পরিবেশ আদালত :প্রাসঙ্গিক ভাবনা
ইমতিয়াজ আহমেদ সজল২২ জানুয়ারী, ২০১৬ ইং
পরিবেশ আদালত :প্রাসঙ্গিক ভাবনা
বাংলাদেশে ২০০০ সালে ‘পরিবেশ আদালত আইন’ প্রণয়নের মাধ্যমে বিচারিক আদালতে বিশেষায়িত পরিবেশ বিচার ব্যবস্থা চালু করা হয়। আইনে প্রতিটি বিভাগে এক বা একাধিক ‘পরিবেশ আদালত’ এবং সারা দেশের জন্য এক বা একাধিক ‘পরিবেশ আপিল আদালত’ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়। পরবর্তীতে ৬ মার্চ ২০০২ তারিখে আইন মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে (২০০৫ সাল থেকে) ১টি করে পরিবেশ আদালত এবং সমগ্র বাংলাদেশের জন্য ঢাকায় একটি পরিবেশ আপিল আদালত প্রতিষ্ঠা করে। ২০০২ সালে এ আইনে সংশোধনী এনে পরিবেশ আদালতের পাশাপাশি পরিবেশ সংক্রান্ত লঘু দণ্ডে অপরাধ বিচারের জন্য একজন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা ১ম শ্রেণির জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত গঠনের বিধান করা হয়।

২০১০ সালে পূর্বের আইনটি রহিত করে ‘পরিবেশ আদালত আইন’ নামে সম্পূর্ণ নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়। বর্তমান আইনে প্রত্যেক জেলায় একজন যুগ্ম-জেলা জজকে দিয়ে এক বা একাধিক পরিবেশ আদালত স্থাপনের কথা বলা থাকলেও সেগুলো কোনো স্বতন্ত্র আদালত হবে না বরং জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন যুগ্ম-জেলা জজকে তার সাধারণ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে পরিবেশ আদালত পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হবে। কার্যত নতুন কোনো আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়নি বিধায় শুধু পূর্বের ৩টি আদালত ও ১টি আপিল আদালতই এখন কাজ করছে এবং পূর্বের মতোই স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলো কাজ করছে। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর অধীনে গঠিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনের অধীনে কিছু অপরাধ তাত্ক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলেই আমলে নিয়ে দণ্ডারোপ করেন ।

বিদ্যমান ৩টি পরিবেশ আদালতের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঢাকা বিভাগীয় পরিবেশ আদালতে ২০০৩ সাল থেকে ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত মামলা দায়ের হয়েছে ৪৬৭টি, নিষ্পত্তি হয়েছে প্রায় ৩৫০টি। তন্মধ্যে ৭৩টি মামলা উপযুক্ত এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে বদলি করা হয়েছে আর চলমান আছে প্রায় ১১৭টি মামলা। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে (জুন পর্যন্ত) এ আদালতে মাত্র ১টি মামলা দায়ের হয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবেশ আদালতে ২০০২ সাল থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত মামলা দায়ের হয়েছে প্রায় ৩৫৫টি, তন্মধ্যে প্রায় ২৫০টি মামলাই বিচারাধীন আছে। সিলেট বিভাগীয় পরিবেশ আদালতে ২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত মামলা দায়ের হয়েছে ৪৬৭টি, তন্মধ্যে প্রায় ৩০০টি মামলাই বিচারাধীন আছে। মামলার অপ্রতুলতার কারণে পরিবেশ আদালতগুলোয় এখন সাধারণ দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচারকার্য পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকায় অবস্থিত দেশের একমাত্র পরিবেশ আপিল আদালতে ২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে মোট ৪৩টি আপিল দায়ের হয়েছে। বাংলাদেশের পরিবেশ আদালতগুলোয় বছরে গড়ে মাত্র ৮০টি করে মামলা দায়ের হয়; বিশ্ব পরিসংখ্যানে যে হার সর্বনিম্ন।

প্রতিদিন গণমাধ্যমে সারাদেশের প্রায় সবখানেই পরিবেশের অবক্ষয়, বিপর্যয় ও দূষণের খবর প্রকাশিত হলেও মানুষ কেন পরিবেশ আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছে না? দেশের বিদ্যমান অন্যসব আদালত যখন উপর্যুপরি মামলার ভারে ন্যুব্জ তখন দেশের পরিবেশ আদালতসমূহে এত কম সংখ্যক মামলা সত্যিই বেমানান। পরিবেশ আইনের এতো লঙ্ঘন সত্ত্বেও পরিবেশ আদালতসমূহে জনসাধারণের বিচরণ না থাকার পেছনে কারণ কি সুধুই পরিবেশ আইন সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা বা অসচেতনতা? আমরা যদি সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পর্যালোচনা করি তবে দেখি ভিন্ন কথা:ক. পরিবেশ আদালত আইনে জনগণকে সরাসরি মামলা দায়েরের অধিকার দেয়া হয়নি। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এ ক্ষতিগ্রস্ত যে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, জনগণ কর্তৃক সরাসরি পরিবেশ আদালতে ক্ষতিপূরণের মামলা দায়ের করার কথা বলা আছে; কিন্তু পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০-এ বলা হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শকের লিখিত রিপোর্ট ব্যতীত কোনো পরিবেশ আদালত বা স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত কোনো ক্ষতিপূরণের দাবি বা কোনো অপরাধ বিচারার্থ গ্রহণ করবে না। অবশ্য এ বিধানের একটি ব্যতিক্রম আছে- যখন কেউ পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শকের নিকট আবেদন করার পর পরিদর্শক ৬০ দিনের মধ্যে কোনো ব্যবস্থা না নেন তবে আবেদনকারী এ বিষয়ে পরিবেশ আদালতে আবেদন করবে; আদালত সন্তুষ্ট হলে সেই পরিদর্শক বা মহাপরিচালককে শুনানির সুযোগ দিয়ে লিখিত রিপোর্ট ব্যতীতই মামলা নিতে পারবেন।

খ. পরিবেশগত ন্যায়বিচার নিশ্চিতকল্পে আইনি বিষয়ের সাথে কিছু আর্থ-সামাজিক বিষয়ও বিবেচ্য। এ সমাজে পরিবেশ দূষণকারীরা সাধারণত উচ্চ শ্রেণির, বিত্তশালী ও ক্ষমতাধর হয়ে থাকে। অন্যদিকে ভুক্তভোগী বিচারপ্রার্থী জনসাধারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দরিদ্র ও প্রান্তিক হওয়ায় তারা মামলা দায়েরে সাহসী হয় না। অতি জটিল, অস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়া তাদেরকে আরো বেশি নিরুত্সাহিত করে তোলে। বিনা খরচে মামলা পরিচালনা করার বিধান না থাকায় এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য সংস্থাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী দখল-দূষণকারীদের অনুকূলে থাকায় ভুক্তভোগী বিচারপ্রার্থী নিরীহ জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতা ও প্রতিকারহীনতায় ভোগে।

গ. পরিবেশ আদালত আইনের বিধানাবলী থেকেই এটা স্পষ্ট যে, পরিবেশ আদালত স্থাপিত হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের জন্যই; জনসাধারণের জন্য নয়। পরিবেশ আদালতে মামলা দায়ের করার প্রাথমিক দায়িত্ব এবং মামলা তদন্তের ভার পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর। আইনে প্রত্যেক জেলায় পরিবেশ আদালত স্থাপনের বিধান থাকলেও কার্যত পরিবেশ অধিদপ্তরের অফিস রয়েছে কেবল ২২টি জেলায়। তাই দপ্তর ও লোকবলের অনুপস্থিতি এবং অপ্রতুলতা সকল জেলায় পরিবেশ আদালত স্থাপনকে বিঘ্নিত করছে।

ঘ. পরিবেশ আদালত বিশেষায়িত বিচারিক আদালত, আইনানুযায়ী পরিবেশ সংক্রান্ত অপরাধের বিচার ত্বরান্বিত করাই যার একমাত্র উদ্দেশ্য; কিন্তু পরিবেশ আদালত বিদ্যমান ফৌজদারি ও দেওয়ানি কার্যবিধি এবং সাক্ষ্য আইন অনুসারে বিচার কাজ পরিচালনা করে; এর জন্য পৃথক কোনো কার্যপ্রণালী বিধিও তৈরি করা হয়নি। বিদ্যমান এসব আইনের ফল হলো বিচারকাজে দীর্ঘসূত্রতা আর মামলার জট। আবার এসব আইনানুযায়ী অভিযোগকারীকেই অভিযোগ প্রমাণ করতে হয়; তাকেই নিজ দাবির সপক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করতে হয়। কারিগরি বিষয়ে সাক্ষ্য সংগ্রহে দরকার হয় প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা যা অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে পড়ে  দুষ্প্রাপ্য; তাই অভিযোগ প্রমাণ হয়ে যায় দুঃসাধ্য।

ঙ. পরিবেশ আদালতের এখতিয়ার স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনসমূহের মধ্যে পরিবেশের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত আইনের সংখ্যা প্রায় ২০০। পরিবেশ আদালত শুধু ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫’ এবং ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’-এর অধীন অপরাধসমূহের বিচার এবং ক্ষতিপূরণের দাবি বিচারার্থে গ্রহণ করতে পারে; কিন্তু দেশের বন ও বনজ সম্পদ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, মত্স সম্পদ, পানি সম্পদ বা অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে পরিবেশ আদালতে মামলা করা যাবে না; অর্থাত্ পরিবেশের সার্বিক বিষয়ে মামলা গ্রহণ করার এখতিয়ার পরিবেশ আদালতের নেই।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় পরিবেশ সংরক্ষণ আপামর জনসাধারণের জীবন-জীবিকা সংরক্ষণের সমার্থক। এদেশে একটি জনমুখী পরিবেশ বিচার ব্যবস্থার প্রবর্তন করে আদালতগুলোতে জনসাধারণের সরাসরি ও কার্যকর অভিগম্যতা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, জেলে, মাঝি, নারী, শিশুসহ জনসাধারণ এবং অনাগত প্রজন্মের পরিবেশগত অধিকার সমুন্নত রাখা সম্ভব হবে। তাই এখনি উদারতার নীতি গ্রহণ করে অইনটিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে। তবেই বাংলাদেশের পরিবেশ আদালতসমূহ পরিবেশগত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বা পরিবেশগত অধিকার সুরক্ষায় জনমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারবে।

n লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২২ জানুয়ারী, ২০১৯ ইং
ফজর৫:২৩
যোহর১২:১০
আসর৪:০২
মাগরিব৫:৪১
এশা৬:৫৭
সূর্যোদয় - ৬:৪২সূর্যাস্ত - ০৫:৩৬
পড়ুন