নিম্ন-মধ্যম থেকে মধ্যম আয়ের দেশ
ড. এম এম আকাশ০৩ মার্চ, ২০১৬ ইং
নিম্ন-মধ্যম থেকে মধ্যম আয়ের দেশ
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের মাথাপিছু আয়ের মাপকাঠি অনুসারে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। এরই ফলে আমরা দেখতে পাই জিডিপিতে কৃষির অবদান সম্প্রতি ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। শিল্পের (ম্যানুফেকচারিং সহ) অবদান কৃষির চেয়ে বেশি অর্থাত্ ২৮ শতাংশে উপনীত হয়েছে। আর বাকি ৫২ শতাংশ এখনো দখল করে আছে নানা ধরনের সেবা। এসবই হয়েছে মূলত তিন ধরনের মালিকানার অধীনে। রাষ্ট্রীয় মালিকানা, ব্যক্তিমালিকানা এবং সমবায় মালিকানা। বাংলাদেশ ১৯৭৫-এর আগে সমাজতন্ত্রের সাংবিধানিক লক্ষ্যকে শিরোধার্য করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় মালিকানাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিল। কিন্তু অন্য অনেক দেশের মতোই উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার অভাবের কারণে এবং সমাজতান্ত্রিক কর্মীবাহিনীর অনুপস্থিতিতে জাতীয়করণকৃত বৃহত্ সেক্টর করপোরেশনগুলো তখন পরিপূর্ণ সফল হতে পারেনি। তাছাড়া ভিতর থেকেও এবং বাইরে থেকেও রাষ্ট্রীয় খাত বিরোধী ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল। রাষ্ট্রীয় খাতকে লুট করেই মধ্যবিত্তের একটি ক্ষুদ্র অংশ নব্য ধনীতে পরিণত হয়। আওয়ামী লীগের মধ্যে দক্ষিণপন্থী লবি ও বামপন্থী লবি ছিল, মাঝখানে দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। দক্ষিণপন্থী লবির নেতা খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে পরবর্তীতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ও বিশ্বব্যাংকের এবং তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বিভ্রান্ত প্রবক্তাদের এক বিচিত্র “এ টু জেড” (A to Z) ঐক্য স্থাপিত হয়। এমনকি স্বাধীনতার পরাজিত শক্তিরাও তাদের সঙ্গে নামে-বেনামে ভিড়ে যায়। তখন ওদের একটি সাধারণ স্লোগান ছিল। রুশ ভারতের দালাল মুজিব সরকারকে ক্ষমতা থেকে উত্খাত করতে হবে। তখন অবশ্য আমরা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশতো নয়ই নিম্নেরও আরও নিম্নে ছিলাম। দুঃখজনক ট্র্যাজেডি হলো বঙ্গবন্ধু দলের ভিতরে এবং দলের বাইরে তার শত্রুদেরকে সময়মতো নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হলেন। স্বভাবসুলভ উদারতায় তিনি এদেরকে ক্ষমা করলেন। এমনকি খন্দকার মোশতাক সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন “আমার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি কোরবানি দেয়ার নির্দেশ আমি পেয়েছি আর সেই বস্তুটি হচ্ছে খন্দকার মোশতাক।” প্রফেসর নূরুল ইসলামের বই-এ কথাটি উল্লেখ আছে। হাসতে হাসতে ঠাট্টার ছলে এ কথা তিনি মোশতাকের সামনেই বলেছিলেন। প্রফেসর নূরুল ইসলাম তার গ্রন্থে বলেছেন, খন্দকার মোশতাকের মুখবর্ণ এটি শুনে ছাই-এর মতো সাদা হয়ে গেলো। কিন্তু পরবর্তী ইতিহাসে দেখা গেছে, মোশতাককে কোরবানি দেয়ার আগেই বঙ্গবন্ধুর শত্রুরা বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছিল। এতো বছর পর এই ঘটনার উল্লেখ করছি কেন? নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে এই ঘটনাটি থেকে নেয়ার মতো কোনো শিক্ষণীয় কিছু কি আছে? আমার ধারণা আছে। আজ এই লেখায় সেটিই বর্ণনা করবো।

সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো রাখ-ঢাক না করেই বলে থাকে সমাজতন্ত্রের শত্রুদের গণতন্ত্রের কোনো অধিকার নেই। কিন্তু ট্র্যাজেডি হচ্ছে এই শোষিতের গণতন্ত্র কায়েম করতে গিয়ে শোষিতদের মধ্যে যে বহুত্ববাদ থাকে, মতভিন্নতা থাকে, বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ে একমত হয়েও অন্য অনেক বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করা যায়, তর্ক-বিতর্ক এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ খোলা না রাখলে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বিকাশ যে সৃজনশীলতা হারিয়ে বন্ধ হয়ে যায় সেই আদি সূত্রগুলোও কিন্তু সমাজতন্ত্র শোষিতের গণতন্ত্রের নামে বুঝে বা না বুঝে বর্জন করেছিল। সেই ভুলের ট্র্যাজেডিও সমাজতন্ত্রকে ক্ষমা করেনি। তবে এই ট্র্যাজেডি সমাজতন্ত্রের জনক মার্কস-এঙ্গেলস, লেলিনের নয় এই ট্র্যাজেডি তার অযোগ্য শিষ্যদের যদিও আমি মনে করি, এই ট্র্যাজেডির জন্য স্ট্যালিন বা মাওকেও কিছু হলেও দায়িত্ব নিতে হবে। হয়তো ভুল করবার পক্ষেও শক্তিশালী যুক্তি থাকবে। কিন্তু শেষ বিচারে ভুলতো ভুলই। সত্তর বছর পর এই ভুলের ট্র্যাজেডি আজও আমরা বহন করছি। আমার মনে হয় ওদের ভুল যদি হয় “অতি-কঠোরতা” তাহলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভুলটি ছিল “অতি-উদারতা”। যদিও শেষে তিনি বাকশাল তৈরি করে শেষ রক্ষার শেষ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আরও একটি মারাত্মক ত্রুটি বঙ্গবন্ধুর ছিল—প্রকৃত বন্ধুকেও তিনি চিনতে পারেননি। দুর্ভাগ্য যে, অন্যতম প্রতিভাবান নেতা তাজউদ্দিনকে তিনি তার সঙ্গে রাখেননি!

এখন আবার বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলে প্রকৃত বঙ্গবন্ধু ভক্তরা আশায় বুক বাঁধছেন। তবে এবার স্বপ্নটা সমাজতন্ত্র অভিমুখী নয়, পুঁজিবাদী পথেই মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্নটাই এবার তাদের প্রধান স্বপ্ন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর যে দেশগুলো নিম্ন-মধ্যম আয় থেকে মধ্যম আয় হয়ে উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে তাদের মধ্যে চারটি দেশের দিকে যদি আমরা তাকাই— দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং ও সিঙ্গাপুর তাহলে আমরা দেখবো সেসব দেশে কায়েম হয়েছিল এক ধরনের ‘হার্ড স্টেইট’ (Hard State) বা শক্তিশালী রাষ্ট্র। তারা সমাজতন্ত্রী ছিলেন না, আবার বহুদলীয় উদার গণতন্ত্রীও ছিলেন না। এদের এই উত্তরণ পর্বে অনেক সময় জুড়ে সেখানে কিছুটা মিলিটারি ডিকটেটরের মত “কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্র (Authoritarian Democracy) চালু ছিল বলে দাবি করা হয়। বলা হয় এর মধ্যেই “উন্নয়ন” হয়েছে। এই পর্বের শুরুতে তাইওয়ান ও সাউথ কোরিয়া এমেরিকান আর্মির সাহায্যে আমূল ভূমি সংস্কার সম্পন্ন করতে পেরেছিল, কারণ চীন ও উত্তর কোরিয়ার ভুমি সংস্কারের উদাহরণটি সামনে থাকায় নিজেদের দেশেও অনুরূপ একটা কিছু না করে তাদের উপায় ছিল না। যে কারণেই করা হোক না কেন পুনর্বণ্টনমূলক ভূমি সংস্কারের ফলে খাদ্যদ্রব্য উত্পাদন বৃদ্ধি পায়। খাদ্য সস্তা হয়ে যায়, শ্রমিকের মজুরিও নিম্ন পর্যায়ে স্থিতিশীল থাকে। এটাকে ব্যবহার করেই পরবর্তীতে শ্রমঘন রপ্তানিমুখী শিল্পগুলো দক্ষিণ কোরিয়ায় গড়ে ওঠে। একসময় প্রশ্ন ওঠে সস্তা শ্রম দিয়ে শ্রমঘন উত্পাদনের ধারায় কোরিয়া কতদূর উপরে উঠতে পারবে? নিম্ন আয় থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে সেখানেই কি চিরকাল সাউথ কোরিয়া টিকে থাকবে? সাউথ কোরিয়ার তদানীন্তন রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ এই ভবিতব্য মানতে চাননি। তারা চেয়েছেন আস্তে আস্তে উচ্চ মানের পুঁজিঘন পণ্য উত্পাদন শুরু করতে। তাদের যে এই দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষা ছিল তার প্রমাণ নানাভাবে মিলবে। আজকের যে হাইওন্ডি গাড়ি দক্ষিণ কোরিয়া বাইরে রপ্তানি করে তা তারা তখনই স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু এজন্য প্রয়োজন ছিল বিশেষভাবে নতুন প্রযুক্তি এবং শিক্ষিত শ্রমশক্তির।

দরকার ছিল ভারী শিল্প বা ইস্পাতের কারখানার। কিন্তু সেটা করতে গেলে বিশ্বব্যাংকের তুলনামূলক সুবিধাতত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করাটা প্রয়োজন হয়ে পরে। প্রয়োজন হয়ে পরে আমদানি প্রতিস্থাপনের গতিশীল সুবিধাগুলো অনুধাবন করা। প্রয়োজন হয়ে পরে বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণির যারা স্থানীয় বাজারকে শুধু প্রসারিতই করবে না, সেখান থেকে দেশে তৈরি উন্নত পুঁজিঘন পণ্যও (যেমন-গাড়ি, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, উন্নত ব্রান্ডের বিলাসপণ্য, ইত্যাদি) কিনবেন। কিন্তু উন্নত পুঁজিঘন পণ্য উত্পাদনে উত্তরণ ঘটাতে হলে দরকার নতুন প্রযুক্তি ও সুশিক্ষিত শ্রমবাহিনী। নতুন প্রযুক্তির জন্য বিদেশি পুঁজিকে ডেকে এনে ঘাটতি পূরণের যে কথা চালু আছে তা বিমূর্তভাবে ঠিক হলেও এর মধ্যেই আবার স্থায়ী পরনির্ভরতা ও বিশাল আয় বৈষম্যের একটি সম্ভাবনা সবসময়ই থেকে যায়। পুঁজিঘন প্রযুক্তি বহুজাতিক কোম্পানির মালিকানায় নয়া উদারনীতির ধারায় বিকশিত হলে অবশ্যম্ভাবীভাবে বেকারত্ব, বৈষম্য, একচেটিয়া মালিকানা, বাজার মৌলবাদ, সামাজিক খাতে বিনিয়োগের ঘাটতি ইত্যাদি বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে শক্তিশালী রাষ্ট্রটি যদি জাতীয়তাবাদী হয় এবং দেশের বৃহত্ পুঁজিপতি হাউজগুলোকে চিরাচরিত ঘামের দোকানের ট্রেডিশন থেকে উন্নত শিল্পের দিকে ফিরিয়ে আনতে পারে তাহলে বিদেশি পুঁজিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেই এক ধরনের মধ্য আয় অভিমুখী বিকাশ সম্ভব হতে পারে। এসব করতে হলে রাষ্ট্রকে শক্ত হতে হবে এবং এ শক্তি সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে পুঁজিবাদী উন্নয়নের জন্যই ব্যবহার করতে হবে। যেমন- লুটেরাদের বিদেশে পুঁজিপাচার কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। রপ্তানির বহুমুখীকরণ করতে হবে, গুনে ও মানে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে, প্রকৃত শিল্পোদ্যোক্তাদের বিদ্যুত্, গ্যাস, জমি, সস্তা ঋণ ইত্যাদি দিতে হবে এবং এসবের সদ্ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে হবে, সর্বপরি বৈষম্য সীমিত করার জন্য প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা কার্যকর করতে হয়। দক্ষিণ কোরিয়া বা ইস্ট এশিয়ান পুঁজিবাদের মডেলে এসব কাজ করা সম্ভব হয়েছিল তবে তা কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাজারের মাধ্যমে করা যায়নি। এগুলো করেছিল শক্তিশালী Meritocratic (প্রতিভাদীপ্ত) রাষ্ট্র। এক কথায় ক্ষমতাসীন শাসক শ্রেণি তখন গাজর এবং লাঠি (Carrot and Stick) বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহার করে লুটেরা বা সাম্রাজ্যবাদ পন্থী প্রবণতাগুলো কিছুটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। এ কথা ঠিক যে লুটেরা বা সাম্রাজ্যবাদ পন্থী শক্তিগুলো তা সহজভাবে মেনে নেননি। তারাও রাষ্ট্র যন্ত্রের ভেতরে থেকে রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার নানারকম অন্তর্ঘাত চালিয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রত্ত ছিল শক্তিশালী। পুঁজিপতিরাও ছিলেন যথেষ্ট শক্তিশালী। সেহেতু এক ধরনের শেয়ানে শেয়ানে যুদ্ধ হয়েছিল সেখানে। রাষ্ট্রের সুবিধা ছিল যে, রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রটি ছিল মেরিটোক্রেটিক এবং রাষ্ট্র চেয়েছিল যে, যেসব জাতীয় উন্নয়ন অভিমুখী আইন সে তৈরি করবে, তা ভঙ্গ করলে নৈর্বক্তিকভাবে অপরাধীর শাস্তি বিধান করতে হবে। ফলে পুঁজিপতিরা শক্তিশালী হলেও এটা জানতেন যে আইন ভাঙলে শাস্তি পেতেই হয়, রাজনৈতিক “লিংক” ব্যবহার করে কোনো রেহাই পাওয়া যাবে না। আবার রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারাও জানত দুর্নীতি করলে শাস্তি পেতে হবে। এই ধরনের অম্লমধুর সম্পর্কের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও পুঁজিপতিবর্গ কোরিয়াতে পরস্পরকে পাহাড়া দিয়ে রেখেছিল। এইভাবে নিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি ও রাষ্ট্রের কর্তৃত বজায় রেখেই একটি মধ্যম আয়ের পুঁজিবাদি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সক্ষম হয় দক্ষিণ কোরিয়া। পরবর্তীতে তারা উন্নত শিল্পায়িত পুঁজিবাদি অর্থনীতিও গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। ভূমিসংস্কার ও সার্বজনীন শিক্ষার কর্মসূচিকে কার্যকরী করে তারা তুলনামূলকভাবে একটি কম বৈষম্যমূলক সমাজও নির্মাণে সক্ষম হয়। যে নীট গিনি সূচক দিয়ে আয় বৈষম্য মাপা হয় তা দিয়ে দেখা যায় যে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উত্তরণপর্বে বা ১৯৬৫-৮১ কালপর্বে গিনি সূচকের মাত্রা ছিল ০.৩৬, ১৯৮১-র পর তা না বেড়ে কমে দাঁড়ায় ১৯৯১-২০০০ কালপর্বে ০.৩০, এরপর থেকে তা আর তেমন বৃদ্ধি পায়নি। দেখা যাচ্ছে, যদিও এতে অর্থনৈতিক বৈষম্য টিকে ছিল এবং আছে কিন্তু তা তুলনীয় অন্য দেশগুলোর চেয়ে অনেক কম। অন্য মধ্য আয়ের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় গিনি সূচকের মান হচ্ছে ০.৬০। অন্যান্য মধ্য আয়ের দেশ ব্রাজিল, টার্কি ও আর্জেন্টিনায় গিনি সূচকের মান ০.৪০ থেকে ০.৫০ পর্যন্ত। বাংলাদেশ ও চীনে তুলনীয় সূচকটি এখনই ০.৪৫ এর উপরে। [দেখুন, নজরুল ইসলাম, Will Inequality lead China to the middle income trap, Front Econ China, 2014, 9(3)] অতএব বলা যায় যে দক্ষিণ কোরিয়া রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে “বাজার মৌলবাদ” (Market Fundamentalism) এবং “রাষ্ট্র মৌলবাদ” (State Fundamentalism) উভয়কে এড়াতে পেরেছিল। সেজন্যই সেখানে সীমিত বৈষম্য বজায় রেখেই, পাশাপাশি চরম দারিদ্র্য ও ব্যাপক কর্মহীনতার অবসান ঘটেছিল। স্বনিয়োজিত কর্ম থেকে মজুরি ভিত্তিক কাজ এবং মজুরি ভিত্তিক কাজ থেকে বেতন ভিত্তিক কাজে ব্যাপক মানুষের ঊর্ধ্বগমন ঘটেছিল। পরবর্তীতে গণতন্ত্রের প্রশ্নটিও সামনের দিকে এসেছে এবং কঠিন রাষ্ট্রগুলোও এখন আস্তে আস্তে শিথিল হচ্ছে।

আমার এই লেখা থেকে কেউ যদি ভাবেন বাংলাদেশে এই পথের প্রেসক্রিপশন দিচ্ছি, তিনি তাহলে ভুল করবেন। প্রত্যেক দেশের পথ প্রত্যেক দেশের জনগণকে নিজেই খুঁজে বার করতে হয়। যে ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর বা তাইওয়ানে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল অথবা সিঙ্গাপুর এবং হংকংয়ের মতো ছোট নগর রাষ্ট্রে তা সম্ভব হয়েছিল, তার কোনো পুনরাবৃত্তি এখনকার ১৬ কোটি লোকের বাংলাদেশে সম্ভব কিনা তা ভেবে দেখতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশের মানুষ জ্ঞান বৃক্ষের ফল অনেক আগেই খেয়ে ফেলেছেন। সুতরাং সাউথ কোরিয়ার মতো কোনো ডিকটেটরকে তারা হয়তো সহ্য করবেন না। যে কারণে জেনারেল এরশাদকে তারা ৮০র দশকে সহ্য করেনি। কিন্তু এ কথাও দেখে শুনে মনে হয় যে, মানুষ চাচ্ছে একটি কঠোর রাষ্ট্র। যা নৈর্বক্তিকভাবে আইনের শাসন কায়েম করবে। এমন একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকবে যা নিজের দলের অসত্ এবং আইন ভঙ্গকারীকে মোটেও প্রশ্রয় দেবেন না, উত্পাদনমুখী শক্তিকে দিবে সর্বোচ্চ উত্সাহ। যদি বৈরী শত্রু হয় যে তাকে রক্ষা করলে সে নিজেই মারা যাবে তাহলে তাকে দমন করার পদ্ধতি হবে স্বচ্ছ, আইন প্রণয়ন করে আইনসম্মত বিচার করে দমন করতে হবে। অবশ্য আইন প্রণয়নের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে, যে কাজের জন্য ক্যারট দরকার সেই কাজে যেন ক্যারট থাকে এবং যে কাজের জন্য স্টিক দরকার সেই কাজের জন্য যেন স্টিক থাকে। মানুষ অর্থনীতির ও রাজনীতির খেলায় নামবে, খেলার নিয়ম জানবে, নিয়ম পালন করবে, না করলে রেফারি কঠোরভাবে শাস্তি বিধান করবে। এই শর্তটি ছাড়া সাউথ কোরিয়া যেমন সফল হতে পারতো না, বাংলাদেশও পারবে না। সমাজতন্ত্র না ধনতন্ত্র এই বিতর্কে আমি এখন যাচ্ছি না। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দুই ব্যবস্থার অধীনেই নিম্ন পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায়ে উন্নয়ন ও শিল্পায়ন হয়েছে। একটি সম্পত্তি মালিকানায় বৈষম্যহীন অপরটি বৈষম্যজর্জরিত। ইস্ট এশিয়ান মডেল দেখিয়েছে পুঁজিবাদের মধ্যেও সীমিত আয় বৈষম্য বজায় রেখে মধ্যম শুধু নয় উন্নত দেশ হওয়াও সম্ভব। কিন্তু ন্যূনতম সুশাসন ছাড়া এসব কোনো ব্যবস্থাই টিকসই হয় না। দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন এই প্রাচীন প্রবাদটি সকল ব্যবস্থার জন্য প্রযোজ্য।

n লেখক :অর্থনীতিবিদ

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩ মার্চ, ২০২১ ইং
ফজর৫:০৪
যোহর১২:১১
আসর৪:২৪
মাগরিব৬:০৫
এশা৭:১৮
সূর্যোদয় - ৬:১৯সূর্যাস্ত - ০৬:০০
পড়ুন