নিরাপদ হোক মৌসুমী ফল
৩১ মে, ২০১৫ ইং
মধুমাস g বিশ্বজিত রায় বিশ্ব

বাংলা দিনপঞ্জি মতে বছরের দ্বিতীয় মাসটি হচ্ছে জ্যৈষ্ঠ। আর গ্রীষ্ম দিয়ে শুরু ঋতুচক্রের গণনা। প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের দাবদাহ এবং বাতাসে সুমিষ্ট ঘ্রাণ জানান দিচ্ছে এসেছে মধুমাস। আম, জাম, কাঁঠাল, আনারস, লিচু, গোলাপজাম, লটকন, তরমুজ, বাঙ্গী, তেঁতুল, গাব, পেয়ারা, জামরুল, তালশাঁস, জাম্বুরা, আতা, করমচা, অড়বরইসহ নাম জানা ও না জানা আরো অসংখ্য ফলের সমারোহ ঘটে এই মধুমাসে। বছরের অন্য কোনো মাস ফলের রস বিলাতে সমানভাবে ভাগ বসাতে পারেনি জ্যৈষ্ঠের নামের পাশে। মধু বলতে আমরা সাধারণত মিষ্টি জাতীয় স্বাদকেই বুঝে থাকি। গ্রীষ্মের অংশীদার জ্যৈষ্ঠকে মধুমাস বলা হলেও মিষ্টি ফলের পাশাপাশি টক জাতীয় ফলও এই সময়ে প্রচুর পাওয়া যায়। গ্রামের হাট-বাজার থেকে শুরু করে শহরের ফল ব্যবসায়ীরা এখন নানা ফলের পসরা সাজিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছেন। বাজার থেকে ফল যাচ্ছে ঘরে। পরিবার-পরিজনের জন্য। যে ফল স্ত্রী-সন্তানের জন্য ঘরে আনা হচ্ছে সে ফলগুলো কতটুকু নিরাপদ এমনটি কি ভেবে দেখেছেন কেউ।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, রাজশাহীর চারঘাট ও বাঘা উপজেলার আমচাষি-ব্যবসায়ীরা আগাম আম পাকাতে বা আম সংরক্ষণ করতে কোনো ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার না করার শপথ নিয়েছেন। এমনকি কেউ রাসায়নিক ব্যবহার করলে তাকে পুলিশে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা এবং এই দুই উপজেলায় আগামী ৫ জুন পর্যন্ত গাছ থেকে ফল পাড়া ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। রাজশাহীতে আমচাষি, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু দেশব্যাপী যে রাসায়নিক মেশানোর মহোত্সব চলবে সেগুলো ঠেকাবে কে? অন্যান্য বছর ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই), আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসন বাজারে অভিযান চালালেও সরকারি তিনটি সংস্থার পরীক্ষায় অভিযান চালানোর যন্ত্রটি অকার্যকর প্রমাণিত হওয়ায় এ বছর তা বন্ধ রয়েছে। তবে কি এ বছর রাসায়নিক মিশিয়েই বিক্রি চলছে মধুমাসের ফল-ফলাদি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় খুচরা পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট স্টোরস্ ইনকরপোরেশনের বাংলাদেশ থেকে কেনা আমে ধরা পড়েছে ফরমালিনের উপস্থিতি। তাতেই প্রমাণিত হয় বাজারে বিক্রি হওয়া ফলে এখনো ফরমালিনের অস্তিত্ব রয়েছে। ফলমূল পাকাতে সায়ানাইড, প্রভিট, ইডেন, ইথরেল নামক কেমিক্যাল এবং পচনরোধে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। এক সমীক্ষা অনুযায়ী, গাছ থেকে বাজারজাত করা পর্যন্ত ছয় দফায় কেমিক্যাল প্রয়োগের ফলে ফলমূল বিষে রূপান্তরিত হচ্ছে। ওই বিষাক্ত ফলমূল খেয়ে লিভার ক্যান্সার, কিডনি আংশিক কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরো অকেজো, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, মস্তিষ্কে প্রবল চাপ অনুভূত হওয়া, বুদ্ধি লোপ পাওয়া, পাকস্থলী-ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে ব্লাড ক্যান্সার, অস্বাভাবিক অ্যাসিডিটি, গর্ভবতী মায়েদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া স্বরূপ বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম দেয়াসহ নানা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে মানুষ।

অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর মৌসুমি ফলে ফরমালিনের ব্যবহার অনেকটা কম বলে জানিয়েছেন পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা। তবে অন্যান্য বছরের মতো এবারও ব্যাপক হারে কার্বাইডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহূত হচ্ছে অপরিপক্ব ফল পাকাতে যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। ২০১৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নে পদক্ষেপ নিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল। মন্ত্রিসভায় নিরাপদ খাদ্য আইন অনুমোদন করেছিল ঐ বছর। সাজা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল অনূর্ধ্ব ৫ বছরের কারাদণ্ড। ফল ব্যবসায়ীরা এই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তারা তাদের কুকর্ম ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে। আইন শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। নেই কোনো প্রতিকারের ব্যবস্থা। বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) মনে করছে, আইন হওয়ার পর ফরমালিনের ব্যবহার কমেছে। তবে অস্বস্তির বিষয় হলো, এখনো আমে কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে। আনারস গাছে থাকতেই প্রয়োগ করা হচ্ছে হরমোন, যা আরও মারাত্মক। এদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশিত ‘স্বাস্থ্য বুলেটিন ২০১৪’-তে উল্লেখ করা হয়েছে, ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলেথর (আইপিএইচ) পরীক্ষাগারে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালে মোট ২৮ হাজার ১৮৮টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করা হয়, যার ৪৯ শতাংশই ভেজাল মিশ্রিত বলে প্রমাণিত। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালে আইপিএইচে যথাক্রমে ৬ হাজার ৩৩৮, ৫ হাজার ৭৪৯, ৫ হাজার ৮১২, ৫ হাজার ৩২২ এবং ৪ হাজার ৯৬৭টি খাদ্যনমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ভেজাল পাওয়া যায় যথাক্রমে ২ হাজার ৯৮২, ২ হাজার ৯৯০, ৩ হাজার ১৪৭, ২ হাজার ৫৫৮ ও ২ হাজার ১৩৭টি। ২০১১ সালে সর্বোচ্চসংখ্যক ভেজাল নমুনা পাওয়া গেছে, যা নমুনার শতকরা ৫৪.০৪ ভাগ। বর্তমানে এ হার কমে এসেছে।

মধুমাস জ্যৈষ্ঠের মিষ্টি জাতীয় ফলের পাশাপাশি টকজাতীয় একটি ফল হচ্ছে অড়বরই। যে ফলটিতে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে ভিটামিন সি। কলকাতা থেকে প্রকাশিত ভারতীয় বনৌষধি বইটি অড়বরইকে উত্তম ঔষধি গুণসমৃদ্ধ ফল হিসেবে উল্লেখ করেছে। অড়বরইয়ের রস যকৃত্, পেটের পীড়া, হাঁপানি, কাশি, বহুমূত্র, অজীর্ণ ও জ্বর নিরাময়ে বিশেষ উপকারী।  পুষ্টি চাহিদা ও দেহের রোগ প্রতিরোধ করতেও ফলের অবদান অনস্বীকার্য।

n লেখক : গ্রাফিক্স ডিজাইনার

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩১ মে, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩৬
মাগরিব৬:৪৪
এশা৮:০৭
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৯
পড়ুন