খায় দায় ফজর আলী মোটা হয় জব্বার
১৫ জুন, ২০১৫ ইং
খায় দায় ফজর আলী মোটা হয় জব্বার
বাজেট

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

কথায় বলে ‘খায় দায় ফজর আলী - মোটা হয় জব্বার’। এক বিবেচনায় এটিই হলো এ বছরের জাতীয় বাজেট সম্পর্কে মোদ্দাকথা। এই মূল কথাটিকে পাশ কাটিয়ে, বাজেটের দাড়ি-কমা-সেমিকোলন প্রভৃতি নিয়ে যতো পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, তার দ্বারা কিছুটা ‘কম মন্দ’ বাজেটের ছবি রচনা করা গেলেও, একটি ‘ভাল’ বাজেট রচনার সন্ধান তার দ্বারা খুঁজে পাওয়া যাবে না। রাষ্ট্রীয় বাজেট দেশের মোট আয়, তথা জিডিপি-র একটি একক বৃহত্তম অংশ। বাত্সরিক জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে দেশের এক-পঞ্চমাংশ আয় একজায়গায় উঠিয়ে এনে খরচ করা হয়। আমি অবশ্য মনে করি যে, সেটা বাড়িয়ে এক-চতুর্থাংশ করা উচিত। তা যাই হোক, কথা হলো এই আয় কার কাছ থেকে উঠিয়ে এনে কার জন্য তা খরচ করা হবে, তার ওপর নির্ভর করে পুরোনো আয় বিন্যাস পরিবর্তন হবে কি হবে না। গরিবের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি অর্থ উঠিয়ে এনে যদি ধনীদের জন্য তা তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমাণে ব্যয় করা হয় তাহলে গরিব আরো গরিব হবে আর ধনী আরো ধনী হবে। সমাজে আয়-বৈষম্য বাড়বে। আবার যদি উল্টোটি ঘটে তাহলে গরিবের অনুকূলে আয়ের পুনর্বিন্যাস হবে। একইভাবে বলা যায় যে, বাজেটের আয়-ব্যয়ের উত্স ও চরিত্র দ্বারা গ্রাম ও শহরের মধ্যে আয়ের পুনর্বিন্যাসও বহুলাংশে সাধিত হয়। সে কারণে স্বাভাবিকভাবে জনগণের বিভিন্ন শ্রেণি ও অংশের মধ্যে দেশের সম্পদের বিন্যাস নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজেটের ভূমিকা হয়ে উঠে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে একথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, শুধু বাজেট দ্বারাই আয়ের বিন্যাস নির্ধারিত হয় না। বাজার-ব্যবস্থার ইচ্ছানিরপেক্ষ নিজস্ব ডিনামিক্স, প্রযুক্তি, উত্পাদনশীলতার বিকাশের গতি, শিক্ষার বিস্তার ইত্যাদি নানা উপাদান দ্বারাও তার গতিধারা স্থির হয়।

এবারের বাজেটে রাজস্ব আয় কোথা থেকে এবং কার কাছ থেকে সংগ্রহ করার প্রস্তাব করা হয়েছে, সেদিকে একটু নজর দেয়া যাক। তবে গোড়াতেই দেশের অদৃশ্য কালো অর্থনীতি প্রসঙ্গে কিছু কথা বলা উচিত হবে। আমাদের দেশের প্রকাশ্য ও অফিসিয়াল হিসাবের আওতায় যে দৃশ্যমান অর্থনীতি বিদ্যমান, তার বাইরে একটি বিশাল সমান্তরাল কালো অর্থনীতিও দেশে অস্তিত্বমান রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে তার পরিমাণ ৭ থেকে ১০ লাখ কোটি টাকা। এটি আমাদের জিডিপির ৫০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশের সমান। এই সমগ্র পরিমাণ টাকার কোনো স্থান অফিসিয়াল হিসাবে নেই এবং সে কারণে তা সব ধরনের করের আওতার বাইরে অবস্থান করছে। এবারের বাজেটে এই কালো টাকাকে ১০% কর দিয়ে বিশেষ ফান্ডে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছে (যেখানে কিনা প্রদর্শিত আয়ের ক্ষেত্রে আয় করের হার এর চেয়ে অনেক বেশি)। ফলে অর্থনীতিতে কালো টাকা বানানোর প্রবণতা বৃদ্ধিই পাবে। অন্যায় পথে তারা টাকা বানাবে। সেই আয় থেকে তারা ১০০% কর-রেয়াত পাবে, আবার জনগণের করের টাকা থেকে ষোল আনা সুবিধাও তারা নিবে। এই হলো কালো টাকার মালিকদের জন্য ‘জামাই আদরের’ ব্যবস্থা। ফলে এই একটি কারণেই দেশের আয়-বিন্যাসের ক্ষেত্রে বৈষম্য আরো বৃদ্ধি পাবে। এর দ্বারা ‘তেলা মাথায় তেল দেয়ার’ ব্যবস্থা করা হবে। বামপন্থিদের প্রস্তাব মতো যদি সব কালো টাকা বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রের কাজে ব্যয় করা হতো তাহলে গরিবের পক্ষে আয়-বিন্যাস উন্নত করা সম্ভব হতো। লক্ষণীয় যে, জব্দকৃত কালো টাকা দিয়ে, অন্য কোনো করারোপ ছাড়াই, দেশের আড়াই বছরের বাজেটের টাকার সংস্থান করা সম্ভব।

সমাজের সাধারণ স্বার্থে কাজ করার জন্য অর্থের সংস্থান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রের পক্ষে সে দায়িত্ব পালন করে সরকার। সরকারের যদি নিজস্ব কল-কারখানা, খামার, ব্যবসা-বাণিজ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিজস্ব মালিকানা ও বিনিয়োগ থাকে তাহলে তা সরকারের জন্য হতে পারে আয়ের একটি ভালো উত্স। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর সে ধরনের রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও বিনিয়োগ ছিল। অবশ্য ব্যাপক দুর্নীতির কারণে সেসব রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে যতটুকু আয়ের সম্ভাবনা ছিল তার সবটা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। অনেকক্ষেত্রে লোকসানও হয়েছে। দুর্নীতি, অদক্ষতা ও নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করতে পারলে সেই অবস্থা বদলানো যেতো। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত খাতকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এটি হয়েছে মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলার মতো একটি ব্যবস্থা। ফলে বর্তমানে কর বহির্ভূত রাষ্ট্রের নিজস্ব সরাসরি আয়ের পরিমাণ খুবই সামান্য। সরকারের অর্থের সংস্থান করতে হচ্ছে মূলত কর, শুল্ক ইত্যাদির মাধ্যমে।

একজন মানুষের কোন্ ক্ষেত্রে ও কি হারে কতোটুকু কর দেয়া উচিত, তা নিয়ে নানা তত্ত্ব আছে। তার মধ্যে একটি হলো ‘দেয়ার ক্ষমতা তত্ত্ব’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্রের কাজ হলো সর্বসাধারণের অখণ্ড সাধারণ কাজগুলো সম্পাদন করা। সাধারণ সেবা কার্যক্রমসহ রাষ্ট্রীয় যাবতীয় কাজের জন্য সকলেরই উচিত নিজস্ব সামর্থ্য অনুসারে রাষ্ট্রীয় তহবিলে অর্থ প্রদান করা। যার সামর্থ্য বেশি সে বেশি দিবে, যার কম সে কম দিবে। এই কম-বেশিটা শুধু সাকুল্যে হওয়া উচিত না, তার হারও হওয়া উচিত আনুপাতিক কম বা বেশি। অর্থাত্ কম সামর্থ্যের মানুষকে যদি তার আয়ের ১০% কর দিতে হয়, তাহলে বেশি সামর্থ্যের মানুষকে দিতে হবে আরো বেশি অনুপাতে। হয়তো স্তর ভেদে ২০%, ৩০%, ৪০%, ৫০% হারে। এই নীতি আয়কর, সম্পত্তি কর প্রভৃতি প্রত্যক্ষ করের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সম্ভব কিন্তু ভ্যাট, বিক্রয় কর, আমদানি শুল্ক ইত্যাদি পরোক্ষ করের ক্ষেত্রে এই নীতি প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। কেননা এক্ষেত্রে যার কাছ থেকে পরোক্ষ কর আদায় করা হয়, তিনি যে পরিমাণ কর প্রদান করেন তার সবটাই তিনি পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার কাছ থেকে আদায় করে নেন। অর্থাত্ সামর্থ্য বেশি হোক বা কম হোক, সব পরোক্ষ করই সামর্থ্য নির্বিশেষে ভোক্তার কাছ থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় সমান অনুপাতে আদায় করা হয়। প্রতিবছরের মতো এবারের বাজেটেও প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের পরিমাণ অনেক বেশি রাখা হয়েছে। ভ্যাটের আওতা বিপুলভাবে সম্প্রসারণসহ পরোক্ষ কর অনেক বাড়ানো হয়েছে। বস্তুত, প্রত্যক্ষ করের আওতার বাইরে, যে সূত্র থেকেই কর-শুল্ক-ঋণ ইত্যাদির মাধ্যমে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হোক না কেন, তা চূড়ান্ত বিচারে সর্বসাধারণের মাথায়ই এসে চেপে বসবে। আমার হিসেবে বাজেটে এ ধরনের অর্থায়নের (পরোক্ষ করসহ) পরিমাণ হলো মোট অর্থায়নের ৭৮% শতাংশ।

করের হার সম্পর্কে আরেকটি তত্ত্ব হলো ‘সুবিধা প্রাপ্তির অনুপাতে কর’-এর নীতি। রাষ্ট্রের কাছ থেকে সাধারণ সুবিধার যে যতটুকু ভোগ করবে, সেই অনুপাতে তাকে করভার বহন করতে হবে— এটাই এই তত্ত্বের মর্মকথা। সুবিধা ভোগের হিসেব করাটা বেশ জটিল। তথাপি কতগুলো বিষয়ে ধারণা করাটা তত কষ্টকর নয়। যেমন ধরা যাক, একটি পুঁজিবাদী সমাজে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ব্যক্তিগত সম্পত্তি পাহারা দেয়া। একজন ফুটপাতে থাকা মানুষ অথবা নিরন্ন ক্ষেত-মজুরের ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ হয়তো হাজার টাকা। দেশের একজন বিত্তবান কোটিপতির সম্পদের পরিমাণ সেখানে হয়তো একশ’ কোটি টাকা। অর্থাত্ দ্বিতীয় জনের সম্পদ প্রথম জনের চেয়ে ১০ লাখ গুণ বেশি। এখন সম্পদের পরিমাণ যতগুণ বেশি হবে, তা পাহারা দেয়ার খরচও ততগুণ বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই উদাহরণের ক্ষেত্রে একথা বলা যায় যে, বিত্তবান ব্যক্তির কাছ থেকে দরিদ্র মানুষটির তুলনায় ১০ লাখ গুণ বেশি কর আদায় করাটাই হবে এই নীতি অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত।

কর হার নির্ধারণে বিবেচ্য নীতির মধ্যে আরেকটি হলো ‘সামাজিক ন্যায়বিচারের তত্ত্ব’। এই নীতির মূল কথা হলো, এমন হারে কর নির্ধারণ করা উচিত যাতে করে দেশে সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিস্থিতি আরো উন্নত হয়। একথা বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই নীতির প্রায়োগিক অর্থ হলো এমনভাবে করভার আরোপ করা উচিত যাতে বিত্তবানদের বাড়তি সম্পদ স্থানান্তরিত হয়ে তা বিত্তহীনদের আয় বৃদ্ধিতে যুক্ত হয়। বাজেটের আয়-ব্যয়ের যোগ-বিয়োগের হিসেব শেষে এরকম একটি অবস্থা সৃষ্টিই সামাজিক ন্যায়বিচারের তত্ত্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু বিত্তহীনসহ সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করসহ অন্যান্য আর্থিক বোঝা বর্ধিত পরিমাণে চাপিয়ে দিলে সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিস্থিতি উন্নত না হয়ে তার যে আরো অবনতি ঘটাবে সে কথা বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিবছরের মতো এবারের বাজেটেও তাই করা হয়েছে।

রাজস্ব আদায়ের যে প্রস্তাবনা অর্থমন্ত্রী পেশ করেছেন তা থেকে একথা স্পষ্ট যে করের বোঝার সিংহভাগ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে দরিদ্র, বিত্তহীন, গরিব, মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষের ওপরে। এখন প্রশ্ন হলো, এই রাজস্ব কি অধিকতর অনুপাতে না হলেও সমানুপাতে ব্যয় করা হবে তাদের জন্য, যাদের কাছ থেকে পরোক্ষ করসহ অন্যভাবে অধিকাংশ রাজস্ব আদায় করার প্রস্তাব করা হয়েছে? যাদের কাছ থেকে বেশি কর আদায় করা হলো (মোটা দাগে বলা যায় ৭৮%) তাদের জন্য কি তিন-চতুর্থাংশ অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাব বাজেটে করা হয়েছে? এবার তবে দৃষ্টি দেয়া যাক বাজেটের প্রস্তাবিত ব্যয় কিভাবে প্রাক্কলন করা হয়েছে সেদিকে।

প্রথমেই একটি সাধারণ ধারণা দেয়ার জন্য একটি খুব সরল হিসাব বিবেচনা করা যাক্। বাজেটের মোট অর্থ যদি গরিবকে বেশি না দিয়ে (সামাজিক ন্যায়বিচারের বিবেচনায় যা করা উচিত) সমানভাবে জনে-জনে বণ্টন করা হয় তাহলে কোলের শিশু থেকে থুরথুরে বুড়ো মানুষটা পর্যন্ত প্রত্যেকের ভাগেই ১৮,৫৮৬ টাকা করে প্রাপ্য হয়। একটি পরিবারের গড় সদস্য সংখ্যা ৫ জন ধরে হিসাব করলে দেখা যাচ্ছে যে, এতে করে দেশের প্রতিটি পরিবার বাত্সরিক ৯২,৯৩০ টাকা করে পাওয়ার কথা। গরিব পরিবারগুলোর জন্য অন্য কিছু না করে শুধু যদি একবছরের জন্য এই পরিমাণ টাকা থোক বরাদ্দ রূপে দেয়া হতো তাহলে সেই টাকা দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের একটা ব্যবস্থা করে পরিবারগুলো তাদের অবস্থার উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হতো। দেশেরও সম্পদ বাড়ত। অনেকে হয়তো আপত্তি জানিয়ে বলবেন যে, সব টাকা এভাবে জনগণের মাঝে বণ্টন করে দিলে রাষ্ট্রের অপরিহার্য কাজগুলো চলবে কিভাবে? ঠিক কথা! তাহলে না হয় ধরলাম যে, যথাসম্ভব মিতব্যয়ী হয়ে এসব অপরিহার্য খরচগুলোর জন্য এক-তৃতীয়াংশ অর্থ আলাদা করে রাখা হবে। না হয় ধরলাম ৪০%ই সেজন্য বরাদ্দ থাকবে। তাহলেও তো হিসেব একথাই বলে যে, বাজেটের টাকা এভাবে থোক বরাদ্দ রূপে দিয়ে দিলে প্রতিটি পরিবারের প্রায় ৫০,০০০ টাকার বেশি পাওয়ার কথা। অর্থে অথবা প্রত্যক্ষ জিনিসপত্র/সেবা হিসেবে সাধারণ গরিব পরিবারগুলো তার ক্ষুদ্রাংশও কি পাচ্ছে? সংখ্যাতত্ত্বের জটিল হিসেবে না গিয়ে কেবল ‘কমনসেন্স’ থেকেই স্পষ্ট হয় যে, তা তারা পাচ্ছে না। ফলে যা হচ্ছে তা হলো, সাধারণ মানুষের অবস্থার আপেক্ষিক অবনতি ও বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশ করার সময় জানিয়েছেন যে, আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.১ শতাংশ করা সম্ভব হতে পারে। প্রতিবারই প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে যে হার প্রাক্কলন করা হয়, বছর শেষে দেখা যায় যে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি তা থেকে কম হয়েছে। এবারও তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটবে বলে মনে করার কোন কারণ নেই। গত ৮ বছরে গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.১৩। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের হিসেব হলো, সবচেয়ে অনুকূল অবস্থা থাকলেও প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের সীমা খুব একটা অতিক্রম করবে না।

একই বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী ‘আশা প্রকাশ করেছেন’ যে মূল্যস্ফীতি ৬.২ শতাংশের নিচে রাখতে তিনি সক্ষম হবেন। মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে অবশ্য তা যতোটা হবে বলে আশা করা হয়, বাস্তবে সেটা হয় আরো বেশি। সুতরাং এটা ধরে নেয়া যেতে পারে যে, আগামী অর্থবছরে বাস্তবে মূল্যস্ফীতি হবে ৭ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাত্ প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি হবে বেশি। ফলে জাতীয় অর্থনীতির প্রকৃত প্রবৃদ্ধি (মূল্যস্ফীতির হার হিসেবে নিয়ে জিডিপি পরিমাপ করলে) হবে বিয়োগ সূচক। যদি মন্ত্রী মহোদয়ের প্রাক্কলন ও আশাবাদকেও আমরা সঠিক থাকবে বলে ধরে নেই, তাহলেও সম্পদের অব্যাহত ও আরো প্রতিকূল হয়ে ওঠা বৈষম্যমূলক বিন্যাসের প্রতিফলন ঘটবে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে প্রবৃদ্ধির আপেক্ষিক মাত্রার তারতম্যে। প্রবৃদ্ধির সুফল বিত্তবানদের ঘরে যে মাত্রায় ও অনুপাতে পৌঁছাবে, গরিব-মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষের কাছে তা পৌঁছাবে অনেক কম অনুপাত ও মাত্রায়। অন্যদিকে সাধারণ মূল্যস্ফীতির যে জাতীয় হার, অত্যাবশ্যকীয় পণ্যসামগ্রীর মূল্য ও গরিব-মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি হিসাব করলে তার পরিমাণ হয় তা থেকে অনেক বেশি। এই উভয়দিক বিবেচনা করলে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে সাধারণ মানুষের জীবনে যে পরিমাণে প্রবৃদ্ধির হাওয়া এসে লাগবে তারচেয়ে অনেক বেশি গ্রাস করে নিবে তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বাস্তব মূল্যস্ফীতির অভিঘাত। নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়ার প্রতিফলন অব্যাহত থাকবে, বিত্তহীন ও স্বল্পবিত্ত মানুষের আপেক্ষিক দারিদ্র্য বেড়েই চলবে।

এই নিবন্ধে বাজেটের ব্যয় বরাদ্দের চিত্রটি স্থানাভাবের কারণে বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ করা যাচ্ছে না। তথাপি, কিছু বিষয় থেকেই চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেখা যাচ্ছে যে অনুন্নয়ন খাতে ব্যয়ের পরিমাণ মোট রাজস্ব আয়ের চেয়ে ২০,০০০ কোটি টাকা বেশি। এদিকে উন্নয়ন ব্যয় অনুন্নয়ন ব্যয়ের চেয়ে ৯৬,০০০ কোটি টাকা কম। অনুন্নয়ন খাতের সীমিত এই ব্যয়ের ২৩% শতাংশই যাবে বেতন-ভাতা পরিশোধে (যা পাবে মাত্র ৪% শতাংশ মানুষ)। পেনশনের জন্য ব্যয় হবে আরো প্রায় ৬% শতাংশ। প্রায় ১৮% শতাংশ যাবে ঋণের সুদ পরিশোধে। এসব ব্যয়ের প্রত্যক্ষ সুফলের সামান্যই সর্বসাধারণের কাছে আসবে। বর্তমানে দেশবাসীর মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ২৮,০৫৬ টাকা যা কিনা মাথাপিছু বাজেট বরাদ্দ (১৮,৫৮৬ টাকা)-এর চেয়ে প্রায় ১০ হাজার টাকা বেশি। বাজেটের প্রায় অর্ধেক অর্থই এসবে ব্যয় হয়ে যাবে। এদিকে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে প্রকৃত বরাদ্দ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে ‘উন্নয়নের’ যুক্তি দেখিয়ে বিত্তবানদের কর রেয়াত অব্যাহত ও কতক ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে পুঁজি জোগানোর কথা বলে ৫,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এরূপ অসংখ্য দৃষ্টান্ত দিয়ে দেখানো যায় যে এবারের বাজেটটিও ‘খায় দায় ফজর আলী- মোটা হয় জব্বার’ মার্কার।

এবারের বাজেট প্রস্তাবের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে এ কথাই বলতে হয়, প্রতিবারের মতো এটিও হলো ‘ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাগডাসে’— ধরনের একটি ব্যাপার। এ খেলা আর কতোদিন চলতে দেয়া যায় ? বছর-বছর ধরে বাগডাসের এই লোলুপ আনন্দভোজের ইতি ঘটানোর সময় এসেছে। সেজন্য সাধারণ মানুষকেই সংগঠিত হয়ে প্রতিরোধ গড়তে হবে। সাধারণ মানুষের স্বার্থে বিকল্প বাজেট রচনার শক্তিকে জোরদার করে সামনে এগিয়ে নিতে হবে।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি


এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৫ জুন, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১১:৫৯
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৪৯
এশা৮:১৪
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৪
পড়ুন