উচ্চশিক্ষার মান নিম্নমুখী সূচক
২৭ আগষ্ট, ২০১৫ ইং
শাহলা শাহনাজ দ্যুতি

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই একটি সাধারণ প্রবণতা দেখা যায়। তাহলো পড়াশোনা শেষ করে দেশের বাইরে থেকে বাড়তি কিছু ডিগ্রি আনার চেষ্টা করা। আগে এই প্রবণতাটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশি লক্ষ্য করা গেলেও বতর্মানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাও নিজ যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে বা যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। নিজ দেশে পড়াশোনা শেষ করে কেউ বাইরে থেকে আরো ডিগ্রি নিতে চাইলে সেটা অবশ্যই অনুপ্রেরণার যোগ্য। কিন্তু এই ডিগ্রি নেয়ার ব্যাপারটি যখন অনেকটা অপরিহার্য হয়ে ওঠে তখন বোধহয় বিষয়টি কিছুটা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আরো স্পষ্ট করে বললে যদি দেখা যায় নিজ দেশে চাকরির বাজারে বিদেশের পড়াশোনা অর্থাত্ ডিগ্রির মূল্য বেশি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবশ্যক তখন সেটা দেশের উচ্চশিক্ষার মানের দিকে কি প্রশ্ন তোলে না? যেখানে নিজ দেশেই সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইতে বিদেশি ডিগ্রির অগ্রাধিকার বেশি সেখানে বাইরের দেশে আমাদের দেশীয় পড়াশোনার কদর থাকবে সেটা ভাবা ঠিক হবে না।

আমরা যখনি দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষক ও ছাত্রের রাজনৈতিক কার্যকলাপে বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষা কার্যক্রম। আর এই রাজনীতির অন্ধকার দিকটি আরও স্পষ্ট হয় তখনি যখন দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা হিসেবে মেধার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় তার রাজনৈতিক পরিচিতি। আর জবাবদিহিতা না থাকার কারণে বোধহয় শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনেও কিছুটা অবহেলা লক্ষ্য করা যায়। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কমছে গবেষণার সংখ্যা। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উত্সাহিত করা ও শ্রেণিকক্ষে এ সম্পর্কিত জ্ঞান দানের অভাব আছে বলে মনে হয়। আর বিজ্ঞানের বিষয় ছাড়াও মানবিক বা বাণিজ্যের অনেক বিষয় আছে যেখানে তাত্ত্বিক জ্ঞানের সাথে ব্যবহারিক জ্ঞানও প্রয়োজন। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা সরঞ্জামের অভাব রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। আরো অভাব রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিতে পর্যাপ্ত বইয়ের। এই অভাবগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকট। উচ্চশিক্ষার মানের অবনতির আরেকটি কারণ হিসেবে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিষয়টিও উল্লেখ করা যেতে পারে। আমাদের দেশের স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে। প্রচুর সংখ্যক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়ত একেবারে অস্বাভাবিক না। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সরকারি কলেজগুলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আনার একটি প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই অনেকটা হিমশিম খাচ্ছে নিজেদের শিক্ষা কার্যক্রম সামলাতে সেখানে এই সিদ্ধান্তটি অতিরিক্ত বোঝা হয়ে দাঁড়াবে কিনা ভেবে দেখা প্রয়োজন। তবে দেশের প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হলে হয়ত আরো অনেক কারণ বের হতে পারে যা উচ্চশিক্ষাকে ক্রমে নিম্নমুখী হতে বাধ্য করছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রয়োজনীয় দৃষ্টি ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ এখন প্রয়োজন। আরো প্রয়োজন উচ্চশিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা। তাছাড়া যেহেতু বিদেশি ডিগ্রিকে এখানে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে সেহেতু ওইসব দেশের পাঠ্যসূচি ও পদ্ধতির আদলে আমাদের দেশের শিক্ষানীতি সাজানো যেতে পারে। শিক্ষাকে আধুনিক, আকর্ষণীয় ও কর্মমুখী করা গেলে তা পাঠে এবং পাঠদানে আগ্রহ বাড়বে বলে আশা করা যায়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়কে অশুভ রাজনীতির বলি হতে না দেয়া, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার অগ্রাধিকার, সেশনজট নিরসন, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান তৈরি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে নিয়মিত জার্নাল প্রকাশ থেকে শুরু করে অন্যান্য অভাব বা অপর্যাপ্ততা চিহ্নিত করে তা সমাধানের পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ক্রমে তার অতীত গৌরব ফিরে পেতে পারবে বলে প্রত্যাশা করা যায়। হয়ত এমন দিন আসবে যখন পাশ্চাত্যের ছেলেমেয়েরা আমাদের দেশে এসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে আগ্রহী হবে। যেমনটি হয়েছিল আট শতক এবং এর পরবর্তী সময়ে। অর্থাত্ প্রাচীন বাংলায়। তখন বৌদ্ধ বিহারগুলো ছিল আধুনিক আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপূরক। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসতো চীন, নেপাল, তিব্বত প্রভৃতি দেশের শিক্ষার্থীরা। এসব বাস্তবতায় আমরা মনে করি কোনো কিছুই অসম্ভব নয় যদি থাকে আন্তরিক প্রচেষ্টা। তবে সব সমস্যার সমাধান একদিনে হবে না এটা যেমন বাস্তব তেমনি দ্রুত সমাধানের পদক্ষেপ না নিলে সংকট আরো প্রকট হতে পারে সেটাও সত্য।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ৪র্থ বর্ষ, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা


 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৭ আগষ্ট, ২০১৯ ইং
ফজর৪:২০
যোহর১২:০১
আসর৪:৩৩
মাগরিব৬:২৫
এশা৭:৪০
সূর্যোদয় - ৫:৩৮সূর্যাস্ত - ০৬:২০
পড়ুন