দূষণে দখলে কহর দরিয়া
২৭ আগষ্ট, ২০১৫ ইং
দূষণে দখলে কহর দরিয়া
 

পরিবেশ

g জামালউদ্দিন জামাল

ঢাকা মহানগরের শেষ প্রান্তে টঙ্গী শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে তুরাগ নদী। এই তুরাগ নদীর আরো একটি ঐতিহাসিক নাম হচ্ছে কহর দরিয়া। এখন বর্ষাকাল। আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাসে সাধারণত বর্ষার অবিশ্রান্ত ধারা এবং নদীতে পানি ভরাট হয়ে টইটম্বুর হয়ে থাকবে এবং স্রোত বইবে। কিন্তু ঐতিহাসিক এই কহর দরিয়ার দৃশ্যপট পাল্টে যাচ্ছে দূষণে ও দখলে। “নদী বাচাঁও” আন্দোলন করেও এর সুফল পাওয়া যায়নি। মুখে রুমাল ছাড়া এই নদীর পাশ দিয়ে হাঁটাচলা করাও দায়। ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে অতীতের সেই চিরচেনা রূপ। এইভাবে চলতে থাকলে হয়তো একদিন বিলিন হয়ে যাবে। এইভাবে কত শত নদীই তো হারিয়ে গেছে। ২০১৩ সালে নর্থ কোরিয়ার পিয়ংইয়ং শহরে গিয়েছিলাম একটা আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগদান করতে। পিয়ংইয়ং শহরটি যেন একটি সাজানো বাগান। সেই শহরের মাঝখান দিয়ে কয়েকটি স্রোতবাহী নদী দেখলাম। একটি নদীর নাম ধিদাংনদী। সুউচ্চ পাহারের উপরে দারিয়ে নদীটি দেখে আমার প্রিয় মাতৃভূমি এই কহর দরিয়া ও বুড়িগঙ্গার কথাই মনে হলো। কারণ নদীর দু’পাশ দিয়ে সান বাঁধানো রয়েছে। এই নদীটি পরিচ্ছন পিয়ংইয়ংকে আরো পরস্ফুিটিত করেছে। এমনভাবে যদি তুরাগ নদীর দু’পাশ দিয়ে বাঁধানো যেত তাহলে কত যে সন্দুর হতো সেটা কল্পনাও করা যায় না। আর ভূমি দস্যুদের দখল করার সুযোগ থাকত না। ধিদাং নদীর মত সাজাতে পারলে কহর দরিয়াও হতে পারে দৃষ্টিনন্দন।

এবার আসা যাক দূষণের কথা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বর্ষা মৌসুমেও এই নদীর পানি বিপজ্জনক। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে; নদীর প্রতি লিটার পানিতে ৬ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকা আবশ্যক। সেই সঙ্গে প্রতি লিটার পানিতে আদর্শ পিএইচ মাত্রা ৭ এবং বিদ্যুত্ পরিবাহিতার আদর্শ মাত্রার পরিমাণ ১ হাজার থাকা জরুরী। নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকলে সংকটে পড়বে মাছসহ জলজপ্রাণী। পিএইচ সাত এর কম থাকলে পানিতে অম্লতা থাকবে আর সাত এর বেশি থাকলে পানিতে ক্ষারতা বেশি থাকবে। অতিমাত্রায় শিল্পকারখানার তরল রাসায়নিক বর্জ ফেলা হচ্ছে যার কোনো প্রতিকার, প্রতিরোধ বা জবাবদিহিতা নেই। কয়েক দিন আগেও ফটোসাংবাদিক বাবু জাতীয় যাদুঘরে “নদী বাঁচাও” নাকম এক স্থিরচিত্র প্রদর্শনীতে তুলে ধরেছেন এই বর্জের ভয়াবহ চিত্র। বাসা-বাড়ির ময়লা আবর্জনা আর পলিথিন তো আছেই। যেসব বর্জ্য ফেলা হচ্ছে এরমধ্যে রয়েছে ক্লোশিং লোম, সোডিয়াম সালফেট, ক্রোমিয়াম অক্সাইড, তেল, দস্তা, নিকেল ও সিসাসহ নানাধরণের এসিড জাতীয় পদার্থ। ফলে এর তেজষ্ক্রিয়তায় পানির তলদেশে জীববৈচিত্র ও ছোট ছোট উদ্ভিদ হারিয়ে যাচ্ছে চিরতরে। এসব নদীতে এখন শামুক, ঝিনুক, কাকরাসহ আরো অনেক জলজপ্রাণী দেখা যায় না। প্রবীণ লোকদের কাছ থেকেও জানা গেছে, একসময় এই নদীতে মানুষ গোসল করতো, এই নদীর পানি পান করতো এবং রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহার করতো। অথচ এখন সেটা কল্পনাও করা যায় না।

সংশিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই অবস্থায় নেমে আসবে ভয়াবহ বিপর্যয়। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে কোনো বড় নদী থেকে ছোট নদীতে পানি প্রবাহ অব্যাহত রাখতে ব্যারেজ খনন করার প্রয়োজন হয়। অবস্থা স্বাভাবিক রাখতে খননের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবার সঠিক নজরদারী ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নদী রক্ষার জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জড়িত। কিন্তু দুভার্গ্যজনকভাবে সেসব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো সমন্বয় নেই। কিন্তু এই নদীকে রক্ষা করতে হলে সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সমন্বয় থাকতে হবে। নদীকে দখল ও দূষণ মু্ক্ত করতে বিভিন্ন আইন ও পণয়ন করা হলেও সংশ্লিষ্টদের কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। শুধুমাত্র কহর দরিয়াই নয়। ঢাকা মহানগরের চারপাশে বহমান নদীর গভীরতা ও বিশুদ্ধ পানি প্রবাহ অব্যাহত রাখার জন্য এবং নদীর পাশ দিয়ে পরিবেশ উন্নত করার জন্য বর্তমান সরকার উদ্যোগও গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এখন আর কোনো তত্পরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

এই ঐতিহাসিক কহর দরিয়া ও টঙ্গীর শহর নিয়ে অনেক লোকগীতিও রয়েছে। নদীর বুকে পাল তোলা নৌকা আর ভেপু বাজিয়ে লঞ্চ চলার মনোরম দৃশ্য দেখে সবাই মুগ্ধ হতো। ভাটিয়ালী সুরে দু’ পারের মানুষের গান, “রূপালী নদীরে রূপ দেইখা তোর হইয়াছি পাগল”। মানুষকে উদাস করে দিত। মানুষকে ভাবুক করে তুলতো। আর কবিদের তো কথাই নেই। জলজ প্রাণীগুলো ঘুরে বেড়াত স্বচ্ছ জলে। ডিঙ্গি নৌকা দিয়ে জ্যোত্স্না রাতে নদীর কিনার দিয়ে ঘুরে বেড়াত অনেকেই, যা এখন শুধুই স্বপ্নের মতো লাগে।

এই কহর দরিয়া কিভাবে রক্ষা করা যায় এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. সৈয়দ শফিউল্লাহ বলেন, শিল্পবর্জ্য বন্ধ করতে হবে। ভূমিদস্যুদের কঠিন হস্তে দমন করতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ উচ্ছেদ করলেও ভূমিদস্যুরা আবার দখল করে। ড. সৈয়দ শফিউল্লাহ আরো বলেন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি নদী ড্রেজিং করতে হবে। যেখান থেকে নদীর উত্পত্তি অর্থাত্ যমুনা ও ধলেশ্বরীর মোহনা থেকে ড্রেজিং করতে হবে। পাশাপাশি বুড়িগঙ্গা, বালুনদী ও বংশিনদী ড্রেজিং করে নদীগুলোকে বাঁচাতে হবে।

n লেখক: সাংবাদিক

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৭ আগষ্ট, ২০১৯ ইং
ফজর৪:২০
যোহর১২:০১
আসর৪:৩৩
মাগরিব৬:২৫
এশা৭:৪০
সূর্যোদয় - ৫:৩৮সূর্যাস্ত - ০৬:২০
পড়ুন