একটি স্বপ্নের মৃত্যু
০২ জুলাই, ২০১৫ ইং
জাজাফী

মানুষের স্বপ্ন বার বার বদলায়। যেমন বদলেছিল বাঙালিদের স্বপ্ন। শুরুটা কত আগে হয়েছিল তা হয়তো আমাদের জানা নেই। তবে সাধারণভাবে বলতে গেলে ১৭৫৭ সালটাই ধরা যেতে পারে। মূলত সেদিনইতো বাংলার স্বাধীনতার সূর্য দীর্ঘদিনের জন্য ডুবেছিল। যে স্বাধীনতার আলো জ্বালতে বাঙালিদের লেগেছে যুগের পর যুগ। দেশ ভাগ হলো। বাঙালিরা মনে করলো এবার নিশ্চয়ই তাদের ভাগ্য বদলাবে। নতুন একটা দেশ হলো। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তাই আবারও তাদের আশা ভঙ্গ হলো। শাষক গোষ্ঠী তাদের ওপর চাপিয়ে দিল নানা অত্যাচার। দেশকে ভালবাসার মানুষের অভাব ছিল না। বর্তমানে যারা দেশকে ভালবাসে বলে বড় বড় কথা বলে তারা আসলে কতটা দেশকে ভালবাসে তা চোখ কান খোলা রাখলেই উপলব্ধি করা যায়। মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারটুকু যখন শাষক গোষ্ঠী কেড়ে নিতে চাইলো তখন বাঙালিরা রুখে দাঁড়ালো। রাজপথ বুকের রক্ত দিয়ে ধুয়ে দিল। যার স্মৃতি ধরে রাখতে আজ আমরা শহীদ মিনার বানিয়েছি। কালের পরিক্রমায় সাহসী বাঙালিরা যে সুখের আর সমৃদ্ধির স্বপ্ন নিয়ে দেশ গড়ার কাজে মনোযোগী হয়েছিল তারা হারিয়ে যেতে লাগলো। হারিয়ে যাওয়ার আগে ১৯৭১ সালে ৯ মাস যুদ্ধ করে আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেল একটা স্বাধীন বাংলাদেশ। তাদের স্বপ্ন ছিল বুকের রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে তারা যে স্বাধীন দেশটা আমাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছে তা আমরা রক্ষা করবো এবং আরো বেশি সমৃদ্ধ করে তুলবো। কিন্তু তাদের সে স্বপ্ন আমরা সত্যি হতে দেইনি। তাদের সে স্বপ্নকে আমরা মিথ্যে করে দিতে প্রতিনিয়ত ব্যস্ত ছিলাম। সেই সব মানুষ যারা ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ অবধি জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে আমাদের জন্য একটা লাল সবুজের পতাকা এনে দিয়ে গেল এবং আমাদের হাতে সেই সোনার বাংলার দায়িত্ব দিয়ে গেল তাদের এই দিয়ে যাওয়াটা অনেকটা শেয়ালের কাছে মুরগী বরগা দেয়ার মত। যে শেয়াল প্রতিনিয়ত তার কাছে রেখে যাওয়া মুরগীর ছানাকে খেয়ে ফেলতে লাগলো। আমাদের হয়েছে তাই। যে মানুষগুলো জীবনের সব সুখ বির্সজন দিয়ে আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেল একটা স্বাধীন পতাকা আজ আমরা সেই পতাকা খামচে ছিঁড়ে নষ্ট করছি।

দেশ এই স্বাধীনতা পরবর্তী বছরগুলোতে কতটা উন্নত হয়েছে সেটাতো আমরা দেখতেই পাচ্ছি কিন্তু কতটা হারিয়েছে সেটাও নিশ্চয়ই আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর প্রয়োজন নেই। আমাদের চেয়ে সব দিক থেকে পিছিয়ে থাকা দেশও এখন আমাদের থেকে অনেক উন্নত। তাইতো আমাদের দেশের সম্পদশালীরা সেই সব দেশে ছুটি কাটাতে যায়। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। বরং অন্য দেশের মানুষদেরই আমাদের দেশের সৌন্দর্য দেখতে আসার কথা ছিল।

পাওয়া না পাওয়ার হিসাব কসতে গেলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে। এখন আমরা দেখি স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে বাজে কথা বলা হচ্ছে এবং সেটা যে কেউ বলছে না, বলছেন তারাই যারা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় খুব কাছে ছিলেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে যাদের অবদান কোনো অংশেই কম নয়। এখন স্বাধীনতার ঘোষক নিয়েও তর্ক-বিতর্ক হতে দেখা যাচ্ছে। এটাতো ন্যূনতম জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরও জানা থাকার কথা যে স্বাধীনতা লাভের পরও চার বছর জীবিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি কি কখনো বলেছেন যে তিনি স্বাধীনতার ঘোষক। জিয়াউর রহমান বেঁচে ছিলেন আরো অনেক দিন। তিনি কি কখনো বলেছিলেন যে তিনিই স্বাধীনতার ঘোষক? আমরা নিজেরাই আসলে কুলাঙ্গার। তাই যারা আমাদের জন্য এরকম সুন্দর একটা দেশ সুন্দর একটা পতাকা এনে দিয়েছিলেন তাদের আমরা সকাল সন্ধ্যা পদদলিত করছি অপমান করছি। স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া না দেয়া যদি বড় কিছু হতো তবে বঙ্গবন্ধু কিংবা জিয়াউর রহমান দু’জনেই জীবিত থাকাকালীন এমন কিছু করে যেতেন যে সেটা নিয়ে কারো কিছু বলার থাকতো না। আমরা কেন তাহলে এতো কথা বলছি। আজকে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কেউ কাউকে সম্মান করতে চায় না। আজকে বিএনপি এবং তার সমর্থক যে তারেক রহমানকে নিয়ে অহংকার করে তিনি এতোটাই নাদান যে তিনিও অস্বীকার করেন বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা। এমনকি যে মানুষটা না হলে বাংলার স্বাধীনতার সূত্রপাতই হত না তাকেও স্বাধীনতার বিপক্ষের মানুষ বলে আখ্যায়িত করতে দ্বিধা করেন না। রাতের আকাশের চাঁদ ভাবে সেই সব কিছু, তাকে কেউ সরাতে পারবে না কিন্তু দিনের সূর্য ঠিকই তাকে আড়ালে নিয়ে যায়। সূর্যটাও ঠিক একইভাবে মনে করে সেই অবিচল কিন্তু রাতের অন্ধকার তাকেও দূরে ঠেলে দেয়। আমরা এই স্বাভাবিক বিষয়টা থেকেও শিক্ষা লাভ করতে শিখিনি যে ক্ষমতা কোনো কালে কোনো দেশেই স্থায়ী নয়। মুখে লাগামহীনভাবে যা ইচ্ছে বলে যাচ্ছি। যাকে ইচ্ছে বানিয়ে ফেলছি মুক্তিযোদ্ধা আবার মুক্তিযোদ্ধাকেও স্বার্থের খাতিরে দেশদ্রোহী বানাতে কুণ্ঠাবোধ করছি না। এক দেশে জাহাজ ডুবি হলে মন্ত্রী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে আর এক দেশে হাজার হাজার মানুষ মারা গেলেও বলা হয় তুচ্ছ ঘটনা। যে দেশে গুণীর কদর নেই সে দেশ কতটা উন্নতি করবে তা কেবল ভবিষ্যত্ই বলে দিবে। ৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯ সালে একটা মানুষ যে দেশটার নাম দিয়েছিলেন বাংলাদেশ সেই বঙ্গবন্ধুকেও যদি এ দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে দেশদ্রোহী বলতে পারে এবং নিজের দলের কাছে আদর্শের মানদণ্ড হতে পারে সে দেশে আমাদের মত সাধারণ মানুষের সম্মানের কথা চিন্তাও করা যায় না। এখন আমাদের বিবেক বলতে কিছু নেই। আমরা যেন বেঁচে থেকেও মৃত।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইলঃ [email protected]

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২ জুলাই, ২০২০ ইং
ফজর৩:৪৭
যোহর১২:০৩
আসর৪:৪৩
মাগরিব৬:৫৩
এশা৮:১৭
সূর্যোদয় - ৫:১৫সূর্যাস্ত - ০৬:৪৮
পড়ুন