ইরান ও পারমাণবিক চুক্তির নির্মাণকাঠামো
৩০ এপ্রিল, ২০১৫ ইং
আন্তর্জাতিক g নাদিরা মজুমদার

প্রলম্বিত লম্বা টানা আলোচনার পরে ২ এপ্রিল (২০১৫) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য প্লাস জার্মানি (৫+১) ইরানের সঙ্গে, সঠিক অর্থে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি পারমাণবিক প্রজেক্ট বিষয়ে ইরানের সঙ্গে নির্মাণকাঠামোগত (ফ্রেমওয়ার্ক) চুক্তি রফায় আসে। সবকিছু ঠিকঠাক মতো চললে, জুনের ৩০ তারিখে চূড়ান্ত দলিলের সই-সাবুদ হবে। ফলে কয়েক দশক ধরে ঝুলে থাকা ‘ইলিউসিভ ইরানি বোমা’ অধ্যায়ের ইতি ঘটবে এবং নিষেধাজ্ঞার কড়া প্যাঁচে বিপর্যস্ত ‘সমাজচ্যুত’ ইরান পুনর্বাসিত হবে।

ইরানি বোমার ইতিহাস এরকম: ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লব ঘটার পরেও ইসরাইল গোপনে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছে, ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় অস্ত্রশস্ত্রও দিয়েছে ইরানকে। সম্পর্ক বেশ ভালোই। কিন্তু ১৯৯২ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিবি নেতানিয়াহু সংসদে প্রথমবারের মতো বলেন যে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মাথায় ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে সক্ষম হচ্ছে এবং ইরান তাই ইসরাইলী অস্তিত্ব বজায় রাখার বিরুদ্ধে নতুন এক হুমকি। এই সতর্কবাণীটি খুব গুরুত্ব পায়, ইরান দ্রুত “দুর্বৃত্ত” রাষ্ট্রের পরিচয় পায়। এবং নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, ইইউসহ মিত্ররা বিভিন্ন সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং দফে দফে বলা হতে থাকে যে, যে কোনো মুহূর্তে  - কয়েকমাস থেকে কয়েক বছরের মধ্যে, ইরান পারমাণবিক বোমা-দক্ষতা অর্জন করছে। কোনো পারমাণবিক বোমা কোনোদিনই অবশ্য ভূমিষ্ঠ হয়নি।  

ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিটি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সরকারি স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, পারস্পরিক সততা ও আস্থার ভিত্তিতে হয়নি, হয়েছে দর কষাকষির ভিত্তিতে। দর কষাকষির বিষয়:পারমাণবিক প্রোগ্রামের উপরে ইরান একগাদা বাধা-নিষেধ মেনে নিয়েছে এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র কর্তৃক স্বঅরারোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো তাত্ক্ষণিক ভিত্তিতে তুলে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কংগ্রেস হয়ত প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পণ্ড করতে সচেষ্ট হবে। তবে এর সমাধান ওবামাকেই করতে হবে এবং তাঁর সফল হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে্। কারণ, যেমন:নেতানিয়াহু যখন কংগ্রেসে ৩৯ মিনিট স্থায়ী ‘ইরানি বোমা’র ওপরে কড়া পাকের তিরস্কারমিশ্রিত ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন জন কেরি ও জাভাদ জারিফ গভীরভাবে তৃতীয় রাউন্ডের আলোচনায় ব্যস্ত থাকেন (ত্রিতা পার্সি’র “টু নেতানিয়াহু : পীস ইজ এন এগজিসটেনশিয়াল থ্রেট”, হাফিংটনপোস্ট, ২.৩.১৫)। তাছাড়াও, ২০০৭ সালে এস-৩০০ মিসাইল প্রতিরক্ষা সিস্টেম বিক্রয়ের জন্য রুশরা ইরানের সঙ্গে যে একটি চুক্তি করেছিল, ২০১০ সালে নিরাপত্তা পরিষদ ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে, রুশরা স্রেফ সলিডারিটি হিসেবে ইরানকে এস-৩০০ সরবরাহ বন্ধ রাখে। রুশরা এখন এই স্বআরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়াতে ওবামার বাড়তি মানসিক জোর বাড়ছে। 

তদুপরি, তেলের ‘নিম্ন-মূল্য স্ট্র্যাটেজি’র কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন শেইল জ্বালানি শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ওপেকের প্রতি ক্রমাগতই ধৈর্যহীন হয়ে উঠছে। এদিকে তুর্কি-স্ট্রীম নামক গ্যাস পাইপলাইন তুরস্ককে যে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করছে, ফলস্বরূপ, স্বস্তিহীন ইউরোপ জ্বালানি প্রশ্নে ইরানের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হবেই। আবার আরেক দলের অস্বস্তি যে এই গ্যাস পাইপলাইন তুরস্ককে রুশদের খুব কাছে নিয়ে যাচ্ছে।

নির্মাণ কাঠামোগত চুক্তি দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়াতে তুরস্ক, সৌদি আরব, ইসরাইল এবং ইরানকে ভিন্ন মেজাজের লেভেলে নিয়ে এসেছে, ফলস্বরূপ, পুরোনোদিনের “বিভাজন ও শাসন (ডিভাইড এন্ড রুল)” নীতি ফিরে আসে কিনা দেখা যাক। তবে ধৈর্য ধরে লম্বা-চওড়া লাগাতার আলোচনাও যে সমাধানের মাধ্যম হতে পারে, তা প্রমাণিত হলো।  ইরানি “পুনর্বাসনে”র গুরুত্ব ‘পার্টি’ ভেদে ভিন্ন ভিন্ন। যেমন: যু্ক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড়ো লাভ হবে যে অবশেষে ইরানের সঙ্গে বিদ্যমান সন্তপ্ত সম্পর্ক প্রশমিত হবে বা অন্যভাবে “ডিটেন্ট” অবস্থা সৃষ্টি হবে, ফলে মার্কিন বৈদেশিক নীতিতে ইসরাইল যে বজ্রকঠিন থাবা বসিয়ে রেখেছে, সেই থাবাকে সামান্য পরিমাণে হলেও হয়তবা আলগা হতে সাহায্য করবে। অপরদিকে ইইউ-র পরিস্থিতি অন্যরকম। যেমন: জ্বালানি- দুর্ভিক্ষে প্রপীড়িত ইইউ-র কাছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ‘বনানজা’ হতে পারে। ২০১৮ সালে ট্রান্স আনাতোলিয়ান প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন (টানাপ) ও ট্রান্স আড্রিয়াটিক পাইপলাইন (ট্যাপ) দুটোর নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা, আবার না-ও হতে পারে। তুরস্ক হয়ে ইইউ-তে গ্যাস সরবরাহ করার কথা ট্যাপের মাধ্যমে, কিন্তু সম্ভাব্য গ্যাস সরবরাহকারী হিসেবে আজারবাইজান বা ইরান কোনো অঙ্গীকার  করেনি।

মূল সমস্যা:ইনফ্রাস্ট্রাকচার, যা ইরানের নেই। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ বিষয়। নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরান সেটি করতে পারেনি। এই ইরানি ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রশ্নে চীন তথা শি জিপিং-য়ের অভিনব সিল্ক রোড প্রজেক্ট চলে আসছে। “শান্তি পাইপলাইনের” (বা আইপি=ইরান-পাকিস্তান) ইরানি অংশ সমাপ্ত হয়েছিল, অভিনব সিল্ক রোডের অংশ হিসেবে গোয়াডর (পাকিস্তান) বন্দর পর্যন্ত সেটি সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব নিয়েছে চীন। লাইন বসানো সম্পূর্ণ হলে, ইরানি গ্যাস সাগরপথে চীনে পাঠানো হবে। তবে চীন যে কারাকোরাম হাইওয়ের সমান্তরালে গোয়াডর-শিনজিয়াং গ্যাস লাইন বসাবে না হলফ করে কেউ বলতে পারে না। (২০১০ সালের আগস্ট মাসে ইরান প্রজেক্টটিতে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, আমন্ত্রণটি বাংলাদেশ উজ্জীবিত করবে কি!)। অর্থাত্, ইরানি-জ্বালানি চীনে যাচ্ছে প্রথম। ইরানের দুর্দিনের সময়ে চীন ছাড়াও ব্রিকসের আরেক দেশ, রুশ ফেডারেশনের জ্বালানি সেক্টরও, যেমন: গাযপ্রম নেফট ও লুকোয়েল, বিভিন্ন প্রজে্ক্টের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এই অবস্থাটি অব্যাহত থাকবে।

একাধিক ক্ষেত্রে, ২০১৫ সাল ইরানের কাছে দরজা খুলে দিচ্ছে। এ বছরের জুলাই মাসে রাশিয়ার উলফা শহরে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার যে শীর্ষ সম্মেলন হচ্ছে, জাতিসংঘের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা যদি আর না থাকে, তবে পর্যবেক্ষকের ভূমিকা থেকে ইরান সংস্থাটির পূর্ণ সদস্য হবে। ফলে চীন-রুশের ইউরেশীয় ভিশন পূর্ণতা পাবে। রাশিয়া, চীন, ইরান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোসহ নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক পার্টনারশিপ সম্পূর্ণ হবে (২০১২ সালে কয়েকটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও সংস্থাটির পর্যবেক্ষক পদের আবেদন করেছে)।    

ইত্যবসরেই ইরান চীনের নেতৃত্বে গঠিত এশীয় ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও বিনিয়োগ ব্যাঙ্কের (এআইআইবি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েছে। ফলে অভিনব সিল্ক রোড সংক্রান্ত নির্মাণে ইরানি অর্থনীতি উপকৃত হবে। আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যে লেনদেনের অপরিহার্য অঙ্গ “সুইফট”(সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ইন্টারব্যাঙ্ক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন, সংক্ষেপে: সুইফট) থেকে ইরানকে বাদ দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে চীন  জ্বালানি বাবদ ইরানকে  মূল্য পরিশোধের জন্য “সুইফট”-য়ের একটি বিকল্প সৃষ্টি করেছে, পারমাণবিক চুক্তি হয়ে গেলে, তেহরান মুক্তভাবে ‘ইয়ুআন’ও ব্যবহার করতে পারবে। 

নিষেধাজ্ঞা-উত্তর ইরানে ইউরোপের ডাকসাইটে কোম্পানিগুলো  যখন বিনিয়োগের প্রতিযোগিতায় নামবে, বলা যায় যে ইরান আবির্ভূত হবে ইউরেশীয় শক্তি হিসেবে।

n লেখক : সাংবাদিক


 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২০ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন