ্য হয়েছিল। আমার বড় ভাই ফরিদপুর-৪ আসনের এমপি ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর অনেক ঘটনাই বলতেন। গরীব মানুষকে গোলার ধান বিলি করে দিতেন, নতুন কোন জামা পরে স্কুলে যেয়ে গরীব ছাত্রদের গায়ে পরিয়ে দিয়ে বলতেন এটি তোমাকে মানাচ্ছে ভাল, তুমি এটি ব্যবহার কর। ১৯৭২ সালে গণভবনে দেখা করতে গেলে প্রথমেই আমার নাম জিজ্ঞাসা করে বলেন, নকল করো না। দেশ গড়তে হবে। এমনি শত শত ঘটনা আছে যা থেকে একজন নবীন রাজনীতিবিদের শিক্ষার অনেক কিছুই আছে। বঙ্গবন্ধু ছাত্র রাজনীতি করতেন, শিক্ষকের সাথে ছাত্র শিক্ষকের মর্যাদাও ঠিক রাখতেন। ব্যক্তিস্বার্থে বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থে কখনও ধ্বংসাত্মক কাজে কাহাকেও উদ্বুদ্ধ করতেন না। বর্তমানের রাজনীতির ভাষা, প্রতিবাদের ভাষা, অগ্নিসংযোগ, মানুষ হত্যা। এ অবস্থান থেকে বের হতে হবে। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা তেমনই।

ছাত্র রাজনীতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ছাত্র হয়েও ছাত্রদের কাছ থেকে হলে সিটের ব্যবস্থার কথা বলে চাঁদা তুলে পকেট ভারি করা অন্যায়। চাঁদা না দিলেই বিপদ, হলের সিট বাতিল ও শারীরিক লাঞ্ছনা, বিল্ডিং তৈরিতে চাঁদা, কেন্দ্রীয় মসজিদের বারান্দা সমপ্রসারণ কাজে চাঁদা, যোগ্যতাবলে শিক্ষক নিয়োগের পরও চাঁদা না দিলে রাজাকার নাম বসিয়ে অসম্মান করতেও এখন দ্বিধাবোধ করছে না কেউ কেউ হাবিপ্রবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র প্রফেসরকে (যিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা) অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তাকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। তারা কারা? এরা কি সত্যিকারের ছাত্রলীগ না অন্য কেউ? তাছাড়াও ছাত্র শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও এদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছেন। শিক্ষকের কাছ থেকে ছিনতাই করা হচ্ছে নগদ টাকা। এর নাম আর যাই হোক ছাত্র রাজনীতি না, হতে পারে না। ইদানিং কোন কোন ক্যাম্পাসে দেখা যাচ্ছে ভাড়াটে লোকের আনাগোনা যেটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আরও মারাত্মক। ঐ ছাত্রনেতারা ৫ বছরের শিক্ষাজীবনকে ১২ বছরে রূপ দিয়ে কোটি টাকার সম্পদশালী হয়েছে এমন নজির ভূরি ভূরি। ছাত্র বয়সে এরা টাকা খরচ করে শিক্ষকদের বিরুদ্ধাচারণ করছে। সাধারণ ছাত্র/ছাত্রীদের মিছিল মিটিং এ ধরে রাখতে প্যাকেট লাঞ্চ করানো হচ্ছে। এ কারণে অনেকে হল ত্যাগ করেছে। পরীক্ষার্থীদের ফাইনাল সেমিস্টার পরীক্ষাকে ভয় ভীতি দেখিয়ে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। শিক্ষকরা তাদের ক্লাশে ফিরিয়ে আনতে ছাত্রদের অনুরোধ জানিয়েও ব্যর্থ হচ্ছেন। নিষ্পাপ ছাত্রদের জীবনের মূল্য অনেক। একটি দিনের কারণেও অনেকের জীবন থেকে ঝরে পড়তে পারে লোভনীয় চাকরির সুযোগ। এর জন্য দায়ী ঐ সকল ছাত্রনেতা যারা ডিজিটাল সন্ত্রাস চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমকে অচল করে দিতে চায়। তাদের প্রতিবাদে সকলকে ও সবখানে সোচ্চার হতে হবে।

শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক মধূর। ছাত্র সন্তান সমতুল্য। তারা লেখাপড়া করে ভালভাবে প্রতিষ্ঠিত হোক এটাই সকল শিক্ষকের একান্ত চাওয়া-পাওয়া। ছাত্ররা শিক্ষকদের ঋণ কোন দিন শোধ করতে পারবে না। শিক্ষকরাও চায় না কোন ছাত্র জীবনে ক্ষতিগ্রস্ত হোক। যখন শুনি এক ছাত্র ভাল পজিশনে আছে। গর্ব হয়। এটাই একজন শিক্ষকের মনের অনুভুতি। শিক্ষক কোন দিনই ছাত্রদের  প্রতিপক্ষ নয়, বরং সন্তানতুল্য। এটি শুধু শিক্ষকরাই ভাবলে হবে না, ছাত্রদেরকেও ভাবতে হবে। এজন্য সুস্থ ছাত্র রাজনীতি চাই। এমন রাজনীতি নয় যার নামে দেশে সন্ত্রাসী তৈরি করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দরজা জানালা ভাঙা হবে, গাড়ি ভাঙা হবে বা গাড়ির চাকা পাংচার করে যাতায়াতের পথকে রুদ্ধ করা হবে। আজ সরকারও এসব ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতির উপর অবিচল। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য থেকে বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে, আইন সবার জন্য সমান। অন্যায়কারীকে শাস্তি পেতেই হবে।

লেখক :শিক্ষক, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও

প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৪ নভেম্বর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৯
যোহর১১:৪৫
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩০
সূর্যোদয় - ৬:১৮সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
পড়ুন