সরকারের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি
০৭ জানুয়ারী, ২০১৬ ইং
সরকারের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি
ড. রাশিদ আশকারী

দশম সংসদ নির্বাচনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের নেতৃত্বাধীন ২০১৫ সালের বাংলাদেশ নিয়ে মূল্যায়ন করতে বসে যে কথাটি সবচাইতে আগে মনে পড়ছে তা হলো, এবছর বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি প্রভৃতিতে ‘moing shows the day’ তত্ত্বটি ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। মেঘ দেখে পাওয়া ভয় কেটে গেছে। মেঘের আড়ালে সূর্য হেসেছে। ২০১৫-এর শুরুটা ছিলো ভয়ঙ্কর। শুধু শুরুটা কেনো, প্রায় ৩/৪ মাস দেশব্যাপী বিএনপি-জামায়াতের আহূত মেগা অবরোধ (সম্ভবত অবরোধ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো প্রত্যাহূত হয়নি) ও হরতালে সংঘটিত পেট্রোল বোমা হামলা, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি নাশকতায় যে নজীরবিহীন হতাহতের ঘটনা ঘটেছে তা সামলে ওঠা কম বড়ো সাফল্যের কথা নয়। বার্ন ইউনিটে উপচে পড়া পোড়া মানুষের ভিড়, তীব্র শীতে অগ্নিদগ্ধ মানুষের আর্তনাদ, দিনরাত ২৪ ঘন্টা ওত পেতে থাকা আতঙ্ক প্রভৃতির কথা মনে পড়লে এখনো গা শিউরে ওঠে। যে বছরের শুরুটা এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় কেটেছে আতঙ্কের অমানিশার মধ্যে, সে বছরে কেবল অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই শ্রেষ্ঠ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। তাই এ বছরের সেরা সাফল্য হতে পারে, ঘুরে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ। অগ্নি সন্ত্রাসের বিভীষিকাকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিল বাংলাদেশ, সরকার এবং শান্তিকামী সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায়। ত্রাসের রাজনীতিকে না বলে দিয়েছে জাতীয় বিবেক। ভয়ঙ্কর সকালের কথা ভুলে গিয়ে মানুষ রচনা করেছে প্রাণচঞ্চল দুপুর, প্রশান্ত বিকেল আর মনোরম সন্ধ্যা।

সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ২০১৫ সালে হাসিনা সরকারের সবচাইতে বড়ো সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও বিচারের রায় কার্যকরের ঘটনা। জামায়াত নেতা কামারুজ্জামান, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় প্রবল পার্শ্বচাপ উপেক্ষা করে কার্যকর করার ঘটনা দেশবাসীর মধ্যে স্বস্তি আনে। মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবার এবং দেশের অগণিত স্বাধীনতাপক্ষের মানুষের কাছে এই সাজা প্রদানের ঘটনা মাইলফলক হয়ে থাকবে এবং সামগ্রিক বিচার প্রক্রিয়াকে নিশ্চিত ও ত্বরান্বিত করবে। ভারতের সাথে দীর্ঘ উপেক্ষিত ছিটমহল বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়ন ২০১৫ সালে হাসিনা সরকারের একটি বড়ো কূটনৈতিক সাফল্য। ভারতের লোকসভায় ঐতিহাসিক সীমান্ত বিল পাস হওয়ায় দীর্ঘকাল বাস্তবায়নের অপেক্ষায় ঝুলে থাকা ভারত-বাংলাদেশ Land Boundary Agreement দিনের আলো দেখতে পায়। ৩১ জুলাই ২০১৫ ছিটমহল বিনিময় শুরু হলে দীর্ঘ ৪১ বছর পর ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ভারত-বাংলাদেশ স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ এবং জটিল একটি স্থলসীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির মুখ দেখে। ফলে হাজার হাজার মানুষের ‘নিজ বাসভূমে পরবাস’ দশা ঘোচে এবং আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস হ্রাস পাবার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, সর্বোপরি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্র প্রশস্ত হয়। বিদায়ী সালে বাংলাদেশের সবচাইতে বড়ো সাফল্যের ছোঁয়া লেগেছে বাংলাদেশের অর্থনীতির কপালে। খোদ বিশ্বব্যাঙ্কের হিসেব অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের আগেই বাংলাদেশ পৌঁছে গেছে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে। সর্বকালের সকল রেকর্ড ভেঙে সরকারি তহবিলে এখন জমা আছে ২৭.৩০ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের দেয়া তথ্যের আলোকে সিএনএন মানিগ্রাম প্রস্তুতকৃত তালিকায় দ্রুততম প্রবৃদ্ধি ও আকারের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ দশ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। পিপিপি (পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি) বিবেচনায় বর্তমানে ৩৪তম স্থানের অধিকারী বাংলাদেশ আগামী ২৫ বছরে বিশ্বের ২৩তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মালয়েশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়াকেও ছাড়িয়ে যাবে। মাস্টার কার্ডের পরিসংখ্যান মতে, এশিয়া প্যাসিফিকের ১৬টি দেশের মধ্যে সিসিআই (কনজ্যুমার কনফিডেন্স ইনডেক্স)-এর বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১৬.৯ শতাংশ। দারিদ্র্যসীমার হার দ্রুত কমছে। কোটিপতির সংখ্যা অর্ধলক্ষাধিক জন্মের সময় যে বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যা দিয়ে “বাংলাদেশ টিকলে বিশ্বের যেকোনো দেশ টিকবে” বলে ব্যঙ্গ করেছিলেন যে অর্থনীতিবিদরা, তারাই আজ সুর পাল্টাচ্ছেন। বাংলাদেশকে এশিয়ার উদীয়মান ব্যাঘ্র হিসেবে অভিহিত করছেন। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার ভেতরেও বাংলাদেশের সাড়ে ছয় শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অনেক হিসেবকেই পাল্টে দিতে বসেছে। বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু যথার্থই বলেছেন, “উন্নয়নের সোপানে বাংলাদেশ তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। আজকের বাংলাদেশ পুরোটাই সাফল্যের গল্প।”

সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিবেচ্য প্রায় সকল সূচকেই দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের তথ্যমতে জেন্ডার প্যারিটি ইনডেক্সে ২০১৫ সালে ১৪৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৪তম, যা ২০১৪ সালে ছিলো ৬৮তম। এই সূচকে ভারতের অবস্থান ১০৮তম। ভারতের তুলনায় সামজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে, যেমন- জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, শিশুমৃত্যুর হার, প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার, ড্রপ-আউটের হার, প্রভৃতিতে বাংলাদেশের এই অগ্রগামিতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ভারতের নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন।

বহুল আলোচিত-সমালোচিত পদ্মা সেতুর মূল কাজের উদ্বোধন নিঃসন্দেহে এ-সরকারের একটি বড়ো সাফল্য। সকল সমালোচনা, সকল অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উঠে অবশেষে দেশের দীর্ঘতম সেতুটির (৬.১৫ কিলোমিটার) বাস্তবায়নের স্বপ্ন সফল হতে শুরু করেছে। পুরো কাজের এক- চতুর্থাংশেরও বেশি ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে এবং ডিসেম্বর ২০১৮’র মধ্যে সম্পূর্ণ কাজ সমাপ্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পদ্মা সেতুর মতো এতো বড়ো একটি প্রকল্প নিজ উদ্যোগে গ্রহণের চ্যালেঞ্জ বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সাহসের একটা সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।

২০১৫ সালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাফল্যের মুকুটে নতুন নতুন পালক জুড়ে দিয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও তজ্জনিত জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্ব-সচেতনতা সৃষ্টি এবং মোকাবিলার প্রস্তুতি সংক্রান্ত তত্পরতার জন্যে তিনি UNEP (United Nations Environment Programme) কর্তৃক প্রদত্ত চ্যাম্পিয়নস্ অব দ্য আর্থ-২০১৫ পুরস্কারপ্রাপ্ত হন। এছাড়াও ওয়াশিংটনভিত্তিক সাময়িকী ‘ফরেন পলিসি’র বিশ্বের ১০০ জন চিন্তাবিদের তালিকায় স্থান পায় শেখ হাসিনার নাম। উল্লেখ্য, ঐ তালিকায় ‘সিদ্ধান্ত প্রণেতা’ ক্যাটাগরিতে বিশ্বের শীর্ষতম ১৩ জনের একজন হিসেবে বিবেচিত হন শেখ হাসিনা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও সাহস, সিদ্ধান্তে অটলতা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ়তাসহ নেতৃত্বদানের বিভিন্ন গুণাবলির জন্যে তাঁকে এসকল আন্তর্জাতিক সম্মাননা প্রদান করা হয়। শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, উন্নয়নশীল দেশের একজন রোল মডেল হিসেবে শেখ হাসিনার ভূমিকা এখন বিশ্বনন্দিত। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁর বক্তৃতায় শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান IRI (Inteational Republican Institute)-এর মে-জুন ২০১৫ জরিপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা তাঁর সরকারের চাইতেও ১% বেশি বলে জানা গেছে। (সরকারের জনপ্রিয়তা ৬৬% এবং শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা ৬৭%)

হাসিনা সরকারের এই বিপুল সাফল্যগাথা বেশ খানিকটা ম্লান হতে বসে কিছু হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায়। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ একুশের বইমেলা থেকে বের হওয়ার পথে বিশিষ্ট ব্লগার ও বিজ্ঞান লেখক অভিজিত রায়কে কুপিয়ে হত্যা করার দৃশ্য মানব বর্বরতার অন্যতম নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। তারপর ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস ও নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় হত্যা, গুলশানে ২৮ সেপ্টেম্বর ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলা হত্যা, ৩ অক্টোবর রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি হত্যা, ২৩ অক্টোবর হোসেনি দালানে তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলায় হত্যা, ৩১ অক্টোবর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে হত্যা, ২৬ নভেম্বর বগুড়ায় শিয়া মসজিদে হামলা করে মুয়াজ্জিন হত্যা এবং সর্বশেষ ২৬ ডিসেম্বর রাজশাহীতে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে বোমা হামলা প্রভৃতি ঘটনা সাফল্যময় ২০১৫ সালের মহিমাকে অনেকাংশেই ম্লান করতে চাইবে। তবে একথাও সত্য যে, এই ঘটনাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি সম্পৃক্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার সরকার সোচ্চার। এদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের রাস্তা বন্ধ করতে নানামুখী তত্পরতা চালিয়ে যেতে দেখা যায় র্যাব-পুলিশ এবং ইনটেলিজেন্সকে। তবে জঙ্গিবাদের উত্থান কিংবা অনুপ্রবেশ কার্যকরভাবে প্রতিহত করতে সরকারকে আরো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জামায়াতের রাজনীতি বন্ধের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ভালো পদক্ষেপ। তবে সার্বিক বিবেচনায় ২০১৫ সালের সরকারের সাফল্যের পাল্লা অনেক ভারী। নতুন বছরের শুরুতেই ব্লগার রাজীব হত্যা মামলার রায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ঘোষিত হওয়ায় স্বস্তির ক্ষেত্র বাড়ছে। ব্লগার লেখক হত্যাকাণ্ডসহ সকল হত্যাকাণ্ডের বিচারের মধ্যদিয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা এখন সবচাইতে জরুরি। দীর্ঘ চার যুগ পরও যখন শেখ হাসিনার সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে পেরেছেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার করে তার রায় কার্যকর করতে পারছেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার হত্যাকাণ্ডসহ সকল অন্যায়ের বিচারকে তামাদি হতে দেবে না বলে আশা করা যেতেই পারে। তবে ২০১৫ সালের সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে— আরো বেগবান করতে হবে, আর ব্যর্থতাগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল এবং ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার আরো সতর্কতা ও সাফল্যের সাথে এগিয়ে যাক, সরকারের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি এবং তৃতীয় বর্ষ সূচনায় এই আশাবাদ রাখি।

n লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক


 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৭ জানুয়ারী, ২০২১ ইং
ফজর৫:২১
যোহর১২:০৫
আসর৩:৫১
মাগরিব৫:৩০
এশা৬:৪৭
সূর্যোদয় - ৬:৪২সূর্যাস্ত - ০৫:২৫
পড়ুন