আমাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি
৩০ এপ্রিল, ২০১৫ ইং
আমাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি
সংস্কৃতি g আবুল কাসেম ফজলুল হক

‘আমাদের’ বলতে আমি ‘বাংলাদেশের জনগণ’ বুঝাচ্ছি। রাষ্ট্রীয় ভিন্নতার কারণে পশ্চিম বাংলার জনগণকে আমি এই বিবেচনার বাইরে রাখছি। তবে মনে রাখতে হবে, অতীতে বিভিন্ন সময়ে আমাদের রাষ্ট্রের পরিসর বিভিন্ন রকম ছিল। রাষ্ট্রের সীমা অতিক্রম করে ছিল বাংলাভাষার ব্যাপ্তি ও নানা জনের কর্মকাণ্ড। রাষ্ট্রীয় অবস্থা যা-ই হোক, বাংলাভাষা গোটা ভূভাগ জুড়ে বাংলাভাষা সৃষ্টির পূর্ব থেকেই মানুষের মধ্যে ছিল নানা রকম যোগাযোগ ও আদান প্রদান। ক্রমে এই ভূভাগের জনগণের যাতায়াত এবং ভাবগত ও বস্তুগত আদান-প্রদান গোটা ভারতবর্ষব্যাপী বিস্তৃত হয়। ভৌগোলিক বাস্তবতার ওপর গড়ে ওঠে জনজীবনের আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। বিকাশশীল প্রকৃতির ওপর বিকাশমান আছে মানুষের সৃষ্টি। সেজন্য আমাদের সংস্কৃতি বিষয়ক আলোচনায় গোটা বাংলাভাষী ভূভাগের ও ভারতবর্ষের নানা কথা আসা স্বাভাবিক। তাছাড়া আরো নানা দেশের নানা বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।

সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে মানুষের সার্বিক জীবনপ্রয়াস তথা সকল মানবীয় কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে ভালো হাওয়ার ও ভালো করার, সুন্দর হওয়ার ও সুন্দর করার এবং অগ্রগতির প্রয়াসের মধ্যেই নিহিত থাকে মানুষের সংস্কৃতি। সংস্কৃতি ব্যক্তিগত জীবনের ব্যাপার যেমন, তেমনি সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনেরও ব্যাপার। জাতিগঠন ও রাষ্ট্রগঠনের সাধনা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, সেই থেকে দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও শিল্পকলা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মানুষ তার সাংস্কৃতিক সামর্থ্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। প্রতিটি জাতীয় সংস্কৃতিই বিকাশশীল, কোনোটিই এক অবস্থায় থাকে না। আমাদের সংস্কৃতির বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রকম ছিল। পাকিস্তান আমলে, ব্রিটিশ আমলে, নবাবি আমলে, পাঠান সুলতানদের আমলে, তুর্কি শাসকদের আমলে, সেন রাজাদের আমলে, পাল রাজাদের আমলে এবং তারও আগে আমাদের সংস্কৃতি বিভিন্ন রকম ছিল। এই ইতিহাস সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে এবং অজ্ঞতার কারণে এবং হীন স্বার্থে মিথ্যাশ্রয়ী হওয়ার কারণে নানা বিভ্রান্তি ও বিতর্কের মধ্যে পড়ে আছি আমরা। দলীয় স্বার্থ ও কায়েমি স্বার্থ যখন জাতীয় স্বার্থের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, দলীয় বিবেচনা যখন ন্যায়-সত্য-সুন্দরকে অগ্রাহ্য করে তখনই অন্ধকার যুগের অবস্থা সৃষ্টি হয়।

আমাদের জানা দরকার যে, বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের আগেও বখতিয়ার খিলজির লক্ষণাবতি দখলের আগেও, জনপ্রবাহ ছিল, জীবনধারা ছিল এবং জনগণের মধ্যে জৈন, বৌদ্ধ, শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব ইত্যাদি ধর্ম ছিল। তখনো সর্ববঙ্গীয় বা সর্বভারতীয় হিন্দুধর্ম গড়ে ওঠেনি। বাংলার ওইসব ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়েই ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছে। বৌদ্ধধর্ম থেকে প্রায় সবাই ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছে। যারা মুসলমান হয়েছে তাদের মুসলমান হওয়ার আগের বংশানুক্রমিক ইতিহাস আছে। পরবর্তীকালের ঘটনাপ্রবাহের ওপর পূর্ববর্তী কালের ঘটনাপ্রবাহের প্রভাবও আছে।

বাংলায় ইসলাম প্রচারের ও মুসলমান সমাজ গড়ে ওঠার জটিল ইতিহাস আছে। মুসলমান সমাজের ভেতরে বাইরে কালে কালে নানা পরিবর্তন ঘটেছে। ব্রিটিশ পূর্বকালে, ব্রিটিশ শাসনকালে এবং উত্তরকালে বৈষয়িক জীবন, সামাজিক জীবন, শিক্ষাদীক্ষা, আচার-আচরণ ও আশা-আকাঙ্ক্ষা এক রকম থাকেনি। আর্থ-সামাজিক রাষ্ট্রিক ব্যবস্থাও পরিবর্তিত হয়েছে। বখতিয়ারের আগেকার জৈন, বৌদ্ধ, শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব ইত্যাদি ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস বাদ দিয়ে আমাদের ইতিহাস অপূর্ণ। পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, সাভার-ধামরাই, বিক্রমপুর, ময়নামতি-লালমাই, চান্দিনা, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম অবধি বিভিন্ন স্থানে বৌদ্ধযুগের যেসব প্রত্ননিদর্শন আজো অস্তিমান আছে, সেগুলোকে কেন্দ্র করে যে ইতিহাস, যে সভ্যতা, যে সংস্কৃতি, তাকে বাদ দিয়ে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃৃতির কথা বলা আমাদের পক্ষে মারাত্মক ভুল। আমাদেরই পূর্বপুরুষের কৃতি ও কীর্তি সেগুলো। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে কেবল আরব-ইরানের কিছু বিষয়কে ধরলে এবং বাংলার ইতিহাসের আদিপর্বকে বাদ দিলে আমরা ছিন্নমূল হয়ে যাই। প্রকৃত তথ্য এই যে বাংলাভাষার দেশে জনগণের সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে মুসলমানদের আগমনের, ইসলাম প্রচারের আগে—সুফিদের ইসলাম প্রচারের ও বখতিয়ার খিলজির রাজত্ব প্রতিষ্ঠার অনেক আগে।

বাংলাভাষার ভূভাগে আর্যপ্রভাব বিস্তৃত হয় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ/পঞ্চম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় চতুর্থ/পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যে। পশ্চিম ও উত্তর ভারত আর্য-উপনিবেশে পরিণত হতে থাকে খ্রিস্টপূর্ব অন্তত দেড় হাজার বছর আগে থেকে। আর্যেরা ভারতে আসে পশ্চিমের গিরিপথ দিয়ে, স্থানীয় প্রতিরোধ মোকাবিলা করে, বিজয়ী রূপে। আর্য প্রভাব পশ্চিম ও উত্তর ভারত থেকে ক্রমে পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে বিস্তৃত হয়েছে। আসাম, মেঘালয়, অরুণাচল, মনিপুর, আগরতলা, নাগাল্যান্ড, মিজোরামে মধ্যযুগ পর্যন্ত আর্যপ্রভাব প্রায় বিস্তৃত হয়নি। বাংলাভাষী ভূভাগে জনগণের জীবনযাত্রা প্রণালি ও জীবনধারা স্পষ্ট রূপ নিয়েছে আর্যপ্রভাব বিস্তৃত হওয়ার আগেই। সংস্কৃতিভাষায়, নৃতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে এর প্রমাণ আছে। আর্যপ্রভাব বিস্তৃত হওয়ার আগেই এই ভূভাগে কথা বলার ও লেখার ভাষা, কৃষিনির্ভর জীবনধারা, বিবাহ ও পরিবারজীবন, খাওয়া-পরার রীতি, ভালোমন্দ সম্পর্কে ধারণা যোগসাধনা, কর্মবাদ, পরজীবনের মধ্যে আর্যভাষা, আর্য ভাবধারা, আর্য রীতি-নীতি ও আর্যধর্মকে গ্রহণ করে—সংশ্লেষণের মধ্য দিয়ে। বহিরাগত আর্যভাষীরাও আদিবাসীদের সংস্কৃতি থেকে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছে।

যুগ-যুগান্তর ধরে আমাদের সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে পর্যায়ক্রমে বহিরাগত আর্যপ্রভাব, বহিরাগত মুসলিমপ্রভাব ও বহিরাগত ইউরোপীয় প্রভাব গ্রহণ করে। যুগে যুগে বৈদেশিক ধর্ম, আদর্শ, জ্ঞান, বিজ্ঞান, ভাষা ও আচরণ থেকে নানা উপাদানকে নিজের মধ্যে সমন্বিত করে বাঙালি তার স্বকীয় সত্তাকে সমৃদ্ধ করেছে। আবার স্বাধীনতা হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে।

মানবজাতির নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কালো মানুষ (প্রধানত আফ্রিকায়), হলদে মানুষ (প্রধানত জাপান, চীন, কোরিয়া ও ইন্দোচীনের) ও সাদা মানুষ প্রধানত ইউরোপের—এই তিন বৃহত্ মানবগোষ্ঠীর লোকদের নানারকম মিলন-মিশ্রণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ভূভাগের নানা জনগোষ্ঠী বা এথনিক গ্রুপ। বাংলাদেশের জনগণ এই তিন বৃহত্ মানবগোষ্ঠীর কোনোটির মধ্যেই পড়ে না। স্মরণাতীত কাল থেকে এদেশে মূলত দুটি বৃহত্ মানবগোষ্ঠীর লোক বসবাস করে আসছে—কালো মানুষ ও হলদে মানুষ। রামায়ণ মহাভারতে নিষাদ (কালো মানুষ) ও কিরাত (হলদে মানুষ) জনগোষ্ঠীর উল্লেখ আছে। বাংলার জনপ্রবাহে সাদা মানুষদেরও সামান্য মিশ্রণ পরে ঘটেছে—যাকে বলা যায় সমুদ্রে বারিবিন্দুবত্। বাংলার জনগণের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য যাঁরা সন্ধান করেছেন তাঁরা সকলেই এই জনগোষ্ঠীকে মিশ্র বা সঙ্কর বলে অভিহিত করেছেন। এই মিশ্রতা বা সাঙ্কর্য হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার মধ্যেই আছে। এই মিশ্রতা নগণ্য প্রান্তিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে। প্রান্তিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ নিজেদের ভাষার সঙ্গে বাংলাভাষাও গ্রহণ করছে এবং বৃহত্ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধুনিক শিক্ষাদীক্ষা গ্রহণে এগিয়ে চলছে। তাদেরকে চিরদিনের জন্য আদিবাসী করে রাখা অন্যায়।

এসব কিছুর বিবেচনাই আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বা আমাদের সংস্কৃতির ভিত্তি বিবেচনার সময় সামনে আছে। আমরা এবারের কোনোটিকেই বিবেচনা থেকে বাদ দিতে পারি না। পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্কীর্ণতা, গোঁড়ামি ও জেদাজেদির ফলে জনগণের জন্য ক্ষতিকর হচ্ছে। ঐতিহাসিক ঘটনাবলী যেভাবে ঘটেছে, সেভাবে সেগুলোকে ধরে নিয়েই আমাদের সংস্কৃতির ভিত্তি স্থির করতে হবে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সম্প্রীতি ও সর্বজনীন কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা কাম্য।

পৃথিবীর যেকোন উন্নত জাতির মতোই আমাদেরও আছে প্রাক-ইতিহাস (Prehistory), আদি ইতিহাস (Protohistory) ও ইতিহাস। তাতে বিধৃত আছে আমাদের প্রবহমান সংস্কৃতির ধারা-উপধারা ও জনজীবনের গতিময় উত্থান-পতন।

আমাদের নবউত্থানে সবচেয়ে সহায়ক হবে ব্রিটিশ-শাসিত বাংলার শ্রেষ্ঠ মনীষীদের এবং ইউরোপের চৌদ্দ শতক থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত কালের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের প্রগতিশীল চিন্তাধারা। তাঁদের চিন্তাধারা আমাদেরকে উন্নততর নতুন সৃষ্টিতে অনুপ্রাণিত করবে। সার্বিক উত্থানে যাঁরা কামনা করেন তাঁদের অবলম্বন করতে হবে অতীতের ও বর্তমানের ভালো সবকিছুর প্রতি সংশ্লেষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। ক্লাসিকের চর্চার মধ্য দিয়ে প্রয়াসপর হতে হবে নতুন রেনেসাঁস ও নতুন ক্লাসিক সৃষ্টিতে, তারপর নতুন গণজাগরণ। গণজাগরণ সৃষ্টির জন্য দূরদর্শী প্রচেষ্টা দরকার হয়। গণজাগরণ ও হুজুগ এক নয়। অতীতের রেনেসাঁস ও ক্লাসিকের চর্চা নতুন কালের নতুন রেনেসাঁস ও ক্লাসিক সৃষ্টির জন্য প্রেরণাদায়ক হবে। আগেকার রেনেসাঁসের লক্ষ্য ছিল মধ্যযুগের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মুক্তি, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ, শিল্প-প্রযুক্তি ভিত্তিক নতুন অর্থনীতির বিকাশ এবং গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদি আদর্শ অবলম্বন করে উন্নত নতুন ভবিষ্যত্ সৃষ্টি করা। আসন্ন নতুন কালের নতুন রেনেসাঁসের লক্ষ্য হবে আধুনিক যুগের বদ্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার, অন্যায়-অবিচার এবং গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র জাতীয়তাবাদ আন্তর্জাতিকতাবাদের নামে যুদ্ধ, সংঘাত-সংঘর্ষ, বঞ্চনা-প্রতারণা ইত্যাদি থেকে মুক্তি এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার দ্বারা মানবজাতির উন্নত ভবিষ্যত্ সৃষ্টি।

আমাদের উন্নত ভবিষ্যত্ সৃষ্টির জন্য আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বা সাংস্কৃতিক ভিত্তি সম্পর্কে সঠিক ধারণা অবলম্বন করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রচলিত বিতর্কের অবসান ও সত্যনিষ্ঠা দরকার।

n লেখক : সমাজচিন্তক, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২০ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন