বিএনপি’র রাজনৈতিক মুচলেকা
৩১ মে, ২০১৫ ইং
বিএনপি’র রাজনৈতিক মুচলেকা
দশদিগন্তে  g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

একটি চলতি প্রবাদবাক্য হলো, “কেউ দেখে শেখে, কেউ ঠেকে শেখে।” সম্প্রতি বিএনপি যেভাবে মোদী-ভজনা শুরু করেছে তা দেখে প্রবাদটি মনে পড়লো। আগামী ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আসছেন বাংলাদেশ সফরে। বাংলাদেশের সঙ্গে স্থল-সীমান্ত চুক্তি এবং ছিটমহল বিনিময় চুক্তি সম্পাদন করে নিজ দেশে এবং বাংলাদেশেও তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। এবারের সফরে তিনি হাসিনা সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আরো অনেক চুক্তি করবেন। আশা করা যায়, তিস্তার পানি বণ্টন এবং টিপাইমুখ বাঁধ সমস্যারও একটা সুরাহা হবে, অথবা সুরাহা হওয়ার পথ প্রশস্ত হবে। তা যদি হয়, তাহলে বাংলাদেশে যাদের রাজনীতি একমাত্র ভারত বিরোধিতা অথবা ভারত বিদ্বেষ প্রচার, তাদের রাজনীতি একেবারে মাঠে মারা যাবে।

বাংলাদেশে বিএনপি’র জন্ম এবং বিকাশ ভারত বিদ্বেষ প্রচার ও ভারত বিরোধিতার নীতিকে মূলধন করে। আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটি সরকারকে তারা আখ্যা দিয়েছেন ভারতের তাঁবেদার সরকার। হাসিনা সরকার পার্বত্য শান্তি চুক্তি করার সময় স্বয়ং খালেদা জিয়া বলেছেন, “ভারতের কাছে বাংলাদেশের এক-দশমাংশ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যেতে এখন ভারতীয় ভিসা লাগবে।” প্রত্যেকটি সাধারণ নির্বাচনের সময় তিনি বলেছেন, “ভারত থেকে হিন্দুরা এসে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে যায়।”

বিএনপি-নেত্রীর ভারত-বিদ্বেষ চরমে পৌঁছে, যখন ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়ে প্রণব মুখার্জি ঢাকা সফরে আসেন এবং বেগম খালেদা জিয়া তখন সরকারিভাবে বিরোধী দলের নেত্রী থাকা সত্ত্বেও ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতে তুচ্ছ কারণ দর্শিয়ে অসম্মতি জানান এবং কার্যত বৃহত্ প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রতি অসম্মান দেখান।

বেগম জিয়া রাজনীতি করছেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বে আছেন দীর্ঘকাল ধরে। কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে বিশ্ব রাজনীতি থেকে কিছু শেখার চেষ্টা তিনি করেননি। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন কিভাবে জাতীয় স্বার্থে তখনকার ভয়ানক বৈরী চীনের সঙ্গে মিত্রতা পাতাতে বেইজিংয়ে ছুটে গিয়েছিলেন, কিংবা বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওবামা কিভাবে কিউবার সঙ্গে শত্রুতার নীতি ত্যাগ করে এখন ইরানের দিকেও মৈত্রীর হাত বাড়াচ্ছেন, তা দেখেও বিএনপি-নেত্রী কিছু শিখতে চাননি। এখন পরিস্থিতির চাপে এবং ঠেকায় পড়ে তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছেন, কোনো দেশের সঙ্গেই চিরশত্রুতার নীতি রাজনৈতিক সুস্থতা নয়, ভারতের সঙ্গে তো নয়ই। ভারত আমাদের প্রতিবেশী এবং দেশটির সঙ্গে আমাদের জীবন-মরণ সমস্যাতুল্য আনেক বিষয় গভীরভাবে জড়িত। ক্রমাগত শত্রুতা দ্বারা এসব সমস্যার সমাধান করা যায় না।

ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসতেই বিএনপি ভারত সম্পর্কে সুর বদলাতে শুরু করে। তারা আশা করেছিলেন, যেহেতু আওয়ামী লীগ ভারতের কংগ্রেসের ট্রাডিশনাল মিত্র, তখন বিএনপি’র মতোই সাম্প্রদায়িকতামনা ভারতের বিজেপি তাদের মিত্র হবে এবং বাংলাদেশে তাদের ক্ষমতায় বসতে সাহায্য জোগাবে। ভারতের মোদী সরকার বাংলাদেশের হাসিনা সরকারকে মিত্র হিসেবে সহযোগিতা দেবে না এই দুরাশায় তারেক রহমান লন্ডনে বসে নরেন্দ্র মোদীকে জ্যাঠামনি (uncle) সম্বোধন করে চিঠি লিখেছেন বলেও জানা যায়।

কিন্তু নরেন্দ্র মোদী পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির রাজনীতিক। এই বিশ্ব পরিস্থিতিতে ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার আমেরিকার কট্টর রক্ষণশীল সাবেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সঙ্গে আঁতাত করেছিলেন এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওবামা চির বৈরী কিউবার প্রেসিডেন্ট ক্যাস্ট্রোর (ফিডেল ক্যাস্ট্রোর ছোট ভাই) সঙ্গে কোলাকুলি করছেন। ভারতের নরেন্দ মোদী বিজেপি’র নেতা হলেও ক্ষমতায় এসে বুঝতে পেরেছেন, ভারতকে জঙ্গিবাদের সমস্যা থেকে মুক্ত করতে হলে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মন থেকে ভারত-ভীতি দূর করে এশিয়ায় ভারতের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে প্রতিবেশী বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের মতো একটি জঙ্গিবাদ বিরোধী, গণতান্ত্রিক সরকারের মৈত্রী ও সহযোগিতা তার প্রয়োজন। ভারতকে তার পূর্ব সীমান্তে শান্তি ও নিরাপত্তা দিয়েছে হাসিনা সরকার। তার আগে খালেদা সরকার দেয়নি। হাসিনা সরকারের মাধ্যমেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রকৃত মৈত্রী প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এই উপলব্ধি থেকেই মোদী সরকার বিএনপি’র হাসিনা-বিরোধী প্ররোচনাকে প্রশ্রয় দেয়নি এবং দেবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশে হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা থেকে উত্খাতের জন্য বিএনপি স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক এমন কোনো চেষ্টা নেই, যা করেনি। জামায়াতের সহযোগিতায় দেশময় নৈরাজ্য ও অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। শেষ ভরসা ছিল ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসায় তাদের সমর্থনে হাসিনা সরকারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করা। ড. ইউনূস যেমন চেষ্টা করেছিলেন আমেরিকা ও বিশ্বব্যাংকের সাহায্যে চাপ সৃষ্টি করে হাসিনা সরকারকে নতি স্বীকার করাতে।

বিদেশি শক্তির সাহায্যে দেশের রাজনীতি পাল্টানোর চেষ্টা যে দেশের শত্রুতা করা এটা জেনেও তারা একাজটা করেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। তবে হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়ার পর খালেদা জিয়া এখনো চাচ্ছেন বিদেশিদের দ্বারা চাপ সৃষ্টি করে হাসিনা সরকারকে তার দাবি মেনে নিতে বাধ্য করতে। এজন্যেই বিএনপি’র এখন এতো ভারত-ভজনা ও মোদী বন্দনা। এমনকি এতোদিন যে তারা ভারত-বিরোধিতাকেই তাদের রাজনীতির একমাত্র মূলধন করেছিলেন তাও অস্বীকার করছেন। বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং দলের বর্তমান মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপনের সাম্প্রতিক বক্তব্যই তার প্রমাণ।

রিপন বলেছেন, বিএনপি কোনোদিন ভারত-বিরোধিতার রাজনীতি করেনি, এখনো করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না।’ এটাতো দেখছি ভারতের কাছে বিএনপি’র এক ধরনের রাজনৈতিক মুচলেকা দেওয়ার মতো। এ ধরনের মুচলেকা সাধারণত অপরাধটি যারা করে তারা দেয়, যারা করে না তারা দেয় না। বিএনপি যদি ভারত-বিরোধিতার রাজনীতি না করে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতেও করবে না বলে এই ধরনের আগাম মুচলেকা দেওয়ার অর্থটা কি? আত্মসম্মানবোধ থাকলে কি দেশের কাছে এই ধরনের মুচলেকা কেউ দেয়?

আসলে বিএনপি’র এখন ডেসপারেট অবস্থা। আন্দোলনের নামে দেশে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। সাম্প্রতিক সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন বর্জন করে তারা আরও গণবিচ্ছিন্ন হয়েছেন। ইউনূস- শিবির, সুশীল সমাজ দু’টি স্বঘোষিত নিরপেক্ষ মিডিয়া আপ্রাণ চেষ্টা করেও বিএনপির ভাঙা পালে বাতাস লাগাতে পারেনি। এই অবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য বিএনপি এখন ডেসপারেট। একমাত্র মোদী সরকারের মন জোগাতে পারলে এবং তাদের দ্বারা হাসিনা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারলে তারা সফল হতে পারেন বলে এখনো ভাবছেন।

এজন্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর আসন্ন ঢাকা সফরের সময় তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বেগম জিয়া নানা তদ্বির চেষ্টা চালাচ্ছেন। দলের মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপনকে দিয়ে আগাম মুচলেকা দিচ্ছেন, ভবিষ্যতেও তারা ভারত-বিরোধী রাজনীতি করবেন না। বিএনপি-নেত্রী এই কিছুদিন আগে ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত্ করেননি। এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বেপরোয়া। রাজনীতিতে অনেকেই দেখে শেখেন, বিএনপি নেত্রী ঠেকে শিখছেন।

বিএনপি যদি সংসদে থাকতো, তাহলে খালেদা জিয়া আগের মতোই থাকতেন বিরোধী দলের নেতা। তাহলে প্রোটোকল মেনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের বিরোধী দলের নেতাকেও সাক্ষাত্ দানের সুযোগ দিতে হতো। এখন খালেদা জিয়া বিরোধী দলের নেতা নন। কেবল বিএনপি নামক একটি বড় দলের নেতা। এই অবস্থায় তাকে সাক্ষাত্দান সম্পূর্ণ নির্ভর করে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ডিমক্রিয়েশনের উপর। তিনি বাংলাদেশে বৃহত্তম বিরোধী দলের নেতার প্রতি সম্মান জানাতে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্কারে মিলিত হতে রাজিও হতে পারেন। যদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী তা হন, তাহলে বেগম খালেদা জিয়ার উচিত হবে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে অমীমাংসিত সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলোর মীমাংসার উপরেই গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা। তা না করে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে এক গাদা সত্য মিথ্যা অভিযোগ নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার প্রার্থী হলে তিনি নিজের এবং দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করবেন। তাতে কোনো কাজ হবে তাও মনে হয় না।

ভারতের সঙ্গে অহেতুক বিবাদ করা যেমন সুস্থ রাজনীতি নয়, তেমনি জাতীয় স্বার্থে দরকার হলে ভারত-বিরোধিতা করবে না বলে মুচলেকা দেওয়াও রাজনৈতিক মর্যাদা ও সুস্থবুদ্ধির পরিচায়ক নয়। হাসিনা সরকার বিশাল ও শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে আত্মঘাতী বিবাদ জিইয়ে রাখতে চাননি, নিজেদের স্বার্থ ও মর্যাদার ভিত্তিতে তার মীমাংসা চেয়েছেন। তেমনি সমুদ্র সীমা নির্ধারণে মামলা-মোকদ্দমায় গিয়ে জয়ী হতেও দ্বিধা করেননি। পারস্পরিক স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা ও পরস্পরের মর্যাদা রক্ষার ভিত্তিতেই দু’দেশের মৈত্রী দৃঢ় হতে পারে। বিবাদ করবো না এই মুচলেকা দিয়ে মৈত্রী অর্জন করা যায় না।

তবু মন্দের ভালো, বিএনপি দেরিতে হলেও ভারত-বিরোধিতায় পাকিস্তানি লেগাসি ত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছে। এটা যদি কোনো রাজনৈতিক চালাকি না হয়ে তাদের মনের কথা হয়ে থাকে তাহলে দলটিকে অভিনন্দন জানাবো। তারা অহেতুক ভারত-বিরোধের নীতি ত্যাগ করুন। প্রচ্ছন্ন সাম্প্রদায়িকতার ও স্বাধীনতা-বিরোধী জামায়াত-শিবিরের সংশ্রব ত্যাগ করুন। সংসদে আসুন। নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতায় আসুন। বিরোধী দল হলে সরকারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলুন। দেশের মানুষ বিএনপিকে এই ভূমিকায় দেখতে চায়। সন্ত্রাসী ও স্বাধীনতা-বিরোধী জামানতের লেজুড় দল হিসেবে দেখতে চায় না। এই সত্যটা বুঝতে পারলে বিএনপি’র পুনরুজ্জীবন সম্ভব। চালাকি করে বা মুচলেকা দিয়ে রাজনীতিতে সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকা যায় না।

লন্ডন, ৩০ মে, শনিবার, ২০১৫

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩১ মে, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩৬
মাগরিব৬:৪৪
এশা৮:০৭
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৯
পড়ুন