ফিরিয়ে দাও সেই ক্যাম্পাস
৩০ এপ্রিল, ২০১৫ ইং
ইপসিতা আক্তার রুমা

সড়ক দ্বীপ থেকে টিএসসি-এর দেয়াল ঘেঁষে জগন্নাথ হলের দিকে কিছুদূর হাঁটলেই বিএনসিসি-এর গেট। অধিকাংশ বন্ধুরা জগন্নাথ আর শামসুন্নাহার হলে থাকতো বলে বেশিরভাগ সময় আড্ডাটা এখানেই জমতো। এক ফাল্গুনের সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে গল্পে একেবারে মশগুল। আচমকা একটা বিকট শব্দে গল্পের ঘোর কাটিয়ে যখন আমরা সম্বিত ফিরে পেলাম তখন আমাদের মাথার উপরে অজস্র কাকের প্রসারিত কুচকুচে ডানা সন্ধ্যার আলো-আঁধারির আকাশটাকে ছেয়ে দিয়ে মুহূর্তে এক ভয়ানক ভূতুড়ে পরিবেশের অবতারণা করেছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে কাকদের এই মিছিল। তবে না, আমরা কেউ ভয় পাইনি। আসল ঘটনা জানতে বেশি সময় লাগল না। কাছাকাছি কোথাও একটা ট্রান্সফর্মার বিকল হওয়ার সময় ঝুলন্ত তারে বসে থাকা একটি কাক বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে। স্বজাতির এই অনাহূত বিয়োগ মানতে পারেনি কাকের দল। তাই তাদের এই শোক মিছিল। সম্মিলিত- সমস্বর সমবদেনা, প্রতিবাদ।

তারপরের ফাল্গুনের কথা। আমের মুকুল কেবল গুটি বাঁধতে শুরু করেছে। কলা ভবনের ঠিক সামনে যে প্রকান্ড আম গাছটা রয়েছে তার তলায় বসে অলসভাবে পার করছিলাম দুটো ক্লাসের মাঝখানের অবসর সময়টা। পাশেই জনা ছয়েক ছেলে বসে নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করে এক জনকে রীতিমত জোর করে ধরে-বেঁধে গাছে তুলে দিলে। দুর্ভাগ্য আর অসাবধানতাবশত ছেলেটির হাত পড়ে গিয়েছিল পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক ভীমরুলের চাকে। আর যায় কোথায়! ক্যাম্পাস জুড়ে শত শত ভিমরুলের লঙ্কাকাণ্ড। দিগ্বিদিক ছুটে পালালো যে যার মতো। গাছে থাকা ছেলেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পা ফসকে একেবারে মগডাল থেকে পড়ে গেলো। বোধকরি হাত-পা ভেঙ্গে গিয়েছিল বলে প্রাণ রক্ষার কোন চেষ্টাই সে করতে পারলো না। শুধু চেঁচিয়ে বলছিলো ‘ভাই, কেউ একজন আমার বাসায় ফোন করেন।’ একজনও এগিয়ে যায়নি। তার বন্ধুরাও না। বরং কিছু নন্দ দুলাল নিজেদের সাথে থাকা ক্যামেরাসহ মুঠোফোনটি প্রদর্শনে অভিনিবেশ করছিলো নির্দ্বিধায়, নির্বিকারভাবে, নিঃসংকোচে। সেই ফাল্গুনেরই এক সন্ধ্যার বাতাস ভারি করে ভেসে এসেছিলো হুমায়ূন আজাদ স্যারের ওপর ছদ্মবেশীদের অতর্কিত হামলা এবং তার মুমূর্ষু হওয়ার খবর। কেঁদেছিলাম, ভারাক্রান্ত হয়েছিলাম। মনের গহীনে একটানা নিঃশব্দ ছন্দপতন হয়েছিলো। না, স্যারের জন্য নয়। তাঁর সম্পর্কে তখনও তেমন জানতাম না যে, তাঁর মৃত্যু কাঁদাতে পারে। আমি, কেঁদেছিলাম আমার ক্যাম্পাসের জন্য। ঘটনাটা ক্যাম্পাসের গণ্ডির মধ্যে ঘটেছিলো বলে। আমার ক্যাম্পাস আমার তীর্থভূমি। শুধু আমার নয়, আমার মতো অসংখ্য শিক্ষার্থীর নয়, বরং সকল বুদ্ধিজীবী, সকল সংস্কারকামীর জন্য এই অঙ্গন একই সাথে সূতিকাগার আর তীর্থভূমি। এখানেই ডানা মেলেছিলো আমাদের স্বাধীনতার প্রথম নিশানা, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা। অতীতের ধারাবাহিকতায় এখনও এই উর্বর মাটিতেই আবাদ হয় জাতির সকল আশার। ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় সকল অন্যায় আর বিভেদ, নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। উচ্চারিত হয় জাতীয় জীবনের যে কোনও সঙ্কট উত্তরণের যাদুমন্ত্র। প্রতিদিন যাদের পদচারণায় এই ক্যাম্পাস মুখরিত হয়, তারা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে নিজের মতো করে নিজের অভ্যন্তরে মুক্ত চিন্তার লালন করে, পরিচর্যা করে, বিকাশ ঘটায়। যেকোন অমানিশার বিপরীতে প্রত্যেকে এক একটি আলোকবর্তিকা। এমন তীর্থভূমির পুণ্যার্থীর ভিড়ে, আলোর এতো মশালের মাঝে একজন আলোকিত মানুষের জীবন বিপন্ন! এটা কোন সুদূরপ্রসারী অমানিশার, তিমিরাচ্ছন্নতার অশনি সংকেত দিয়ে যায় না কি? অবচেতন মন এই জ্ঞান তাপসদের মাঝে কোন বর্ণচোরার অযাচিত অনিয়ন্ত্রিত অনুপ্রবেশ আর নিঃশব্দ পদচারণা অনুভব করেছিলো । আশঙ্কাটা ছিলো সেখানে!

পৃথিবী যেখানে প্রগতির চাকায় ভর করে এগিয়ে চলছে আলোর পথে, আমরা সেখানে আদিম মূল্যবোধের উল্টো রথে চড়ে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছি বর্বরতার তিমিরে। সভ্যতার সূতিকাগার আজ আলোর সমাধিস্থল। প্রগতি আর মুক্তমন চাপা পড়া কোন বধ্যভূমি। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে সুপরিকল্পিত এবং ধারাবাহিকভাবে ঘটে যাওয়া অনাচারগুলো প্রতিকারে ন্যূনতম মাথাব্যথা নেই সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর। তাদের নিশ্চুপ অনাপত্তির কারণেই জ্ঞানের এই তীর্থভূমি আজ উগ্র চাপাতিধারীদের অভয়ারণ্য। তবে ইতিহাস অন্যকথা বলে। যতোবার কোন অন্ধকার অপশক্তি, পরাশক্তি যুক্তি আর ন্যায়কে চাপা দিতে চেয়েছে, ততোবারই পরাজিত হয়েছে। ছাই চাপা আগুনের মতো বারবার জেগে উঠেছে যুক্তি আর ন্যায়ের দৃপ্ত কণ্ঠগুলো। রাত যতো গভীর, ভোর ততো সন্নিকটে। তাই সেদিন খুব কাছেই, যেদিন সব কলুষতা মুছে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হারিয়ে যাওয়া গৌরবময় ঐতিহ্য আবার ফিরে আসবে। ক্যাম্পাস ছেয়ে যাবে আলোর মিছিলে। অবাধে চলবে কলম-উত্সব, কথার উত্সব, ভাষার উত্সব, সভ্যতা আর প্রগতির উত্সব। 

n লেখক :গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (লোকপ্রশাসন বিভাগ)

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২০ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন